হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

১২ রবিউল আউয়ালের শিক্ষা

সম্পাদকীয়

আজ ১২ রবিউল আউয়াল—পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। শত শত বছর আগে এই মহিমান্বিত দিনে মক্কার ধূসর প্রান্তরে উদিত হয়েছিল মানবতার এক পরম সূর্য। মা আমিনার কোল আলোকিত করে ধরণিতে পা রেখেছিলেন এক মহামানব, যাঁর আগমনে আরবের জরাজীর্ণ ইতিহাস ফুলে-ফলে ভরে উঠেছিল। অজ্ঞতা, বর্বরতা আর পাপাচারের তিমির রাত্রি ভেদ করে নবীজি (সা.) নিয়ে এসেছিলেন সত্যের স্নিগ্ধ ভোর। পবিত্রতার সুবাস নিয়ে এসেছিলেন সঙ্গে করে। সুবহে সাদিকের বিমল ভোরে তিনি এসেছিলেন এই পৃথিবীতে।

যে সময়ে আরবে মানবতা ছিল পদদলিত, নারীদের অস্তিত্ব ছিল অবহেলিত, দাসেরা নিষ্পেষিত আর ধর্মীয় চেতনার নামে চলছিল কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতার উৎসব। নবীজি (সা.) তখন এসেছিলেন আলোর দিশা হয়ে, করুণার সমুদ্র হয়ে, ভালোবাসার আধার হয়ে, মুক্তির বারতা নিয়ে। মহান রবের অশেষ অনুকম্পায় তাই তো চিরকালের জন্য তিনি পেয়েছিলেন এক অমর উপাধি—‘রহমাতুল্লিল আলামিন’; অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য অকৃত্রিম রহমত।

নবুওয়াত প্রাপ্তির বহু আগেই নবীজি (সা.)-এর চরিত্র বিকশিত হয়েছিল পূর্ণিমার চাঁদের স্নিগ্ধতায়। সততা, অনাবিল বিশ্বস্ততা আর ন্যায়নিষ্ঠার অনন্য সুবাসে বিমোহিত হয়ে সমাজ তাঁকে ভালোবেসে নাম দিয়েছিল ‘আল-আমিন’—সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত। ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহার নিভৃত নির্জনতায় যখন ওহির আলোকচ্ছটা নামল, সেখান থেকেই শুরু হলো এক মহাকাব্যের। ২৩ বছরের দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথে তিনি রচনা করলেন সহনশীলতা ও ভালোবাসার এক অবিস্মরণীয় আখ্যান। মক্কার শৈশব, হিজরতের অশ্রুসজল স্মৃতি আর মদিনায় সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা—সব মিলিয়ে তিনি মানবজাতির জন্য রেখে গিয়েছিলেন এক পূর্ণাঙ্গ ও সৌন্দর্যে ঘেরা জীবনদর্শন।

নবীজি (সা.) ছিলেন দয়ার সজীব প্রতীক। তায়েফের ময়দানে যখন রক্তাক্ত হয়েছিল তাঁর পবিত্র দেহ, তখনো তিনি অভিশাপ দেননি। ওই সময়ও তাঁর হৃদয় ভরা ছিল স্নেহ-মায়া আর ভালোবাসায়। পরম মমতায় তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—‘হয়তো এদের বংশধরেরাই একদিন আলো খুঁজে পাবে।’ শত্রুর প্রতি এমন মহানুভবতা ও দূরদর্শিতা কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল। তিনি তো ছিলেন ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’। তিনি ইসলামের ছোঁয়ায় এক সোনালি প্রজন্ম গড়ে তুলেছিলেন, যাঁদের আমরা ডাকি ‘সাহাবি’। তাঁদের অন্তরে নবীজি (সা.) জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন ইমান, আত্মত্যাগ, সমাজসংস্কারের অমর জ্যোতি।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পরম আত্মদর্শনের সময়। প্রিয় নবী (সা.)-এর শুভ আগমনকে স্মরণ করার বিষয়টি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। নবীজি (সা.)-এর অকৃত্রিম আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করাই তাঁর প্রতি ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ প্রদর্শন। বর্তমানের এই অস্থির, অশান্ত ও উদ্বেল পৃথিবীতে আমরা যদি আবার সেই ‘আঁধারের আলো’ হয়ে আসা নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা ও জীবনবোধ আঁকড়ে ধরি, তবেই সমাজ ও সংস্কৃতিতে ফিরে আসবে সেই হারিয়ে যাওয়া শান্তি, সুষম আনন্দ, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ও সৌহার্দ্যের পরম সুর।

তাই আসুন, পবিত্র এই দিনে আমরা প্রিয় নবী (সা.)-এর সুন্নাহ ও চারিত্রিক সৌরভে আমাদের জীবন সুবাসিত করার দৃঢ়সংকল্প গ্রহণ করি।