সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা করেছে একদল দুর্বৃত্ত। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক খবর হলো, এই হামলায় নিহত হয়েছেন র্যাব কর্মকর্তা মো. মোতালেব হোসেন। র্যাবের আরও তিন সদস্য এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন। ১৯ জানুয়ারি বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গেলে ফেরার পথে র্যাবের গাড়ি ঘেরাও করে এই হামলার ঘটনা ঘটে। ওই এলাকায় এমন ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু কেন বারবার এমনটা ঘটে, তা এক গুরুতর এবং শঙ্কার প্রশ্ন।
২০২২ সালে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে অভিযান চালাতে গেলে হামলা করা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য করে জেলা প্রশাসনকে। ২০২৩ সালে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ি এলাকা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালে র্যাবের সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিবিনিময় হয়। ওই বছর অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে বাধা দেওয়া হয় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। এমনকি জুলাই আন্দোলনে পটপরিবর্তনের পর পাহাড়ি এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বজায় রাখতে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
সবুজে ঘেরা গহিন পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীরা নিজেদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। ২০০২ সালে এই এলাকায় সন্ত্রাসী আলী আক্কাস বসতি গড়ে তোলেন। সরকারি বিভিন্ন সুবিধা আদায় এবং বৈধতা দাঁড় করাতে ২০০৪ সালে একটি সংগঠনও গড়ে তোলেন তিনি! ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আলী আক্কাস নিহত হওয়ার পর থেকে একেক সময় একেকজন এলাকাটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের ‘আশীর্বাদ’ নিয়েই এখানে প্লট বিক্রি, আবাসন এবং চাঁদাবাজি করে সন্ত্রাসীরা তাদের দাপট বজায় রাখে।
এত বছরেও জঙ্গল সলিমপুরে চাঁদাবাজ বা ভূমিদস্যুদের মতো সন্ত্রাসীদের বাগে আনা যায়নি শুধু রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে! আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যদি কোনো রাজনৈতিক দলের চাপে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে হয়, তাহলে এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে? স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে দিলেও সন্ত্রাস নির্মূলে তাদের যথেষ্ট মেধার পরিচয় দিতে হবে। কেননা, বছরের পর বছর জঙ্গল সলিমপুর যেভাবে সন্ত্রাসীদের ‘নিরাপদ স্থানে’ পরিণত হয়েছে, তাতে এই এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেরিয়ে আসা যে কতটা কঠিন ব্যাপার, সাম্প্রতিক ঘটনাই তার প্রমাণ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে ঘোষণা করা হয়েছে—বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে এলাকাটি সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে। অনায়াসে প্রশ্ন তোলা যায়, ‘বড় অভিযান’ কেন আরও আগেই পরিচালনা করা হয়নি? কেন এখানে অপরাধ বাড়তে দেওয়া হলো? কেন রাজনৈতিক প্রশ্রয়কে এত দিন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেনি? এসব প্রশ্ন এখন পাশে রেখে এটাই প্রত্যাশা থাকবে, শুধু জঙ্গল সলিমপুর নয়, সন্ত্রাসীদের সব অভয়ারণ্যকে মুক্ত করবে প্রশাসন—হোক তা জাতীয় নির্বাচনের আগে কিংবা পরে।