চুরি করার চেষ্টা করেছে—অভিযোগটি সত্য হলেও কি কাউকে শিকল পরিয়ে রাস্তায় টানাহেঁচড়া করার অধিকার কারও আছে? তা-ও একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর সঙ্গে যদি ঘটে এমন ঘটনা, তা কি আরও বেশি ব্যথিত করে না সচেতন মানুষকে? সিলেটে এক কিশোরীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমনই এক ঘটনা আমাদের সামনে এ ধরনের প্রশ্ন হাজির করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে নির্মম এই কাণ্ডে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ঘটনাটি শুধু তিনজনের গ্রেপ্তারেই শেষ হওয়ার নয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজ ও আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থার একটি গভীর অসুখও সামনে এসেছে।
১০ সেপ্টেম্বর আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় উপশহরের মসজিদ মার্কেট এলাকার একটি দোকানে ক্যাশ বাক্স চুরির চেষ্টার অভিযোগে ওই কিশোরীকে আটক করেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা। এরপর তাকে মারধর করা হয় এবং রাত ১১টার দিকে কোমরে শিকল বেঁধে মার্কেটের সড়কে হাঁটানো হয়। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। অর্থাৎ অভিযোগের আইনি ভিত্তিটিই যদি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হলো না, তাহলে কয়েক ঘণ্টা ধরে একজন কিশোরীর ওপর যে নির্যাতন চালানো হলো, তার দায় কে নেবে?
আইন আছে, পুলিশ আছে, আদালত আছে। অপরাধের অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে, প্রমাণ সংগ্রহ হবে, প্রয়োজন হলে গ্রেপ্তার হবে এবং আদালত বিচার করবেন। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে জনতার নিজ হাতে বিচার তুলে নেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি যখন একজন কিশোরী, তখন বিষয়টি আরও গুরুতর। অপরাধের অভিযোগের আড়ালে একজন শিশুকে অপমান, নির্যাতন ও প্রকাশ্যে হেনস্তা করা সভ্য সমাজের কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিশু আইন নিশ্চয়ই এমন নিষ্ঠুরতাকে প্রশ্রয় দেয় না।
প্রশ্ন আরও আছে—এমন ঘটনা যখন ঘটে, তখন উপস্থিত লোকজনের ভূমিকা কী ছিল? কেউ কি বাধা দিয়েছেন? পুলিশকে খবর দিয়েছেন? নাকি সবাই দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন? ওই কিশোরী একজন ‘মেয়ে মানুষ’ বলেই কি তাকে খুব সহজে শিকল পরানো যায়, নির্যাতন করা যায়? আবার তা উপভোগ করা কিংবা ভিডিও ধারণ করা যায়? মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সহজ কিন্তু নির্যাতন থামানোর জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন—এমন সমাজের ভবিষ্যৎ কিন্তু উদ্বেগজনক।
ঘটনার তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ ও দ্রুত হওয়া দরকার। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। অপরাধ দমনের নামে আরেকটি অপরাধ সংঘটিত হতে দেওয়া যায় না। কারণ এমন অপরাধে শিকল শুধু কোনো ব্যক্তির কোমরেই বাঁধা হয় না, আইনের শাসনের পায়েও শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়।