হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

আমাদের লজ্জা

সম্পাদকীয়

‘লজ্জা নারীর ভূষণ’ কথাটি ব্যবহার করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কীভাবে নারীদের শোষণ ও নির্যাতন করা হয়, তার হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে। লজ্জা যেন নারীর জন্য নির্ধারিত। পুরুষেরা লজ্জা পেতে পারেন না। জার্মান নাগরিক ক্রিল ল্যান্ডারের ব্যাগটি যখন নাটোরে চুরি হয়ে যায়, তখন জাতির জন্য যে লজ্জাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা কি নারীর দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে, নাকি এই লজ্জা আমাদের দেশের। এই লজ্জা আমাদের নীচু মানসিকতার। এই লজ্জা আমাদের বিদ্যমান অরুচির। বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে কারও জিম্মায় কি কিছুই রাখা যাবে না। বিশ্বাস বস্তুটি কি হারিয়ে গেছে একেবারে।

ক্রিল ল্যান্ডারের ব্যাগটি উদ্ধার হলো কি হলো না, তা কোনো বড় ব্যাপার নয়। বড় ব্যাপার হলো, যখন এই জার্মান পর্যটক নিজ দেশে ফিরে যাবেন, তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে কী ধারণা দেবেন তাঁর দেশবাসীকে। এটি কোনো সাধারণ চুরির ঘটনা নয়। একজন পর্যটকের ব্যাগ চুরি হয়েছে, এটা কোনো পর্যটকের ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং মানুষের সততা সম্পর্কে বিদেশিদের মনে কতটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে, তা কি ভাবা যায়!

এ এক উভয়সংকট। বাংলাদেশে বসবাসরত মানুষদের বিবেচনাহীনভাবে অসৎ বলে সংজ্ঞায়িত করা হলে, তা সত্যের বরখেলাপ হবে। এ দেশে বহু মানুষ সৎ জীবনযাপন করছে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে অসৎ মানুষও দুর্লভ নয়। একজন যুবকের অপরাধ নিয়ে বাংলাদেশের সব মানুষকে হয়তো বিচার করা যাবে না, কিন্তু দেশের ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করলে এই অপরাধকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

এশিয়ার যেসব দেশে পর্যটকেরা যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সেই তালিকায় বাংলাদেশের নাম খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ দেশ ঘুরে গিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন, এমন পর্যটকের সংখ্যা খুব কম। সেবা খাত যে দক্ষতা, আন্তরিকতা ও মানবতা দাবি করে; সে কথা আমরা ভুলে যাই। আশপাশের দেশগুলোয় ঘুরতে গেলে আমাদের মানসিকতার দৈন্য বোঝা সহজ হয়। এ দেশে পর্যটক টানার চেয়ে পর্যটক তাড়ানোর কোনো দীর্ঘ পরিকল্পনা যদি আমরা নিয়ে না থাকি, তাহলে এসব সূক্ষ্ম ব্যাপারে নজর দিতে হবে। আর এ কাজ শুধু পুলিশ দিয়ে হবে না। সামাজিক মূল্যবোধ এ ধরনের অপরাধ কমাতে পারে।

আলোচনা পর্যটনশিল্পের দিকে টেনে নিয়ে বলা দরকার, বিমানবন্দর, হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহাসিক স্থান ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি এলাকার মানুষদের মূল্যবোধ বিকাশে নজর দিতে হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, তা দেখতে হবে। হোটেল, পরিবহনকর্মী, গাইড ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তা ও আচরণবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

কিন্তু এসব কথাবার্তা বিফলে যাবে, যদি পর্যটকেরা ঠিক সেবা না পান এবং পদে পদে বিপাকে পড়েন।

লজ্জাটা আসলে কার?