ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরিয়ে দেওয়ার ন্যক্কারজনক একটি ঘটনা ঘটেছে। এই কাণ্ড কেন ঘটছে এবং কাদের প্রশ্রয়ে ঘটছে, তা উদ্ঘাটন করে প্রকৃত কুশীলবদের আইনের আওতায় এনে বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
সিপাহি হামিদুর রহমান মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর স্মৃতির ওপর এ ধরনের অবমাননা সমগ্র জাতির জন্য চরম অপমানজনক ও লজ্জার। এবারই প্রথম নয়, এর আগেও একই ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছিল। সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিবাদের কারণে সেটা ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হয়। আগের রেশ কাটতে না কাটতেই পুনরায় এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটিত হলো। এ ঘটনায় স্পষ্ট হয় যে স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রাণ বিসর্জনকারী শহীদদের স্মৃতি সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতার ঘাটতি রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পাওয়ার অর্ধশত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কারও কারও জাতীয় মানসকাঠামোয় যে পাকিস্তানপ্রীতি রয়ে গেছে, তা এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়। দেশের একটি বিশেষ গোষ্ঠী আমাদের স্বাধীনতাকে এখনো অন্তর দিয়ে ধারণ করে না। ফলে বীর শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে চায়। এসব হলো তার প্রমাণ।
মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি ওই বিশেষ গোষ্ঠীকে আরও সাহসী ও দুর্ধর্ষ করে তুলেছে। যখন প্রথমবার এই ভাস্কর্য ভাঙার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তখন যদি জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হতো, তবে আজ এই অবমাননার পুনরাবৃত্তি ঘটত না। আর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর নজরদারির অভাবে দুষ্কৃতকারীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। জনবহুল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা যেখানে বেশির ভাগ সময় মানুষের যাতায়াত থাকে, সেখানে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে এমন অপকর্ম কীভাবে ঘটতে পারে? পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার পরও প্রশাসন কেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলো, তার সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা তারা কি দেবে?
প্রথমবার ভাস্কর্য ভাঙার অকাণ্ডটি ঘটার পর প্রশাসনিকভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, স্থানটিকে কোনো ধরনের নিরাপত্তাবলয়ের আওতায় আনা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা এবং ঘটনার প্রতি শিথিল মনোভাবই অপরাধীদের বারবার সুযোগ করে দিচ্ছে।
এ ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলাকারী স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেশের সব মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ও স্মারক চত্বরকে আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার সিসি ক্যামেরার নজরদারির আওতায় আনতে হবে। যদি নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে পারা না যায়, তবে তা প্রশাসনের গাফিলতিই প্রমাণ করবে।