হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

আটটি সেলাই

সম্পাদকীয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায়, গত শতকের আশি-নব্বই দশকের শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষকদের সম্মান করত আর বর্তমানের শিক্ষার্থীদের দেখলে শিক্ষকেরাই কতটা আতঙ্কিত বোধ করেন। কৌতুকপূর্ণ হলেও এই ধরনের ভিডিও কিন্তু সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে। তা না হলে শিক্ষার্থীর আঘাতে একজন শিক্ষকের থুতনিতে আটটি সেলাই লাগবে কেন?

বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক রায়হান ইসলামের ‘অপরাধ’ ছিল, তিনি তাঁর সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীকে শাসন করেছিলেন। সেই অপরাধের ‘শাস্তি’স্বরূপ ১২ অক্টোবর স্কুল ছুটির পর বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সামনে ওই শিক্ষার্থী রায়হান ইসলামকে গাছের ডাল দিয়ে মুখ ও ঘাড়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে পালিয়ে যায়। সেই আঘাত পেয়েই শরীরচর্চা শিক্ষকের থুতনিতে আটটি সেলাই লেগেছে!

এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত সপ্তম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মানুষের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠার প্রধান ক্ষেত্র। অথচ সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই এক শিক্ষার্থী যখন শাসন করার ‘প্রতিশোধ’ নিতে শিক্ষককে পিটিয়ে আহত করে, তখন ঘটনাটি কেবল একজন শিক্ষকের ওপর হামলা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না; এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীর সংকটকেও প্রতিফলিত করে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একজন কিশোরের মধ্যে এমন প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব তৈরি হলো কেন। শিক্ষকের শাসন অপছন্দ হতে পারে, কোনো সিদ্ধান্তে ক্ষোভও জন্মাতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভের প্রকাশ যদি শারীরিক হামলায় রূপ নেয় অথবা মুখের ভাষা দিয়েও আক্রমণ করা হয়, তাহলে বুঝতে হবে, মতবিরোধ সামলানো এবং সংযমের শিক্ষায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। শাসনের প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষককে আক্রমণ করার মতো মানসিকতা নিশ্চয় এক দিনে তৈরি হয় না। এর পেছনে পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক আচরণ, সহিংসতার প্রতি সহনশীলতা এবং শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের মতো বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ ঘটনার দায় শুধু শিক্ষার্থীর ওপর চাপানো যায় না; পরিবারকে সন্তানদের শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে হবে। বিদ্যালয়েও শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ভুল আচরণের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কোনো শিক্ষার্থী ক্ষুব্ধ হলে তার কথা শোনার সুযোগ থাকতে হবে, যাতে ক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই তা মোকাবিলা করা যায়।

শিক্ষকের শাসনও হতে হবে যুক্তিসংগত, মর্যাদাপূর্ণ ও শিক্ষার্থীবান্ধব। শারীরিক বা অপমানজনক শাস্তি কখনোই শিক্ষার উপযুক্ত পদ্ধতি হতে পারে না। তবে শাসন বা কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষকের ওপর হামলা করার অধিকারও কারও নেই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বয়স বিবেচনায় নিয়ে সংশোধন ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।