একি খেলা বিমানবন্দরে! ইমিগ্রেশন পুলিশের মনে হয়েছে একটু দাদাগিরি করবে! বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে নেপালের পথে রওনা হয়েছিলেন তিন নারী। কিন্তু অদ্ভুত এক কারণে তাঁদের যাত্রা বাতিল করতে হয়। আর এ জন্য সম্পূর্ণ দায়ী ইমিগ্রেশন পুলিশ।
ইমিগ্রেশন পুলিশের এই আচরণ শুধু পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশই নয়, এটা রাষ্ট্রের অবশ্যমান্য বিধির বরখেলাপ। যে পুলিশের মাথায় অবিবাহিতা, প্রাপ্তবয়স্কা নারী কেন বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহের জন্ম হয় এবং যে পুলিশ বাড়ির অভিভাবকেরা তাঁদের বিদেশে যেতে অনুমতি দিয়েছেন কি না, তা জানতে বাড়িতে ফোন করাতে বাধ্য করেন, সে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা সত্যিই এ রকম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে কাজ করার যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন না। যাত্রী বা ভ্রমণকারীর সঙ্গে শোভন আচরণ করার শিক্ষা কি এই অফিসারদের দেওয়া হয় না?
মবের মুল্লুক নিয়ে যখন সবার ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা, তখনই দেশটাকে মগের মুল্লুকে পরিণত করার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। ইমিগ্রেশনে তিন নারীর বিদেশ সফর আটকে দেওয়া সে রকম একটি ঘটনারই নজির। একই সঙ্গে মবের মুল্লুক আর মগের মুল্লুক এসে যখন একটা দেশ গ্রাস করতে চায়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের মৌলিক শক্তিই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বোঝা যায়, যে ধারায় একটি রাষ্ট্রের চলার পথ নির্ধারিত হয়েছিল, সেই ধারাই হয়েছে বাধাগ্রস্ত। যার যা খুশি, সেটা করার ঝোঁক বাড়ছে চতুর্দিকে। নিরীহ মানুষ তার ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
ঘটনা অবশ্য এখানে থেমে থাকেনি। টিকিট, পাসপোর্ট, হোটেল বুকিংসহ যাবতীয় বৈধ কাগজপত্র হাতে থাকার পরও তাঁদের সঙ্গে যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, তা মেনে নেননি তিন সাহসী নারী। তাঁরা হাইকোর্টে রিট করেছেন। তিন নারীকে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা অনুরূপ লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বাধা না দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ নির্দেশনা প্রণয়ন ও জারির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না—এ বিষয়েও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।
আইন আইনের পথেই চলবে। সংবিধান লঙ্ঘন করা আচরণের কারণে যে শাস্তি হওয়া উচিত, সে শাস্তি জুটুক আইন লঙ্ঘনকারীর। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে অবস্থান গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ রকম আরও অনেক বেআক্কেলের দেখা মিলবে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন নতুন করে হাইকোর্টের রুলের দরকার পড়বে। আমরা বলব, সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার বলতে কী বোঝায়, সেটা যেন সচেতনভাবে আমাদের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বোঝানো হয়। নানা ধরনের রক্ষণশীলতার কারণে পুরুষতান্ত্রিকতা দাপটের সঙ্গে বিরাজ করছে সমাজে। প্রাপ্তবয়স্ক একজন পুরুষের যে অধিকার আছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীরও সেই অধিকার আছে, সে শিক্ষা সরকারি কর্মচারীর আচরণবিধির মধ্যে থাকতে হবে।
তিন নারী যেন তাঁদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায় আচরণের বিচার পান, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।