হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

ইয়াবা ও নিষ্পাপ শিশু

সম্পাদকীয়

৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে আনোয়ারা উপজেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা একজন নারী এবং ৯ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশুকে মাদক বহনের অপরাধে আটক করেছে র‍্যাব -৭। ওই দুই শিশুর পেট থেকে ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। মূলত শিশুদের পেটের ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে। এর আগেও একই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মূল মাদক কারবারিরা কখনো ধরা পড়ে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদক বহনকারীদের ধরতে পারে, কিন্তু মূল হোতাদের ধরতে পারে না—এ প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল রাঘববোয়ালদের খুঁজে না পাওয়ার কারণ। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে আমরা এ বিষয়ে আরও কিছু বলতে চাই।

দেশে অবৈধ মাদক ব্যবসা প্রতিরোধে আইন আছে। আর আইন বাস্তবায়নের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আছে। কিন্তু যারা আইনকে বাস্তবায়ন করবে, তারাই যদি সেটা না করে, তাহলে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। সে জন্য আগে এসব বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার জন্য বিচারের আওতায় আনতে হবে। নতুবা আইন কাগজে লিপিবদ্ধ থাকবে আর এর কুশীলবেরা সেটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে থাকবে।

শিশুদের পেটের ভেতর মাদক বহন করা যে কতটা মারাত্মক, তা কারও অজানা নয়। এ যেন এক জীবন্ত শিশুর শরীরে বোমা বেঁধে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া। দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রতিনিয়ত যখন এই নিষ্পাপ শিশুরা জীবন বাজি রেখে অপরাধী চক্রের হাতিয়ার হচ্ছে, তখনো পুলিশের তদন্ত ও মামলার খাতায় তাদেরই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, আর নেপথ্যের মূল কারবারিরা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

প্রচলিত আইন ও উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো শিশুকে মাদক বহনে ব্যবহার করা ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর বিধান মতে স্পষ্টত একটি গুরুতর অপরাধ। আদালত বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অবুঝ শিশুরা নিজেরা অপরাধের সংগঠক নয়, বরং পরিস্থিতি ও দারিদ্র্যের শিকার। অথচ আমাদের বিচারপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে মূল অপরাধীদের শনাক্ত করতে গাফিলতি করতে দেখা যায়, যা প্রকারান্তরে ওই প্রভাবশালী চক্রগুলোকেই উৎসাহিত করছে। মূল হোতাদের না দেখে, শুধু বাহক হিসেবে শিশুদের গ্রেপ্তার করা হলে অপরাধের বিস্তার কোনো দিন বন্ধ করা যাবে না। বিচার বিভাগকে এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না করা গেলে শিশুদেরও রক্ষা করা যাবে না।

দারিদ্র্যপীড়িত শিশুদের সামান্য কিছু টাকার মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে আগে এসব শিশুর পরিবারগুলোকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্র যদি এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দারিদ্র্যের নিষ্ঠুরতা থেকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়, তবে অপরাধী চক্রের গ্রাস থেকে তাদের মুক্ত করা যাবে না। এ ধরনের শিশুকে মাদকের বাহক না বানিয়ে, দেশের একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই মূল অপরাধীদের সমূলে উপড়ে ফেলার পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।