হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

সার সংকট

সম্পাদকীয়

মেসার্স খোকন ব্রিকসের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম খোকনকে ‘মজুতদার’ আখ্যা দিলে নিশ্চয়ই ভুল বলা হবে না। কারণ তিনি অবৈধভাবে সার মজুত করে রেখেছিলেন। এই অপরাধের শাস্তিও তিনি পেয়েছেন। ১৬ বস্তা ইউরিয়া এবং ৭ বস্তা ডিএপি সার মজুত করে রাখার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। এই ২৩ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে শফিকুল ইসলামের ইটভাটা থেকে, যেটি কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নের গছিডাঙ্গা কুড়ারপাড় এলাকায় অবস্থিত। একই উপজেলার আরেক ‘গুণধর’ মজুতদার মেসার্স রফিক ট্রেডার্সের মালিক রফিকুল ইসলাম লুকিয়ে রেখেছিলেন ৯ বস্তা এমওপি সার। তাঁকে গুনতে হয়েছে মাত্র ৫ হাজার টাকার জরিমানা। কী আজব কারবার! কৃষকের প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যায় ইটের ভাটায় কিংবা ব্যবসায়ীর গুদামে! সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে তদারকির ঘাটতি হলেই এমনটা হওয়া সম্ভব।

১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে উপজেলা প্রশাসন সারের বস্তাগুলো উদ্ধার করে। প্রশাসন তার দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু আরেক দিকে বুধবার সকালে সারের সংকটের অভিযোগ তুলে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন সেখানকার কৃষকেরা। কৃষকের উৎপাদনব্যবস্থায় সার ফসল উৎপাদনের অন্যতম অপরিহার্য উপকরণ, কোনো বিলাসী পণ্য নয়। বাজারে সার নিয়ে সামান্য অনিশ্চয়তাও কৃষকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের বিক্ষোভ সেই উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ।

উপজেলা প্রশাসন বলছে, সেখানে সারের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। অথচ সার না পেয়ে কৃষকেরা বিক্ষোভ করেছেন। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে যে অসামঞ্জস্য, সেটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু মাঠের কৃষক যদি প্রয়োজনের সময় নির্ধারিত ডিলারের কাছ থেকে সার না পান, তাহলে কাগজ-কলমে পর্যাপ্ত সরবরাহের হিসাব দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।

সারের সংকট বাস্তব হোক বা কৃত্রিম—দুটিই কৃষির জন্য ক্ষতিকর। প্রকৃত সংকট হলে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে। আর কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কেউ সার মজুত বা বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ কৃষকের প্রয়োজনের পণ্য আটকে রেখে মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘাড়েই পড়ে।

এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দুজন মজুতদারকে যে ‘শাস্তি’ দেওয়া হলো, তা যেন সারের বাকি ডিলাররা ভুলে না যান। কোন ডিলার কত সার পেলেন, কত বিতরণ করলেন এবং কারা পেলেন—এসব তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা দরকার। পাশাপাশি ডিলারদের গুদাম ও মজুত নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে।

কৃষকেরা যেন সার পাওয়ার জন্য রাস্তায় নামতে বাধ্য না হন, সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই প্রশাসন দেখভাল করবে; আর কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানোর মাধ্যমে প্রশাসনিক বক্তব্যও যেন প্রমাণিত হয়—এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।