টাকা কামানো আজকাল খুব সহজ হয়ে গেছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—সবাই পারবেন, শুধু মাথাটা এদিক-সেদিক নাড়িয়ে নিতে হবে। এর আগে পৌঁছাতে হবে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার এক মুরগির খামারে, নয়তো ডেমাজানি ব্রিজের কাছে একটি গুদামে। সেখানে গিয়ে ফিটফাট হয়ে কয়েকটা ছবি তুলে বা ভিডিও করলে পাওয়া যায় ৫০০ টাকা।
শেরপুর উপজেলার মহিপুর কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষার্থী যদি স্কুলে ব্যাগ রেখে ৫০০ টাকা পাওয়ার লোভে ওই মুরগির খামারে না যেত, তাহলে হয়তো টাকা উপার্জনের এই সহজ পন্থা আজকের পত্রিকায় ছাপা হতো না। সেখানে গেলে তাদের ভিডিও ধারণ এবং ফেস ভেরিফিকেশন করা হয়। ওই স্কুলের আরেক শিক্ষার্থী প্রায় তিন মাস আগে এক বন্ধুর মাধ্যমে মুরগির খামারটির সন্ধান পায়। সে অবশ্য তখন ২০০ টাকা পেয়েছিল। তবে আরও টাকার বিনিময়ে সে অন্যদের সেখানে নিয়ে যাওয়া শুরু করে। দুশ্চিন্তার বিষয়, এই শিশু-কিশোরেরা বুঝতে পারেনি যে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য পাচার করা হচ্ছে বিদেশে।
স্কুল পালিয়ে এ ধরনের অনৈতিক কাজে যুক্ত হওয়া এবং টাকার লোভে পড়ার মতো ঘটনা শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ বিপদের দুয়ারে দাঁড় করিয়ে দেয়। মাত্র ২০০ বা ৫০০ টাকার বিনিময়ে একজন কিশোরের মুখের জৈবিক পরিচিতি বা বায়োমেট্রিক তথ্য কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। অর্থের বিনিময়ে শিশুদের ব্যবহার করে একটি অজ্ঞাত ডিজিটাল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে—এটি অভিভাবক ও প্রশাসন উভয়ের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা।
সাব্বির হাসান রাকিব নামের এক স্থানীয় তরুণ এই কাজের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি স্বীকার করেছেন, ৫০০ টাকার বিনিময়ে ছবি তোলেন এবং ফেস ভেরিফিকেশন করেন। এর আগে সৈকত ও মামুন নামের দুই তরুণের সঙ্গে তিনি কাজ করতেন, যাঁরা সহস্রাধিক ব্যক্তির পাসপোর্টের ছবি, পরিচয়পত্রের তথ্য নিয়েছেন এবং ফেস ভেরিফিকেশন করেছেন। কারও পাসপোর্টের ছবি কোনো গুদামে কিংবা মুরগির খামারে তোলা হয়—এমন কথা কেউ কখনো শুনেছেন। রাষ্ট্র কি খামাখা পয়সা খরচ করে জনগণের জন্য পাসপোর্ট অফিসের ভবন নির্মাণ করেছে।
স্কুল পালিয়ে ৫০০ টাকা রোজগারের এই পন্থা আমাদের মানসিক দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ। টাকার কাছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিকিয়ে যাচ্ছে, এটা জানতে পারছে না এই কিশোরের দল।
বগুড়ার এই ঘটনায় কেন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আটক করা হচ্ছে না, যেখানে শাজাহানপুরের রহিমাবাদ এলাকার সাবেক সেনাসদস্য আমিরুল ইসলাম থানায় সৈকতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। পুলিশের কাছে অবশ্য একটা উত্তর আছে—‘কেউ একজন মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছিলেন। পরে উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা করে নেয়।’
বোঝা গেল, অপরাধ সংঘটিত হোক বা না হোক, লিখিত অভিযোগ না পেলে তদন্ত হবে না। এই মন খারাপ করা সংস্কৃতি থেকে কবে বের হবে বাংলাদেশ।