ক্ষমতাসীন দলের একজন স্থানীয় পর্যায়ের নেতা কেন মাদকের কারবার করবেন, সেটা কোনো প্রশ্ন নয়। কারণ, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক বন্ধনের চেয়ে অর্থ কামানোর দর্শন প্রকট। যার ফলে আঞ্চলিক নেতৃত্বের মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্তগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখা যায়। দল কী চাইছে, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে এলাকায় নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে হলে কী করতে হবে, সেদিকটি। তাই বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যখন বিশেষ অভিযান চালিয়ে উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতিকে ইয়াবা, টাকাসহ আটক করে, তখন তা নিয়ে কিঞ্চিৎ ভাবতে হয়।
মাদকদ্রব্যসহ ধরা পড়া কোনো সহজ কথা নয়। এ জন্য যে শাস্তি, সেটাও কম নয়। তাহলে ক্ষমতায় থাকা বিএনপির এক স্থানীয় সভাপতিকে গ্রেপ্তার করা হলো কেন?
প্রথমে ইতিবাচকভাবেই বিষয়টি দেখা যাক। পুলিশ নির্ভয়ে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বিএনপির স্থানীয় সভাপতিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাহলে বুঝতেই হবে, পুলিশ আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ হত্যার যে ঘনঘটা চলেছিল, তার পর থেকে ইউনূস সরকারের পুরো সময়টাতেই পুলিশ পায়ের নিচে মাটি পায়নি। এখন যদি পুলিশ সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তবে অবশ্যই তারা সাধুবাদ পাবে। দল-মতনির্বিশেষে যেকোনো অপরাধীকে ধরাই তো পুলিশের কাজ। সে কাজটি তারা করতে পারলে সমাজ সুস্থ থাকে।
কিন্তু ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ যদি থাকে? এটা নিয়েই যত সমস্যা। এলাকায় ক্ষমতাসীন দলেরই আর কেউ নিজের প্রভাব খাটানোর জন্যই যদি পুলিশকে গোপন সংবাদ দিয়ে থাকে? এরও একটা ভালো দিক আছে। এলাকাকে মাদকমুক্ত করার জন্য বিএনপিরই কেউ অপরাধী নেতাকে ধরিয়ে দিয়েছেন। আর যদি এমন হয়, এই মাদক কারবারি নেতাকে সরিয়ে দিয়ে যিনি আসবেন, তিনি আরেক ডিগ্রি সরেস হয়ে থাকেন, তাহলে কী হবে? পুলিশ তখন কার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নতুন অপরাধীকে আটক করবে?
কথাটা উঠল এই কারণে যে, এখন মানুষ একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে। দলীয় রাজনীতি যেন সমাজকে, দেশকে গ্রাস করে না ফেলে, সেটা নিশ্চিত হওয়া দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত থাকবে, আলোচনা-বিতর্কের মাধ্যমে তারা তাদের মত প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে। জনগণ যাদের মতকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করবে, তারাই বসবে ক্ষমতায়। ক্ষমতার হাতবদল হবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে। ক্ষমতায় অবৈধভাবে টিকে থাকার জন্য কেউ কোনো ফন্দিফিকির করবে না। এ রকমই তো হওয়ার কথা! সেটা হবে তো?
হওয়া না-হওয়া নিয়ে সংশয় থেকে যাওয়ার কারণেই প্রশ্নগুলো ওঠে। বাবুগঞ্জ বিএনপির আহ্বায়ক রহমতপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতির আটক হওয়ার ঘটনাটিকে লজ্জাজনক বলে অভিহিত করেছেন। এই লজ্জাবোধ থাকা ভালো। ক্ষমতায় গেলে সবাই লজ্জাবোধ হারিয়ে ফেলে। এ ক্ষেত্রে অন্তত সেটা ঘটেনি। অপরাধী হলেই তাঁকে শাস্তির সম্মুখীন করা হবে—এ রকম একটি অঙ্গীকার করা গেলে ভালো হতো।