ছোট্ট একটা খবর ছাপা হয়েছে ১৮ সেপ্টেম্বরের আজকের পত্রিকার ৬ পৃষ্ঠায়। শিরোনাম, ‘১০ টাকায় ইলিশ বিক্রির ঘোষণা, না পেয়ে ঘেরাও’। খবরটি দেখে প্রথমেই চোখে ভেসে উঠল ক্ষুব্ধ হতদরিদ্র মানুষের অবয়ব। ইলিশ মাছ যে বহু আগেই সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে, সে কথা সবাই জানে। একটা আস্ত ইলিশ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য দেশের বহু মানুষেরই নেই। মাঝে মাঝে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হয়, ইলিশ মাছ যদি টুকরা করে বিক্রি করা হয়, তাহলে দরিদ্র মানুষ হয়তো কখনো কখনো এর আস্বাদ গ্রহণ করতে পারতেন। ভাবনাটা যুগোপযোগী বটে, কিন্তু এই হ্যাপা কে নেবে? সেদিক থেকে বিচার করলে ফরিদপুরের সদরপুরে দুস্থদের মধ্যে ১০ টাকায় একটা ইলিশ মাছ বিক্রির ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল—এ কথা অস্বীকার করা যাবে না।
যিনি এলাকার ৬০০ মানুষের মধ্যে ১০ টাকায় ইলিশ বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি পার্শ্ববর্তী চরভদ্রাসন এলাকার বাসিন্দা, বর্তমানে ঢাকায় ফ্ল্যাট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং অনেকের মতে, তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। এ থেকে বোঝা গেল, এটি নির্বাচনী গণসংযোগের একটি রূপও হতে পারে। ঘোষণা দিয়ে বেশ একটা চমক তিনি দেখাতে পেরেছেন, কিন্তু ৬০০ ইলিশ বিক্রি (যদিও রিপোর্টে বলা হচ্ছে বিতরণ, কিন্তু তাতে প্রতীকী ১০ টাকা দাম থাকায় একে বিক্রি বলাই ভালো) করতে গিয়ে সবকিছু যেভাবে তিনি লেজেগোবরে করে ফেলেছেন, তাতে দুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে কেবল, কোনো উপকার হয়নি। বিক্রির মাছ লুটপাট হয়ে গেছে।
১০ টাকায় ইলিশ বিক্রির ঘোষণা যদি নির্বাচনী প্রচারণার ভাবনা থেকে করা হয়ে থাকে, তাহলে তা খুবই খারাপ একটা নজির হয়ে থাকল। যদি সত্যিই তিনি স্থানীয় জনগণের উপকার করতে চান, তাহলে জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। কেন, কার জন্য, কোন আদর্শের অনুসারী হয়ে তিনি নির্বাচন করবেন, সে কথা জানানোর জন্য সেটাই প্রশস্ত পথ। ১০ টাকায় ইলিশ বিক্রির ঘোষণার মধ্যে একধরনের ‘পপুলিজম’ থাকে, সেটাও তাঁকে বুঝতে হবে।
যে হতদরিদ্র মানুষের দল ১০ টাকায় একটা ইলিশের জন্য কষ্ট করে এসেছিলেন, তাঁদের ক্ষোভ অপ্রত্যাশিত কোনো ব্যাপার নয়। এই মানুষের বড় একটি অংশ হয়তো বহুদিন ইলিশ মাছের স্বাদ পাননি। সুযোগটা আসায় তাঁদের মনে ইলিশ খাওয়ার যে প্রত্যাশা জেগেছিল, তা মাঠে মারা গেল। জনগণকে আগ্রহী করে তুলে পিছুটান দেওয়া হলে তা খুব খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। তাই এ ধরনের আগাম ঘোষণা দিয়ে মানুষের মনে আশার সঞ্চার করে তারপর বেলুনের মতো তা ফুটো করে দেওয়া হলে তাতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই পাওয়া যায়। জনগণের উপকারের কথা ভেবে জনগণকে বিপাকে ফেলছেন যাঁরা, তাঁদের সবাই ব্যাপারটা নিয়ে ভাববেন বলে আশা করি। কষ্টে থাকা মানুষের কষ্ট দূর করতে না পারলে তাঁকে কল্পিত আশার স্বপ্ন দেখাবেন না।