জমির নামজারি মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সেবা। জমির মালিকানা, উত্তরাধিকার কিংবা ক্রয়-বিক্রয়ের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে নামজারি প্রয়োজন হয়। এই সেবা পাওয়ার জন্য সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে। কিন্তু সেই নির্ধারিত ফির বাইরে যদি কোনো ভূমি কর্মকর্তা নিজের মতো করে ‘সুনির্দিষ্ট হারের রেট’ বেঁধে দেন, তাহলে সেটিকে ‘ঘুষ’ না বলে উপায় কী! বিশদভাবে বলা যায়, এটি নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি সরাসরি আঘাত। এই আঘাত হানার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর তানোরে ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সজীবের বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশে জমির নামজারি বা মিউটেশন করার জন্য সরকারি ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা। এই ফি দুটি ধাপে অনলাইনে প্রদান করতে হয়। এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ‘ভূমি তথ্য বাতায়ন’ নামের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। কিন্তু তানোরের ঘটনায় সেবাগ্রহীতা সাকিল আহমেদ অভিযোগ করেছেন, জমির নামজারির জন্য তাঁর কাছে আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন তানভীর। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানা অজুহাতে আবেদন আটকে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি ৫০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন। নামজারি অনুমোদনের পর আবার হোল্ডিং খোলার জন্য ৫ হাজার টাকা দাবি এবং টাকা না দেওয়ায় দীর্ঘ সময় তাঁকে অফিসে বসিয়ে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, অনুমোদিত নামজারি ৪৩ দিনের মাথায় বাতিল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। ভুক্তভোগী ব্যক্তির দাবি, নির্ধারিত ‘রেট’ অনুযায়ী টাকা না দেওয়ায় এমনটি করা হয়েছে। এমনকি পরে ওই কর্মকর্তা নিজে বিষয়টি ঠিক করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন—এমন একটি কল রেকর্ডও নিজের কাছে থাকার দাবি করেছেন অভিযোগকারী। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের বিষয়; তবে অভিযোগের ধরন এত গুরুতর যে এটিকে সাধারণ দাপ্তরিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভূমি অফিস নিয়ে মানুষের ভোগান্তির অভিযোগ নতুন নয়। জমির কাগজপত্রের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং তথ্যের ঘাটতি কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী যদি ঘুষের সুযোগ তৈরি করেন, তাহলে ডিজিটাল ভূমিসেবা চালুর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। অনলাইনে আবেদন করার পরও যদি নাগরিককে একই পুরোনো হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তবে প্রযুক্তির আধুনিকতা কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন—দৃশ্যমান উন্নয়ন নয়।
এই ঘটনায় অভিযোগকারী ভূমি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে অভিযোগ করেছেন। এখন প্রয়োজন অভিযোগটির নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নামজারি বাতিলের সিদ্ধান্তের বৈধতা, প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি।
ভূমিসেবা কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়। একজন নাগরিক নির্ধারিত ফি দিয়ে আইনসম্মত সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। সেই সেবার জন্য যদি রেট নির্ধারণ করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের নিয়ম আর দুর্নীতি-অনিয়মের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।