হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

সারের সংকট

সম্পাদকীয়

‘দেশে সারের কোনো সংকট নেই’—এ কথা বলেছেন খোদ কৃষিমন্ত্রী। অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, যশোর কিংবা মেহেরপুরের মতো দেশের প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলোতে আমন মৌসুমে সারের জন্য কৃষকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কারণ তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। আবার যা পাচ্ছেন, তারও দাম নেওয়া হচ্ছে সরকারনির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি। বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও পটাশ সার কিনতে গিয়ে তাঁদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। দোকানে ন্যায্যমূল্যে সার মিলছে না, বলা হচ্ছে ‘সার নেই’; কিন্তু অতিরিক্ত টাকা হাতে দিলেই সেই সার ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে!

সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসাধু চক্র যে প্রতারণার জাল বিছিয়েছে, তা শুধু কৃষকের মনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়াচ্ছে না, বরং আমন মৌসুমের শুরুতে এভাবে সারের সংকট সৃষ্টি হলে তা পুরো কৃষিব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে মৌখিক আশ্বাস, সান্ত্বনা কিংবা বিচ্ছিন্ন কিছু জরিমানা করে এ অরাজক পরিস্থিতিকে দূর করা সম্ভব নয়। বরং জরুরি দরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

কয়েক দিন আগে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের মেসার্স শাহ আমানত ডিলারের দোকান থেকে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা ১৯৭ বস্তা সার লুট করে নিয়ে গেছে। এ ঘটনাই প্রমাণ করে দেশের নানা জেলায় সারের জন্য কী রকম হাহাকার চলছে!

আমরা মন্ত্রীর কথায় আশ্বস্ত হয়ে বলতে চাই, সারের সংকট নেই; কিন্তু ন্যায্যমূল্যে কৃষকেরা সার না পেলে মন্ত্রীর এই কথার কি কোনো দাম থাকে? বরং মন্ত্রী যদি সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির কারিগর ডিলার ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলতেন, তাহলে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেতাম। কিন্তু তিনি সারের সংকট তৈরির কুশীলবদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কোনো কথা বলেননি। তাহলে সাধারণ কৃষকেরা কীভাবে সারের সংকট থেকে মুক্তি পাবেন? এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে লুকিয়ে আছে সমস্যা সমাধানের উপায়।

স্যারের এই সংকট সমাধানে জরুরি কাজ হলো, বিতরণ ও বিপণনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় আনা। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কোন ডিলার কতটুকু সার বরাদ্দ পাচ্ছেন এবং তা সরকারি দামে কোন কোন কৃষকের কাছে বিক্রি হচ্ছে, তার ডিজিটাল রেকর্ড থাকতে হবে। প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে সারের মজুত ও সরকারনির্ধারিত মূল্যের তালিকা টাঙানো বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক।

একই সঙ্গে প্রতিটি জায়গায় মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে এবং সেই কমিটিতে স্থানীয় কৃষক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর অসৎ ব্যবসায়ীরা প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। পাশাপাশি প্রতিটি জেলা-উপজেলায় সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য সার্বক্ষণিক হটলাইন সেবা চালু করতে হবে। কৃষকেরা অভিযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।