হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

ফয়েজ আহাম্মদ ও কিশোর গ্যাং

সম্পাদকীয়

ফয়েজ আহাম্মদ রিকশা চালাতেন। ১১ জুন মধ্যরাতে নিজের রিকশা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু তাঁকে মাদকসেবী আখ্যা দিয়ে একদল লোক লাঠি ও রড দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। রক্তাক্ত এই হতভাগ্য লোকটিকে রাস্তায় ফেলে চলে যায় বীরপুঙ্গবেরা। স্থানীয় লোকেরা হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।

আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর শাকতলা ছিদ্দিকিয়া আলিয়া মাদ্রাসার পূর্ব পাশে ও পরে নদোনা আছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন সড়কে এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পূর্বশত্রুতার জেরে ফয়েজকে মাদকসেবী হিসেবে অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করা হয়েছিল। সেই মবের হামলায় প্রাণ হারান এই রিকশাচালক। আর এই মবের সঙ্গে যুক্ত ছিল কিশোর বয়সী ছেলেরা। ধরা পড়া দুই কিশোর স্বীকারোক্তিও দিয়েছে।

মানুষের প্রাণের দাম এত সস্তা কি কোনো কালে ছিল? যেকোনো মানুষকে যেকোনো অপবাদ দিয়ে মব সৃষ্টি করে মেরে ফেলা এখন যেন জলবৎ তরলং। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থা রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এখন মনে হয় নিজের নিরাপত্তার ভার নিজের হাতে তুলে নিতে হবে। কিন্তু উদ্দেশ্যমূলকভাবে মব তৈরি করে যদি কোনো দুর্বৃত্তের দল মানুষের ওপর হামলে পড়ে, তাহলে পূর্বসতর্কতা নেওয়ার কি সময় পাওয়া যাবে?

ইউনূস আমলকে যে কয়েকটি প্রতীক দিয়ে চিহ্নিত করা যায়, তার একটি হচ্ছে মব সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি ইউনূস আমলে যেভাবে বিকশিত হয়েছিল, তার নজির আগে কখনো ছিল না। বর্তমান সরকারও মব নামক সেই বিশাল ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে বশে আনতে পারেনি; বরং কিশোরদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহভাবে। এমন এক সময় এই দেশ পার করছে, যখন অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে নেই তাদের সন্তানেরা। ঘরে যে সন্তানেরা সাত চড়ে রা কাড়ে না, সেই সন্তান বাইরে গিয়ে কখন কার ওপর ছুরি চালাচ্ছে, কাকে পশুর মতো চাবকাচ্ছে, কাকে হত্যা করছে; সে ব্যাপারে অভিভাবকেরা জানতে পারেন ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর। এই কিশোরদের নিয়ে কোন ভবিষ্যতের দিকে যাবে দেশ, তা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিকতা নেই।

আমাদের অভিভাবকেরা কি জানেন, তাঁদের সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে? তাঁরা কি বিশ্লেষণ করে দেখেন, তাঁর সন্তানের হাতে অতিরিক্ত টাকা আসছে কি না, হঠাৎ তার আচরণে পরিবর্তন আসছে কি না, তার মধ্যে মারামারির প্রবণতা বিকশিত হচ্ছে কি না। যে শিক্ষালয়ে যাচ্ছে কিশোর, সেই প্রতিষ্ঠানকে শুধু পড়াশোনা করে ভালো জিপিএ পাওয়ার কারখানা না ভেবে সেখানে নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার কাজটি বহু আগে শুরু করা উচিত ছিল। খেলার মাঠ, সংস্কৃতি কেন্দ্র, পাঠাগার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইত্যাদিতে যুক্ত হলে শিশু-কিশোরের মন অপরাধের দিকে কম যায়। কীভাবে কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখা যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করা জরুরি। নইলে মব সন্ত্রাসে পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে মানুষের জীবন।