রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ইত্যাদির ব্যাপারে কিছু বলতে গেলেই এত সব ‘যদি কিন্তু’ এসে হাজির হয় যে কোনটা নিয়ে লেখা দরকার, তা বুঝতেই সময় চলে যায়। আশা ও আশাভঙ্গ নিয়ে এত কিছুবলার আছে যে হিসাব করে তার নাগাল পাওয়া দুষ্কর। এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও অন্যদের দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে আটকে রাখার নিন্দা জানিয়েছে। এ ব্যাপারে এইচআরডব্লিউ স্পষ্ট করে বলেছে, ‘শেখ হাসিনা সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন। তবে অনেককেই কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ ছাড়াই বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের পরিবার ও আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের অনেকেই বয়স্ক এবং কেউ কেউ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এরপরও তাঁদের জামিন, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।’
কথাগুলো ভেবে দেখার মতো। তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের এমন অন্তত ১০ জন পদধারী ব্যক্তি কারাগারে মারা গেছেন, যাঁদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই কোনো অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি। এই কথাগুলো ছাড়াও সংগঠনটি এ কথাও বলেছে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তাঁর উচিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দীর্ঘস্থায়ী ও নির্বিচার আটক বন্ধ করা।
বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা কোনো মানবিক কাজ হতে পারে না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিনা বিচারে আটক রাখার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা কার আমলে ঘটল, সেটা বড় কথা নয়। যেন না ঘটে, সেটাই সবার আরাধ্য হওয়া উচিত। বিনা বিচারে আটকে রাখার অর্থই হলো, পরমতসহিষ্ণুতার অভাব। আমাদের এতটাই দুর্ভাগ্য যে ক্ষমতায় থাকা দল কখনোই এই অন্যায়গুলোর ভেতর অন্যায় দেখতে পায় না, আর বিরোধী দল ক্ষমতায় যাওয়ার আগে জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা ক্ষমতায় গেলে এহেন ঘটনার অবসান ঘটবে। কিন্তু ক্ষমতার রদবদলের পরও সেই প্রতিহিংসার রাজনীতি টিকে থাকে। আগের নির্যাতিত নেতা ক্ষমতায় এসে রাজহাঁসের মতোই শরীর থেকে পানি ঝরিয়ে ফেলে সেই অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিহিংসার রাজনীতি ছাড়তে হবে। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, জামিন পাওয়ার অধিকার খর্ব করে শ্যোন আরেস্ট দেখানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকবে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য জনদরদি কাজে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলকে রাজনীতির বাইরে রাখার প্রবণতা যে কোনো সুফল দেয় না, তার ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। শুভবুদ্ধির উদয় না হলে এই অপরাজনীতির ঐতিহ্য থেকে বের হওয়া যাবে না।
আইনের শাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন যে আমাদের রাজনীতির সঙ্গে আইনের শাসন খাপ খাচ্ছে না, তার উত্তর কে দেবে?