রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ-ফ্যামিলি প্ল্যানিং (এমসিএইচ-এফপি) সেন্টারে ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় কার্যালয়ের বিভিন্ন জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী ও টিকাদানের সরঞ্জাম লুট করা হয়েছে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ ৫০ বছরের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠান দরিদ্র, অসহায় ও নিম্ন আয়ের মা এবং শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতিসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। নামমাত্র খরচে এখান থেকে দরিদ্র ব্যক্তিরা সেবা পেয়ে থাকেন।
সেদিনের ঘটনায় টিকা দেওয়ার রেজিস্টার খাতা লুট হয়েছে। এই খাতায় লেখা থাকে কোন শিশু কোন টিকা পেয়েছে, কোনটা বাকি রয়েছে। খাতা না থাকলে অনেক শিশুর পরের ডোজ মিস হবে, কেউ খোঁজও পাবে না। দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন চুরি হয়েছে। ফলে এই এলাকার যে গর্ভবতী মায়েরা প্রাইভেট ক্লিনিকে টাকা দিয়ে আলট্রাসাউন্ড করাতে পারেন না, তাঁরা এখন কোথায় যাবেন?
হামলাকারীরা এমসিএইচ-এফপির জমির সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লি.’ লেখা একটি সাইনবোর্ডও লাগিয়ে দিয়ে গেছে। এলাকাবাসীর মতে, রাড্ডার প্রায় ১০ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার নেতৃত্বে জমিটি দখলের উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে এবং লুটপাটকারীদের পাহারা দিয়েছেন স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতারা। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এসব কথা অস্বীকার করেছেন।
এদিকে ঘটনার পরদিন শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি। শাহ আলী থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ জন লোক ভারী মেশিন নিয়ে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র মাটিতে মিশিয়ে দিল; কিন্তু পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নিল না। পরে রাতে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
এখন পর্যন্ত পুলিশ যাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরা ভাড়া করা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। আসল কুশীলবেরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রশ্ন হলো, এটা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? কুয়াকাটায় দোকান দখল, লালমনিরহাটে আদালতে বিচারাধীন জমি দখল, নারায়ণগঞ্জের বন্দরে পুলিশের সহযোগিতায় বাড়ি দখল—একের পর এক অভিযোগ এসেছে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। কিছু নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু বহিষ্কার তো বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
রাড্ডার ঘটনাটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম উদাসীনতা ও রহস্যজনক নীরবতা। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জমি দখলের চক্রান্ত কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চালানো এই তাণ্ডব স্পষ্ট করে দেয়, আইনের প্রয়োগ শিথিল হলে দখলদার গোষ্ঠী কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। এখন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে দখলদারদের পেশিশক্তি বড়, নাকি আইনের শাসন ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।