হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

পাসহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

সম্পাদকীয়

রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও সিরাজগঞ্জের বেশ কিছু মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ১২ থেকে ১৬ জন শিক্ষকের বিপরীতে পরীক্ষার্থী মাত্র দুই থেকে পাঁচজন, অথচ একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ ধরনের লজ্জাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া শুধু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে হতে পারে না। এর দায় শুধু এককভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়; বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং শিক্ষক ও প্রশাসন—উভয় পক্ষের দায়িত্বজ্ঞানহীনতাও দায়ী।

এ রকম খারাপ ফল হওয়ার জন্য শিক্ষকদের কথাগুলো শুধু যুক্তিহীন নয়, একই সঙ্গে তাঁদের দায়িত্বহীনতারও পরিচয় ফুটে উঠেছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার কারণে পরীক্ষার্থীদের ভয় পাওয়ার কারণে ফল খারাপ হয়েছে—এ কোনো যুক্তিসংগত কথা হতে পারে না। শিক্ষকতা যেখানে নীতি-নৈতিকতা ও উপযুক্ত দিকনির্দেশনার জায়গা, সেখানে শিক্ষার্থীদের ভয়ের অজুহাত দিয়ে দায় এড়ানো শিক্ষকদের পেশাগত অবহেলাই প্রমাণ করে।

আবার শিক্ষকদের অযোগ্যতাকে এককভাবে দায়ী করা যাবে না; অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি ও শিক্ষায় বৈষম্যও এই ফলাফলের জন্য দায়ী।

সংবাদসূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের চরটেংরাইল দাখিল মাদ্রাসা কিংবা লালমনিরহাটের এ এম রথবাড়ী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না। সংসার চালাতে তো অর্থের দরকার। যেখানে একজন শিক্ষক পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে সক্ষম হন না, সেখানে তাঁর কাছ থেকে একাগ্র পাঠদান আশা করা অন্যায়। এ ছাড়া বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের তীব্র অভাব এবং কাঠামোগত সমস্যাও পাঠদানের পরিবেশ নষ্ট করেছে। আবার কোনো স্কুল বা মাদ্রাসায় যখন শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যার আনুপাতিক হারের অসামঞ্জস্য দেখা যায়, তখন বুঝতে হবে সেখানে কোনো সংকট ছিল।

এ রকম ফল হওয়ার পেছনে শিক্ষা কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা ও দায়সারা তদারকি অনেকাংশে দায়ী। বছরের পর বছর ধরে নতুন নতুন স্কুল-মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত হচ্ছে, কিন্তু সেখানে গুণগত শিক্ষার মান নিশ্চিত হচ্ছে কি না, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক আছেন কি না, কিংবা নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে কি না—তা নজরদারি কেন করা হবে না?

ফল প্রকাশের পর শোকজ করা বা প্রশাসনিকভাবে হুমকি দেওয়া সাময়িক সমাধান হতে পারে, কিন্তু সমস্যার গভীরে গিয়ে তা সমাধানের স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেবল জাঁকজমকপূর্ণ ভবন নির্মাণ বা শিক্ষক নিয়োগের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, তা নির্ভর করে শিক্ষার গুণগত মান এবং স্বচ্ছ জবাবদিহির ওপর। শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেসব শিক্ষক দায়িত্বে অবহেলা করেছেন, তাঁদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা কেন প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেননি, সে দায় তাঁরা এড়াতে পারেন না।

এখন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।