গাজীপুরে ফুলচান মিয়া যে কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা এই বাংলায় যে একেবারেই ঘটে না, তা নয়। এমনকি বলিউডের ‘দৃশ্যম’ চলচ্চিত্রে এক কিশোরীর স্নানের দৃশ্য ভিডিও করেছিল এক ডাকসাইটে পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে, তা থেকেই সিনেমাটায় শুরু হয়েছিল সাসপেন্স আর ড্রামা। ফুলচান মিয়া নিশ্চয় দৃশ্যম চলচ্চিত্র দেখে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুরে কিশোরীর স্নানের দৃশ্যটি ভিডিও করেননি। কারণ, সেই দৃশ্য দেখে নকল করলে জানটাই চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। মানে, সেই সিনেমাটায় ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেল করতে চাওয়া ছেলেটি নাটকীয়ভাবেই অক্কা পায়। তাই নিশ্চিত বলা যায়, ফুলচান মিয়ার নিশ্চয় অক্কা পাওয়ার সাধ হয়নি। তিনি নিজের জৈবিক তৃষ্ণা মেটানোর অভিপ্রায়েই এই অকাণ্ড করেছেন।
কেন হঠাৎ এক কিশোরীর স্নানের দৃশ্য ভিডিও করতে হবে, সে কথা তাঁর কাছ থেকে কি শোনা হয়েছে? এই স্বীকারোক্তির একটা সামাজিক মূল্য আছে। বিবাহিত এই পুরুষ তাঁর পারলারে চাকরিরত স্ত্রীকে নিয়ে তো সুখেই ছিলেন। তারপরও হঠাৎ করে কিশোরীর দিকে কেন তাঁর মোবাইল ফোনের ক্যামেরা তাক করলেন তিনি? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পারলে দেখা যাবে, আমাদের মধ্যে অনেকে নিজের মধ্যে একজন ‘তৃষ্ণার্ত’ ফুলচান মিয়াকে ধারণ করে বসে আছেন! ‘গুপ্ত’ হয়ে বসে থাকা এই ফুলচান মিয়ারা সুযোগ পেলেই তাঁদের বীরত্ব দেখিয়ে দেন। লুকিয়ে ভিডিও করছিলেন ফুলচান মিয়া। কিন্তু স্থানীয় কারও কারও নজরে পড়ে যান তিনি। ফলে স্নানের দৃশ্য লাটে ওঠে আর শরীরে পড়ে কিছু উত্তমমধ্যম। এরপর সোজা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে হাজির করা হলে তাঁকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
যে ছয় মাস কারাগারে সময় কাটাবেন ফুলচান মিয়া, সেই সময় তাঁর স্ত্রী কেমন থাকবেন, সে কথা কেউ জানে না। কাজের তাড়নায় ছয় মাস আগে তাঁরা রংপুরের গঙ্গাচড়া থেকে গাজীপুরে এসেছেন। তারপরই এই কাণ্ড! ছয় মাস পর ফুলচান মিয়া যখন বাড়ি ফিরবেন, তখন কি এই বাড়ি সেই বাড়িই থাকবে? ফুলচানের স্ত্রী কি ফুলচানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবেন? নাকি অন্য কিছু ঘটবে তাঁদের জীবনে? কিছুই জানা নেই আমাদের।
সামাজিক সম্পর্কগুলো অতি দ্রুত কেন ভেঙে পড়ছে, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের হাতে এখন স্মার্ট ফোন এসে পড়ায় সবাই নিজেকে সৃজনশীল শিল্পী ভাবতে শুরু করেছে। এক-একজন যেন আলফ্রেড হিচকক, সত্যজিৎ রায়! স্মার্টফোনের ভিডিও ক্যামেরাটি যে কারও দিকে যেকোনো সময় তাক করা যেন কোনো ব্যাপারই নয়। এর সঙ্গে যদি অপরাধী মন যুক্ত হয়, তাহলে ঘটনা কোন দিকে যায়, তারই একটি প্রমাণ দিয়েছেন ফুলচান মিয়া।
এ রকম ফুলচানদের সংখ্যা যদি বাড়তে থাকে, তাহলে সামাজিক বন্ধনগুলো প্রতিদিন ঢিলে হতে থাকবে, যা খুবই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এই ধরনের আচরণ থেকে সবার সতর্ক হওয়া দরকার।