নারীটির সঙ্গে ছিল দুটি শিশু। এই নারীর পোশাক-আশাক দেখে মনে হবে ধর্মীয় আচার-আচরণে সিদ্ধ একজন মানুষ। কক্সবাজারের উখিয়া থেকে তাঁরা আসছিলেন চট্টগ্রামে। একজন নারী, সঙ্গে দুটি শিশু যদি উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে আসে, তাহলে তার মধ্যে কোনো নাটকীয়তা খোঁজার কী আছে? স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার তো সবার আছে। তাহলে বিষয়টি নিয়ে লিখতে হচ্ছে কেন?
লিখতে হচ্ছে এই কারণে যে শিশু দুটি ছিল এই ভয়ংকর নারীর শিকার। লোভ দেখিয়ে ওদের মাদক পাচারকারী বানিয়েছিলেন এই নিষ্ঠুর নারী। নারীর পেছনে ছিল মাদক পাচারকারীর দল। শিশু দুটির পেটে ছোট ছোট প্লাস্টিকের প্যাকেটে ছিল মোট ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা। নিরাপদে এই ইয়াবা চট্টগ্রামে আনার জন্যই ব্যবহার করা হচ্ছিল শিশু দুটিকে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে র্যাব এদের আটক করে।
বেদনাদায়ক এই কাহিনি পড়ার সময় ২০০৪ সালে নির্মিত ‘মারিয়া ফুল অব গ্রেস’ নামের চলচ্চিত্রটির কথা অনেকের মনে পড়ে যাবে। স্প্যানিশ ভাষায় নির্মিত এই ছবি ছিল কলম্বিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। কলম্বিয়ার এক দরিদ্র এলাকায় ফুলের খামারে কাজ করা ১৭ বছর বয়সী মারিয়া আলভারেজের গল্প এটি। ফুলের খামারে কাজ করতে করতেই একসময় গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল মেয়েটি। প্রেমিককে সে বিয়ে করে না। কাজ ছেড়ে দেয়।
বোগোতায় এসে নতুন কাজ খোঁজে। এখানেই ফ্রাঙ্কলিন নামে এক যুবক মারিয়াকে অনেক টাকা উপার্জনের পথ বাতলে দেয়। ৬২টি মাদকের প্যাকেট গিলে ফেলে মারিয়া। তারপর বিমানে করে নিউইয়র্কে আসে। যাঁরা সিনেমাটি দেখেননি, তাঁরা যেন স্পয়লারের কারণে ছবিটি দেখার আগ্রহ না হারান, সে জন্য পুরো কাহিনি বলা হলো না।
ইয়াবা ব্যবসা কীভাবে সচল থাকে, তার একটা নমুনা দেখা গেল এই মাদক-কাণ্ডে। প্লাস্টিকে পেঁচিয়ে ছোট ছোট ক্যাপসুলের মতো বানিয়ে যখন শিশুদের গেলানো হচ্ছিল এই মাদক, তখন কি এই শিশুরা জানত, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তারা জড়িয়েছে? দুর্ঘটনাবশত এই ক্যাপসুলের কোনো একটি যদি অন্ত্রে আটকে যেত কিংবা ফুটো হয়ে যেত, তাহলে গুরুতর শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারত, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারত। শিশু দুটির বয়সের কথাও ভাবুন। একটি শিশুর বয়স ৯, অন্যটির ১২। যে নারী এই ইয়াবায় পরিপূর্ণ মানুষ দুটিকে নিয়ে যাচ্ছিল, তিনিও যে মাদক পাচারকারী চক্রের একজন সদস্য, সে কথা বলে দেওয়ার কিছু নেই। দুঃখজনক সত্য হলো, এই চুনোপুঁটিরা হয়তো র্যাব বা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, কিন্তু রাঘববোয়ালেরা থেকে যায় দৃষ্টির আড়ালেই। কক্সবাজার দিয়ে যেভাবে ইয়াবা ঢোকে, তা আটকানোর কোনো উপায়ই কি জানা নেই আমাদের গোয়েন্দাদের? নাকি এই ব্যবসা এতটা লাভজনক যে আটকানোর উপায় নিয়েই ভাবে না কেউ?
প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা! মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স যত দিন কথার কথা হয়ে থাকবে, তত দিন কেউই মাদক থেকে নিরাপদ নয়, সে কথা বোঝা কি এতই কঠিন?