নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকাতে নিজেই গেছে ইউএনওর কাছে। এযাত্রা মেয়েটা এই বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে বেঁচে গেল। অভাবের সংসারে চার মেয়ের মধ্যে তিনজনের বিয়ে দিয়েছেন মা। বাকি এই মেয়েকে বিয়ে দিতে পারলে বিধবা নারীটি হয়তো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতেন। কিন্তু ১৫ বছর বয়সী একটি মেয়েকে বিয়ে দিলে কী ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, সেটা নিশ্চয় এখন বুঝতে পারছেন মা। মেয়েটি এখন পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া এই শিক্ষার্থী একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। বিয়ে দেওয়া হচ্ছে জানতে পেরে মেয়েটা প্রথমে থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইউএনওর কার্যালয়ে। সেখানেই সে তার স্বপ্নের কথা বলে। বড় হয়ে পুলিশ হতে চায় সে।
দেশের সামাজিক চিত্রটি মোটেই সুখপ্রদ নয়। দারিদ্র্যের কারণে এমন অনেক ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটে, যার ব্যাখ্যা মেলা ভার। হিতোপদেশ দেওয়া অনেক সোজা, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় অনেক সহজ ও সত্য কথাও হালে পানি পায় না। বাল্যবিবাহ তেমনই একটা বিষয়। বাল্যবিবাহ যে ভালো নয়, সে প্রচারণা রয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকা বা কিশোরীকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। কিন্তু অভাবের তাড়নায় সে কথা অনেকে ভুলে যায়। যেমন ভুলে গেছেন এই মেয়েটির মা। কোনো মা-ই চান না তাঁর মেয়ের অকল্যাণ হোক। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁকে অসহায় করে তোলে। যেকোনোভাবে এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাল্যবিবাহের ঘটনা শুধু দারিদ্র্যের কারণেই ঘটে, এমন নয়। উপযুক্ত শিক্ষার অভাব এর একটি প্রধান কারণ। স্কুল যদি দূরে হয়, পড়াশোনার খরচ যদি বেশি হয়, তাহলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা অনেক। মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাবা-মায়ের কর্তব্য—এ রকম একটি ধারণা থেকেও মেয়ে সন্তানকে পড়াশোনা থেকে ছাড়িয়ে এনে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হয়। মেয়ে যদি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে—এই ভয়ও অনেক সময় অভিভাবকদের মতিভ্রম ঘটায় এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করে। পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কথাও ভুললে চলবে না। ‘এমন ভালো পাত্র আর পাওয়া যাবে না’—এই কথা বলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য করে মানুষ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যার কারণেও কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, অনেক সময় পরিবারের পক্ষ থেকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ যার বিয়ে হচ্ছে, সেই মেয়েটির ইচ্ছার কোনো দাম সেখানে থাকে না। পরিবারের লোকজন ধরেই নেয় যে মেয়ের ভালোর জন্য তারা তার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই বিষয়গুলো এক করলে আমরা দেখতে পাব, মূলত দারিদ্র্যই শুধু সমস্যা নয়, ক্ষমতা, পিতৃতন্ত্র, যৌনতা নিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক সম্মান ইত্যাদিও বাল্যবিবাহের মুখ্য কারণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই মেয়েটির স্বপ্ন পূরণ হোক, সেটাই আমাদের কামনা।