স্বাধীন এই দেশে কত কিছুই না স্বাধীনভাবে করা যায়! মূল স্বাধীনতা অর্জনকে প্রশ্নের মুখে ফেলে বদমাশিপনার স্বাধীনতার রমরমা দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। নানা ধরনের অনিয়মের কথা না বলে এখানে শুধু ট্রেনের টিকিটের স্বাধীনতার কথা বলি। বাংলাদেশের ট্রেন রুটগুলো সম্ভবত ঠিক করেছে, তাদের ট্রেনের টিকিটগুলোকে পরাধীন থাকতে দেবে না। তারা যেন স্বাধীনভাবে যে কারও হাতে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে পৌঁছে যেতে পারে, তার নিশ্চয়তাও পেয়ে গেছে টিকিটগুলো। আর তাই অনলাইনে ট্রেনের টিকিট বিক্রি হওয়া শুরু হতেই ভোজবাজির মতো হাওয়া হয়ে যায় টিকিট। কীভাবে তা সম্ভব, সেটা একমাত্র বাংলাদেশের স্বাধীন এক্সপার্ট বা বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন। এই বিশেষজ্ঞরা জানেন, কীভাবে এক মিনিটের মধ্যে শত শত টিকিট গায়েব করে দেওয়া যায়!
৭ অক্টোবর আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে টিকিটের এই স্বাধীন ঘোরাফেরায় অসন্তুষ্ট ছিল চট্টগ্রাম আর সিলেটবাসী। দুই রুটেই টিকিটের এই স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি। এ দুই রুটেই সিন্ডিকেট যোদ্ধারা বিজয়ীর বেশে হাতিয়ে নিচ্ছে ট্রেনের টিকিট। অনলাইনে ১ মিনিটের মধ্যে টিকিট হাওয়া হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নজরে পড়ায় সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে আমলি-১১ মামলা করেছেন। মামলা তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ পর্যন্ত সব ঠিক আছে। কিন্তু মুশকিল হলো, যে সিন্ডিকেট নিয়ে কথা হচ্ছে, সে সিন্ডিকেটের হাত কতটা লম্বা, সেটা উপলব্ধি করতে না পারলে কোনো ধরনের তদন্তই শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারবে না। তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই বলেছেন, ফুল ডেটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা বুঝতে পারছেন যে এটিতে বিশাল সিন্ডিকেট জড়িত। কিন্তু এই সিন্ডিকেট ঠিক কোন পথগুলো দিয়ে অনলাইনে ঢুকে মিনিটের মধ্যেই টিকিট গায়েব করে দিচ্ছে, তা কি আদৌ জানা যাবে? জানা গেলেও এই অনৈতিক কাণ্ডের নাটের গুরুরা কি চিহ্নিত হবেন? চিহ্নিত হলে তাঁদের কি সত্যিই ধরা হবে? ধরা হলে তাঁদের কি বিচার হবে?
পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘আদালত মনে করেন, ট্রেনের টিকিট বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে কারও কারও সহায়তায় কয়েকটি চক্র মুহূর্তেই ট্রেনের সব টিকিট কিনে নিয়ে বেশি মূল্যে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের হয়রানির পাশাপাশি পর্যটনশিল্পের বিকাশেও অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন আদালত।’ যথার্থ পর্যবেক্ষণ। কিন্তু তদন্তের ফলাফল সত্যিই ইতিবাচক হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ যায় না আমাদের।
স্বাধীন এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া দরকার। কথাটা বলা সহজ, কিন্তু করা কঠিন। এই যে কোটি কোটি টাকার খেলা চলছে, সে খেলার কুশীলব কারা, তা কি আদৌ জানা যাবে? তাঁদের লম্বা হাতে কি তদন্তের হাতকড়া পরানো যাবে? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ কাজ নয়। কারণ স্বাধীনতার নামে কত ধরনের অনিয়ম যে দেখেছে এ দেশ, তার কি ইয়ত্তা আছে?