অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক। তিনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে গবেষণা করেছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায়। আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকার গণপরিবহন, যানজট সমস্যা এবং এর সমাধান কীভাবে সম্ভব—এসব বিষয়ে তাঁর সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই ঢাকার যানজট কমাতে আপনার ও অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনের মতামত নিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। আপনাদের সেই পরিকল্পনাগুলো কেন বাস্তবায়িত হলো না?
পরিকল্পনার আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে বেশির ভাগটাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কিছু বিষয় আংশিকভাবে দৃশ্যমান করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের ট্রাফিক সিগন্যাল পাইলটিং করার কাজটি সাতটা জায়গায় অপারেশনে আছে। যদিও ২২টি ইন্টার সেকশন করার কথা ছিল। আমি বলতে চাই, আসলে টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বাস্তবায়নে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ থাকে না। চ্যালেঞ্জটা হলো নীতিগত পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে।
আমাদের সুপারিশের মধ্যে অনেকগুলো নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল। সেই নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করতে হবে। যাতে পরিবহন সেক্টর একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে পারে। যানজট যাতে সহনীয় পর্যায়ে আসে। কারণ, পুরোপুরি যানজট যাবে না। তবে সেটাকে সহনীয় মাত্রায় আনা দরকার।
আমাদের প্রস্তাবে পলিসি ইস্যু ছিল, বিনিয়োগের কোনো ব্যাপার ছিল না। আসলে সদিচ্ছা এবং বাস্তবায়ন করার জন্য যে ধরনের দৃঢ় মনোবল থাকার কথা ছিল, সেখানে একটা ঘাটতি ছিল। আমাদের প্রস্তাবে অনেক বিষয়ের মধ্যে একটা ছিল বাসস্টপেজের মধ্যেই বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর কথা। এটা তো বিনিয়োগের বিষয় নয়। এটা ব্যবস্থাপনা ইস্যু বা নীতিগত বিষয়। পৃথিবীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহরে বাসস্টপেজেই যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। সেটা তো বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা বলেছিলাম, বিশেষ করে অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল-বেদখল, ফিটনেসহীন গাড়ি, তিন চাকার যানবাহন যাদের কোনো নিবন্ধন নেই, রুট পারমিট নেই—এসব সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। অন্তত মূল সড়কে এগুলোকে না ঢুকতে দেওয়া। শাখা সড়কে আপাতত চলতে পারে। কারণ, মূল সড়ক হলো মানবদেহের ধমনির মতো।
এগুলো করতে তো কোনো বিনিয়োগের দরকার ছিল না। এগুলো সবই ছিল পলিসি ইস্যু। সত্যি কথা হলো, আমাদের কালচার হলো টেকন্যিকাল বিনিয়োগের বিষয়গুলো কিছুটা হলেও আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি, কিন্তু যখনই পলিসিগত পরিবর্তনের বিষয় আসে, তখনই আমার কেন জানি হোঁচট খেয়ে যাই। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রেও পলিসিগত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য কোনো ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল না। আমরা আলাদা কিছু বলিনি। সে জায়গা থেকে বলব, যখন কোনো নীতিগত বিষয়ে কাজ করার ব্যাপার আসে, আমরা অতীতেও দেখেছি আগের সরকারও হোঁচট খেয়েছে, এবারও অন্তর্বর্তী সরকার হোঁচট খেয়ে গেল।
এবার তো একটু বেশি সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু না হওয়ার কারণ কী?
রাজনৈতিক সরকারের অনেক ধরনের ম্যান্ডেটের ব্যাপার থাকে। নেতা-কর্মীদের কাছে অনেক ধরনের দায়বদ্ধতা থাকে। দলগুলো জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা শুধু মুখে বলে। কিন্তু নেতা-কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতা বেশি দেখায়। তবে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক সরকার না। এটা অরাজনৈতিক সরকার। তাদের তো এ রকমভাবে নেতা-কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকার বিষয় না। তাদের আসলে জনগণের প্রতি বেশি দায়বদ্ধ থাকার কথা ছিল। তারা যেহেতু অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় এসেছে, সেহেতু সেই সময়ের মধ্যে যতটুকু করা যায়, সেভাবেই আমরা কিন্তু প্রস্তাব দিয়েছিলাম। যাতে করে ত্বরিত গতিতে কাজগুলো করা যায়। আমি বলব, না করার বিষয়ে বড় কারণ হলো, সরকারের তো অনেকগুলো অঙ্গ আছে, মানে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে সরকার পরিচালিত হয়; সবাই যদি সহযোগী ভূমিকা পালন না করে, তাহলে সরকার একা কিছু করতে পারে না।
নীতিগত সিদ্ধান্ত বিষয়ে আমরা করণীয় নিয়ে যে কথাগুলো বলেছিলাম, সেগুলোর বেশির ভাগ ছিল ব্যবস্থাপনাগত ইস্যু। এটার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিষ্ক্রিয়তা একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। সরকার চেয়েছিল বলেই আমাদের ডেকেছিল। আমাদের কথা শুনেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে হলে এর সঙ্গে যুক্ত সরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় হতে হবে। পুলিশ, প্রশাসনসহ বিভিন্ন অধিদপ্তর আছে, যারা পরিবহন নিয়ে কাজ করে—সবাই যদি সক্রিয় না হয় এবং ভূমিকা পালন না করে, তাহলে কিছুই হবে না। সেটাই তো আমরা দেখতে পেলাম।
আপনাদের একটা প্রস্তাব ছিল, কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে বাসগুলো পরিচালিত হবে। এরপর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এটা কেন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলো না?
আমরা মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করতে পেরেছি। কিন্তু যেখানে নীতিগত বিষয় আসে, সেখানেই আমাদের একধরনের দুর্বলতা চলে আসে। এ বিষয়ে দুর্বলতা বা পিছুটান শুরু হওয়ার কারণ হলো, নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়টা পুরোপুরি রাজনৈতিক। গণপরিবহনকে আমরা শুধু মুখে সেবা খাত বলি, কিন্তু পুরোটাই হলো রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। আমরা বলেছিলাম, পাঁচ-ছয়টা কোম্পানির অধীনে ৪২টা রুটে গণপরিবহন চলবে। এটাতে সত্যিকারভাবে চমৎকার নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেত। এটা মেট্রোরেলের ফিডার সার্ভিস হিসেবে কাজ করত। পুরো ঢাকা শহরের চেহারা পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল। এটাতে কোনো বিনিয়োগের বিষয় ছিল না। ঢাকার মাত্র ২০০ কিলোমিটার রাস্তায় বাস চলতে পারে। সেখানে হাজার হাজার মালিকের দরকার ছিল না। শত শত রুটেরও দরকার ছিল না। কারণ, এখন তো ব্যক্তিগত মালিকানায় কামড়াকামড়ি, রেষারেষি নিয়ে বাসগুলো চলছে। এটা যেন না থাকে।
বিগত সরকার এবং বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে যেটা দেখতে পেলাম, গণপরিবহনকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হলে একক কোনো দলের পক্ষে সম্ভব নয়। এ দেশে প্রধান চারটি রাজনৈতিক দল, তাহলে এ বিষয়ে সবাইকে একই মত পোষণ করতে হবে যে আমরা সবাই ঢাকা শহরে গণপরিবহনে নীতি ও পলিসিগত পরিবর্তন চাই—ঠিক তখনই সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। একটি দল চাইল, কিন্তু বাকিগুলো চাইল না, তাহলে সেটা সম্ভব হবে না। এই যে পরিবহন সিন্ডিকেট, সেটা সব রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে। একটা দল চলে গেলে আরেকটা দল এটাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর সঙ্গে প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনীতিবিদ—সবাই জড়িত। শুধু মালিকের
ব্যাপার না। গণপরিবহনে গুণগত মানের পরিবর্তনের জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে সহমত পোষণ করতে হবে। যানজট নিরসন ও যাত্রীসেবার জন্য গণপরিবহনের নীতিগত পলিসি বাস্তবায়নের দরকার।
আমরা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতির কথা বলেছি এবং এটা বাস্তবায়ন করা গেলে মালিক, শ্রমিক সবাই লাভবান হবেন। এতে যে শুধু যাত্রীরা লাভবান হবেন, বিষয়টা তা-ও না। সেভাবেই ফর্মুলা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন বলেছেন, ঢাকার জন্য মেট্রোরেল উপযুক্ত না। আসলেই কি তাই?
আসল কথা হলো, আমার বা কারও চাওয়া দিয়ে কিছু আসে-যায় না। ঢাকা শহরের পুরো পরিবহন খাতের কীভাবে উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে, সেটার জন্য আমাদের স্পষ্ট ‘কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা’ আছে। জনগণের স্বার্থে ২০০৫ সালে এটা প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৫ সালে সেটার রিভিশন করা হয়েছে এবং ২০২৫ সালে আরও একবার সেটার রিভিশন করা হয়েছে। সেখানে বলা আছে, ঢাকাকে বাসযোগ্য এবং যানজট-সহনীয় করতে পরিবহন খাতকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে; তার সুস্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া আছে। এই স্টাডিগুলোর তথ্য বিজ্ঞানভিত্তিক। এ কারণে বলতে চাই, আমার বা আপনার চাওয়া দিয়ে কিছু আসে-যায় না। প্রয়োজনের জায়গা থেকে মেট্রোরেল নির্মাণ করা হয়েছে। কারণ, মেট্রোরেল ঢাকার জন্য অনেক উপযোগী। সেটা বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে। সে জন্য সবাইকে সেই স্টাডিকে গ্রহণ ও শ্রদ্ধা করার মানসিকতা থাকতে হবে।
তবে আমরা এর নির্মাণের খরচের বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতেই পারি। কিন্তু মেট্রোরেল অনুপযোগী কোনোভাবেই হতে পারে না। পৃথিবীর প্রায় ২১০টা শহরে মেট্রোরেল চলছে। তাহলে কি সেই শহরগুলো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
ঢাকার যানজট কমাতে আপনার দৃষ্টিতে কোন কাজগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
ঢাকার যানজট কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটমেন্ট—ইনভেস্টমেন্ট নয়। আমরা ইনভেস্টমেন্টের পেছনে ছুটছি। মেট্রো না মনোরেল—এসব না বলে কমিটমেন্ট দিতে হবে। আর কাজগুলো বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে করতে হবে। ঢাকা শহরে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষের জন্য খুচরা যানবাহন রেখে কোনো আধুনিক সলিউশনই কাজ করবে না।
অনেকে বলে ঢাকা শহরে সড়ক কম। এটা আসলে ভুল কথা। পৃথিবীর অনেক দেশের শহরেই ঢাকার চেয়ে অনেক কম সড়ক আছে, কিন্তু সেখানে কোনো যানজট নেই। কারণ, তারা একটা উন্নয়নের দর্শন অনুসরণ করেছে। দর্শনটা হলো, ঢাকা শহরকে যদি বাঁচাতে হয় তাহলে সাপ্লাই এরিয়ায় ব্যবস্থাপনা লাগবে।
ঢাকা শহরে সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার। এই সড়কের পাশের ফুটপাতে নেটওয়ার্ক তৈরি করার জন্য সর্বোচ্চ ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে। ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ এতে ভালোভাবে চলাচল করতে পারবে। ফুটপাতের পরে গণপরিবহনকে ঠিক করতে হবে। সবই কিন্তু কমিটমেন্টের বিষয়।
লক্কড়ঝক্কড় বাসে ৪০ শতাংশ মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে চড়তে বাধ্য হচ্ছে। যদি এই পরিবহনগুলোর গুণগত মান উন্নত করা যেত, রুটগুলো পুনর্বিন্যাস করে কোম্পানি-ভিত্তিকভাবে চালানো সম্ভব হতো, তাহলে ৬০ শতাংশ যাত্রী নির্বিঘ্নে চলতে পারত। ফুটপাত আর গণপরিবহন দিয়ে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ যাত্রীর সুবিধা হতো। বাকিটা মেট্রোরেল দিয়ে সম্ভব হতো। স্টাডিও তা-ই বলছে। সব মেট্রো নেটওয়ার্ক হয়ে গেলেও সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। আর মেট্রোর নেটওয়ার্ক নির্মাণের জন্য খরচ হবে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার। আর আমাদের পরিকল্পনায় এক থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারে সেটা করা সম্ভব।
ঢাকার জন্য অনেক টাকা খরচ করা হয়েছে, কিন্তু শহরটির গতি বাড়ানো যায়নি। ২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল—এই ২০ বছরে গতি ২১ থেকে ৫ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। ঢাকার সেই বিনিয়োগগুলো ৬৪ জেলায় করে সেখানে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। যাতে ঢাকায় কাউকে না আসতে হয়। ঢাকায় আরও এক ডজন মেট্রোরেল করেও যানজট কমানো যাবে না, যদি কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকায় মানুষ আসার স্রোত কমানো না যায়।
সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আজকের পত্রিকা এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।