অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ৫ জুলাই মৃত্যুবরণ করেছেন। চারপাশে মুখোশপরা চিন্তাবিদ-বুদ্ধিজীবীর মাঝে ব্যতিক্রম ছিলেন তিনি। তাঁর কোনো মুখোশ ছিল না। মুখে যে কথা আসে বলে ফেলতেন। কথাকে যে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উপযোগী করে বলতে হয়, তা তিনি জানতেন না। অন্য অনেকে কৌশল করে কথা বলেন। কারণ, তাঁরা প্রায় সবাই লোকসমাজে যা বলেন তার ৮০ ভাগই মিথ্যা। এমনিতেই আমাদের অতিকথন পছন্দ। তার ওপর ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কথার ফুলঝুরি ফোটানো লোকেরা সমাজের মাথা বলে যাঁরা সম্মানিত, তাঁদের অভ্যাস। কোনো একজন বুদ্ধিজীবী কিংবা রাজনীতিবিদের সঙ্গে বছরের পর বছর চলাফেরা করলেও তাঁর প্রকৃত চেহারা বোঝা মুশকিল। এমনই এক বিপজ্জনক সময়ে আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবনকাল। তিনি কোনো সভা-সমিতি, সেমিনারে কথা বললে অনেকে বিরক্ত হতেন, কারণ তিনি রাখঢাক করে কথা বলতেন না। এই বিরক্তি সম্পর্কে তিনি বলতেন, ‘সত্য কথা শোনাও একটা অভ্যাস, সত্য না শুনতে পেয়েই মানুষ সত্য কথা শুনলে বিরক্ত হয়। ভয়ও পায়। সত্য শুনতে শুনতে একসময় মিথ্যা কী তা বুঝতে পারবে। মানুষ এখন সত্য-মিথ্যার প্রভেদ ভুলে গেছে। মুখরঞ্জক ও জাদুকরি বক্তা ঢাকা শহরে অনেক আছে, যাদের কথা খুবই শ্রুতিমধুর কিন্তু আপাদমস্তক ধোঁকাবাজ। এ রকম দু-চারজনকে চেন? আমি যা সত্য ও ন্যায় মনে করি তাই বলি, কারও ভালো লাগা, মন্দ লাগা আমার বিবেচ্য নয়। সত্য কথা শুনতে অধিকাংশই অভ্যস্ত নয়। যারা অভ্যস্ত নয় তারা অভ্যস্ত হোক।’
অনেক সময় সভা শেষে আমরা তাঁকে বলতাম আপনি অমুক ব্যাপারে সরাসরি কথা না বললেও পারতেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলতেন, ‘জীবনে কোনো বিষয়েই মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেবে না। সত্য কথা না বলার প্র্যাকটিস করলে একসময় সত্য জিনিসটাই ভুলে যাবে। সত্য ও ন্যায় বিষয়টা ভুলে খোলসের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করো কি?’
‘শুভ অর্থাৎ কল্যাণকর চিন্তা ও কাজ ছাড়া রাষ্ট্রের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশে আজ বিশ্বজয়ী অনেক প্রতিভাবান লোক আছেন, কিন্তু তাঁদের অধিকাংশের মাঝে বিন্দুমাত্র শুভবুদ্ধি নেই। ফলে তাঁদের সব কথা ও কাজের উদ্যোগ বাগাড়ম্বর ছাড়া কিছু নয়। এরা মূলত অসৎ।’ অনেকেই তাঁর কাছ থেকে এ কথা শুনেছেন।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে তাঁর ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন খুন হওয়ার পর ‘পুত্র হত্যার বিচার চাই না, মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক’—তাঁর এই বক্তব্য সব মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। সারা দেশের অধিকাংশ মানুষ তাঁর মুখনিঃসৃত এ বক্তব্যে সেদিন অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পুত্রশোকে বিহ্বল একজন পিতা জীবনের এক বেদনাবিধুর সময় ‘মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক’ কথাটি বলে সারা দেশের বিবেককে যে নাড়া দিয়েছেন, তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। তিনি নীরব এই প্রতিবাদের দ্বারা আমাদের ‘দুরারোগ্য অন্ধকার’ সময়ে আলোক শিখার সন্ধান পেতে চেয়েছেন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপন খুন হওয়ার পরদিন ১ নভেম্বর বিবিসি বাংলার দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিপরীতমুখী দুই রাজনীতিই দেশকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেন তিনি এই হত্যার বিচার চান না—এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশে এখন এক পক্ষ ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদার, আরেক পক্ষ রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের দাবিদার। দুই পক্ষের রাজনীতিই দেশকে সর্বনাশের দিকে নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শুভবুদ্ধির উদয় দরকার। এবং তা যদি হয় তাহলেই আমার ছেলেরও হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। তিনি তাঁর ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে বলেন, আদালতে ফাঁসি বা জেল দিয়ে যে বিচার, তার ওপর তাঁর আস্থা নেই। আমাদের জাতীয় জীবনের সমস্যা এত গভীর যে শুধু জেল-জুলুম বিচার-ফাঁসি এগুলো দিয়ে কিছু হবে না।
‘অল্প কিছু লোক প্রথমে শুভবুদ্ধি-বিবেক নিয়ে দাঁড়ান, সব প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেন, ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে দাঁড়ান। তার থেকে পরে গণজাগরণ ঘটে।’ তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে এবং অনেক দেশে যে রাজনীতি চলছে তা ক্ষমতার রাজনীতি, ভোটের রাজনীতি। নতুন রাজনীতি দেখা না দেওয়া পর্যন্ত যে রকম চলছে, তেমনই চলবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ১৯৬৭ সালে তাঁর লেখা বই ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’-তে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে, ‘এক দুরারোগ্য অন্ধকার এবং ব্যাপক ভবিষ্যৎহীনতার কদর্য শিকারে পরিণত হয়েছে আমাদের বর্তমান সময়। এটা সেই সময় যখন আমাদের ব্যাপ্ত স্বদেশ রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্ত, সামাজিকভাবে পঙ্গু এবং অর্থনৈতিকভাবে নিঃশেষিত। আর এই পারিপার্শ্বিক মৃত্যু-বহুলতার সঙ্গে আমাদের সাহিত্য-সম্ভাবনাও এক বার্ধক্যজীর্ণতার শেষ প্রান্তে পৌঁছে ফসলহীনতার দারিদ্র্যে পাণ্ডুর।’
তাঁর এই উপলব্ধির সঙ্গে আজ কয়েক দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর বর্তমান যাপিত সময়ে আমাদের উপলব্ধির সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য মিলিয়ে দেখার জন্য অনেক বড় প্রতিভাবান হওয়ার খুব একটা দরকার হয় না। সারা জীবন তিনি মানুষের মাঝে যে শুভবুদ্ধির জাগরণ কামনা করেছেন, তার উদয় হোক।
জনগণের প্রতি তাঁর ছিল অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সে কারণে তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন না। তিনি এ রকম মতপ্রকাশ করেন যে যেহেতু দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষই ধর্মানুগত, তাই তাদের বিশ্বাসে সরাসরি আঘাত দিলে তাদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হয়, সমাজ পরিবর্তনের কাজ হয় বিঘ্নিত। তিনি ছিলেন সমাজ সংস্কারের ধারায় প্রাচীন ভারতের লোকায়ত বস্তুবাদী দর্শন ‘চার্বাক মতাবলম্বী’। ‘লোকায়ত’ নামক একটি মননশীল পত্রিকা ১৯৮২ সাল থেকে কয়েক দশক ধরে সম্পাদনা করেন। এই সৃষ্টিশীল সাময়িক পত্রিকাটি মারফত অনেক তরুণ লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শুভবোধসম্পন্ন সৃষ্টিশীল কল্যাণকামী মানুষ তৈরির এক আশ্চর্য কারিগর আবুল কাসেম ফজলুল হক। এ কারণে তাঁর জীবনে অন্দরমহল বলে কিছু ছিল না। পরিচিতরা সবাই তাঁর বাসগৃহের সঙ্গে পরিচিত। বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা করে এমন মানুষ থেকে ছোট, বড় সব রাজনৈতিক দলের অধিকাংশ নেতা বাংলাদেশের আর কোনো চিন্তাবিদ কিংবা বুদ্ধিজীবীর বাসা না চিনলেও তাঁর বাসা চিনতেন। মানুষের সঙ্গ ছিল তাঁর প্রিয়। মানুষের কাছ থেকে সারা জীবন পাঠগ্রহণ করেছেন তিনি। যেকোনো মানুষের সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠ হলেই তাঁর প্রথম প্রশ্ন, ‘বলো বা বলেন দেশ সম্পর্কে এখন কী ধারণা পোষণ করো বা করেন?’ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত জানার আগ্রহ ছিল তাঁর।
তিনি ৪০টিরও অধিক গ্রন্থের প্রণেতা। এ ছাড়া সম্পাদনা করেছেন বেশ কয়েকটি গ্রন্থ এবং নজরুল রচনাবলির সম্পাদনা পরিষদের সদস্যও ছিলেন।
তিনি ২০০০ সাল থেকে ছিলেন স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতি। এ সংগঠনটির পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নতির কর্মনীতি আটাশ দফা’ ২০০৫ সাল থেকে তিনিসহ সদস্যদের দ্বারা প্রচার করতেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ যে উন্নত করা দরকার, সে প্রসঙ্গটি তিনি প্রথম গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। এটা আগেই উপলব্ধি করেছিলেন তিনি এবং সেই লক্ষ্যে নিরলসভাবে লেখালেখি করেন। তিনিই ছিলেন আমাদের চলমান বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাগ্রসর, দূরদর্শী এক চিন্তক ও ভাবুক। সে কারণে রাষ্ট্র, সমাজ, মানুষ, রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, নীতিবিজ্ঞান, জ্ঞানতত্ত্ব, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর যুক্তিগ্রাহ্য বুদ্ধিদীপ্ত গবেষণামূলক রচনা আমাদের চেতনা ও বিবেচনাবোধকে শাণিত ও সমৃদ্ধ করবে। তাঁর গৌরবোজ্জ্বল শিক্ষকতা জীবন, পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতা ও মননশীল লেখনীও আমাদের আরও সমৃদ্ধ করবে। এই সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং মুখোশহীন চিন্তাবিদ আমাদের মাঝ থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা।