গত বুধবার ছিল এ দেশে ছুটির দিন, বৃহস্পতিবার কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেপালের হড়পা বানের দৃশ্যগুলো দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম, প্রকৃতির রুদ্ররূপ যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা ছিল সেসব দৃশ্যে। ২৬ আগস্ট যখন প্রথম ওই সিসিটিভি ফুটেজটা ভাইরাল হতে শুরু করল, প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, এটা এআই দিয়ে বানানো ভিডিও। বিরাট, বহুতল সাদা একটা ভবন, আর তার সামনে পিঁপড়ের মতো ছুটছে মানুষগুলো, তারা হয়তো মৃত্যুর কয়েক সেকেন্ড আগেও জানত না যে তারা মরতে যাচ্ছে। সে ভবনের কাছে সারি করে রাখা বাসগুলোর পরিণতি কী হতে যাচ্ছে, সেসব বাসের চালকেরাও অনুমান করতে পারেননি; আমরা দেখেছি সেসব দৃশ্য। ভিডিওটিতে দেখা গেছে, একটি চমৎকার সাদা ভবনের পেছন দিক থেকে একেবারে সাপের ফণার মতো উঠে এল বিশাল ধূসররঙা এক জলস্তম্ভ। আছড়ে পড়ল, ভাসিয়ে নিয়ে গেল সব, এক মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল না জানি কত প্রাণ, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সেতু, ঘরবাড়ি, গাছপালা, সড়ক! পাহাড়ের পাথর ও কাদায় সয়লাব হয়ে গেল সব।
সাদা সেই ভবনটা ছিল গাইরং পোর্ট যা কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখান থেকেই কাঠমান্ডু থেকে আসা কৈলাসযাত্রীরা চীনে প্রবেশ করেন। নেপাল সীমান্তের কাছে হিমালয়ের গভীর উপত্যকায় অবস্থিত গাইরং স্থলবন্দরটি নেপালের কাঠমান্ডু থেকে সড়কপথে উত্তর দিকে ও তিব্বতের লাসা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। কাঠমান্ডু থেকে শুরু করে রসুয়াগাধি সীমান্ত পার হয়ে যাত্রীরা গাইরং পোর্টে প্রবেশ করেন। এরপর সাগা হয়ে মানস সরোবর হ্রদ ও কৈলাস পর্বতের বেস ক্যাম্প দারচেনে যান। মৌসুমটা ছিল ট্রেকিংয়ের। সংগত কারণেই এ পথে সীমান্ত পার হওয়ার আগে কাঠমান্ডু থেকে আসা বহু পর্যটক সেখানে অবস্থান করছিলেন। এক নিমেষের সেই হড়পা বানে ভেসে গেলেন তাঁদের অনেকেই। ভেসে গেলেন সেখানকার অনেক অধিবাসীও। আচমকা প্রবল পানির স্রোত, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের তোড়ে দুর্গম এই পার্বত্য সীমান্ত এলাকা এখন কার্যত শ্মশান। রয়টার্স নিশ্চিত করেছে যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বহু নাগরিক এই দুর্যোগের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন।
আজকের পত্রিকায় ২৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখের এক সংবাদে লেখা হয়েছে যে নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯, নিখোঁজ প্রায় আড়াই হাজার। তবে এটিই চূড়ান্ত সংখ্যা নয়, এখনো বহু হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে প্রবল স্রোত ও কাদার স্তূপ জমে থাকায় অনেক স্থানেই স্বাভাবিক যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পাহাড়ি সেসব এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারী দল ও সামরিক হেলিকপ্টার দিয়ে নেপাল-চীন সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চলছে।
নেপালে কেন এই বিপর্যয়? এর কারণ কি শুধুই প্রাকৃতিক? কাঠমান্ডু থেকে ১২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাসুয়ায় প্রায় ৫০ হাজার লোক বাস করে। তিব্বত থেকে এ জেলার মধ্য দিয়েই প্রবেশ করেছে ভোতে কোশি নদী। সেখানকার অধিবাসীরা দেখলেন, বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার কিছু পরে আচমকা সে নদীর পানি বাড়ছে। অথচ কোনো বৃষ্টি নেই, মেঘ নেই, আকাশ উজ্জ্বল রোদে ভরে আছে। এর পরই হঠাৎ সেই ভয়ংকর ঘটনাটি আচমকা ঘটে যায়। স্মরণকালের ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত হয়ে যায় নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এই জনপদ। এটিকে শুধু প্রাকৃতিক কারণ হিসেবে ভাবলে চলবে না। বিশ্বব্যাপী যেভাবে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বাড়ছে, তাতে বহু আগেই জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছিলেন যে এর ফলে হিমালয়ের বরফ গলবে। ফলে বরফগলা সে পানিতে প্রবল বন্যার সৃষ্টি হবে।
সাধারণ সেসব কথাকে আমরা অনেকেই বিশ্বাস করিনি। এমনকি গবেষকেরাও হয়তো কখনো ধারণা করতে পারেননি যে তার তীব্রতা বা প্রকৃতি এবারের হড়পা বানের মতো হতে পারে! হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া ভালো, কিন্তু মনে রাখা ভালো যে সেখানকার নদীগুলো দিয়েই ওসব পাহাড় থেকে বরফগলা পানি নামে। সে পানির প্রবাহ বেশি হয়ে গেলেই সৃষ্টি হয় বন্যা। গিরিখাতের নদীগুলো সরু হওয়ায় পানির স্রোতের বেগ হয় তীব্র। সেই বন্যার পানি যে শুধু হিমালয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে তা না। সেখান থেকে সে পানি চলে আসে ভাটি অঞ্চলে, ধেয়ে চলে সমুদ্রের দিকে। ১৮ বছর আগে ২০০৮ সালে এই ভোতে কোশি নদীর বন্যার পানিই বিহারের কোশি নদী প্লাবিত করে ভয়াবহ বন্যা ডেকে এনেছিল। অথচ বন্যার এরূপ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমরা সেসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছি, বন্যা মোকাবিলার কার্যকর কোনো পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করি না।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় হড়পা বানের আগে হয় ভূমিকম্প এবং তুষারধস। বুধবার নেপাল পার্লামেন্টে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল জানিয়েছিলেন, সকাল ৮-৩৭ নাগাদ একটি ভূমিকম্প হয়। এর পর একটি তুষারধস ঘটে। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই নামে হড়পা বান। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ভূকম্পিত তুষারধস থেকেই কি হিমবাহ বিস্ফোরণ ও শেষে এই বিপর্যয়? ভূবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, পাথর ও বরফের স্তূপে নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হওয়ার ফলেই ঘটেছে এই বিপর্যয়।
তবে এটিই নেপালে প্রথম হড়পা বান নয়। গত বছর ৮ জুলাই সেখানে হড়পা বান এসেছিল। তখন সে বানে ৯ জনের মৃত্যু ঘটেছিল, ১৯ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। এরপরই ভূতাত্ত্বিক ও আবহাওয়াবিদেরা অনুরূপ ঘটনা আবারও ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন। গত বছরের সে ঘটনার পর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টসহ অন্যান্য আবহাওয়া সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীরা ভোতে কোশি ও লেন্দে অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
এমনকি নেপালের এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। নেপাল-চীন সীমান্তের তিব্বত অঞ্চলে চীন ‘লেভেল-৪’ দুর্যোগ সতর্কতা জারি করেছে। চীনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থায় মোট চারটি সতর্কতা স্তর রয়েছে। এর মধ্যে লেভেল-১ সর্বোচ্চ এবং লেভেল-৪ সর্বনিম্ন সতর্কতা স্তর। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বুধবারের ভূমিধসের পর দুটি নদীর মিলনস্থলে একটি প্রাকৃতিক জলাধার বা ‘ব্যারিয়ার লেক’ তৈরি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ওই প্রাকৃতিক জলাধারে আনুমানিক ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। ওই অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় জলাধারে পানির প্রবাহ প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে জলাধারটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত পানির চাপে এই জলাধার ভেঙে গেলে নিচের দিকে থাকা বিস্তীর্ণ এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
এই সতর্কতা ও নির্দেশগুলো মান্য করে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া উচিত হবে। অন্তত দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় এখন মানুষজন থাকলে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে হবে। পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত হওয়া না গেলে প্রকৃতি, সম্পদ ও মূল্যবান প্রাণের হানি আরও বাড়বে। গত বছরের সতর্কতার পরও নেপালের এই নদীতীরবর্তী অংশে অপরিকল্পিতভাবে বহুতলবিশিষ্ট ভবন গড়ে ওঠা বন্ধ হয়নি, অথবা বিপদের ঝুঁকির সংকেত থাকা সত্ত্বেও সেখানকার মানুষের জীবনকে নিরাপদ করার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হলে নিশ্চয়ই প্রাণহানি অনেক কমানো যেত।
এটি শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় না, মানবিক বিপর্যয়ও। এ বিপর্যয়ে ইতিমধ্যে অনেক দেশ নেপালে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। সেগুলোর সদ্ব্যবহার করে আপাতত সেখানকার জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাটা জরুরি। অবকাঠামো যা ক্ষতি হয়েছে সেগুলোও ঠিক করতে হবে। তবে সবকিছুর মধ্যে আমাদের মনে রাখতে হবে, এ পরিস্থিতির জন্য এককভাবে শুধু প্রকৃতিই দায়ী না, মানুষেরও দায় আছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে মানবজাতি কখনোই টিকতে পারে না, টিকতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য স্থাপনের মাধ্যমে।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক