হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নিউমুরিং কি ভাগাভাগির ফেরে পড়ে গেল

আবু তাহের খান 

অপেক্ষমাণ আছে ডিবি ওয়ার্ল্ডের কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল হস্তান্তরের চুক্তি। ছবি সৌজন্য: সাইফ পাওয়ারটেক

ভূরাজনৈতিক কৌশলগত বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান এমনই একটি আকর্ষণীয় স্থানে যে, সে কারণে এর প্রতি বিশ্বের অনেক বৃহৎ শক্তিরই এখন লোলুপ দৃষ্টি। ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে সহজ নৌসংযুক্তির সুবিধাসম্পন্ন দেশটি যে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নিয়ত মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে, সেটিই এখন এ দেশটির জন্য বড় কাল হয়ে দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেডের (সিডিডিএল) কাছে হস্তান্তর করা হয় ২০২৫ সালের জুলাইতে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আওতাধীন প্রতিষ্ঠান সিডিডিএল এ দায়িত্ব গ্রহণের অব্যবহিত পরে ওই বছরের ৭ জুলাই থেকে পরবর্তী ৪৯ দিনে মোট ১,৭৪,৯৩১ টিইইউস (টোয়েন্টি-ফুট ইক্যুভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করে, যা পূর্ববর্তী একই সময়ের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি।

একই ধারায় চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল তারা মাত্র এক দিনে ৫,৭০৯ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে, যা এনসিটির এযাবৎকালের ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড। মোটকথা, সিডিডিএল এনসিটি পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর থেকে এর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিসরে শৃঙ্খলা ও গতি আসতে শুরু করে। আর এর ফলে দক্ষতার সঙ্গে বন্দর পরিচালনার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই মর্মে এত দিন যা বলা হচ্ছিল, সেটি পুরোপুরিই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বলে প্রমাণিত হয়। এবং সহজেই প্রতীয়মান হয় যে একটি ধূর্ত মহল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে ক্রমান্বয়ে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে এরূপ প্রচারণা চালিয়ে আসছিল।

তো এভাবেই যখন প্রমাণিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব সিডিডিএলের হাতে থেকে যাওয়ার যুক্তি ও দাবি ক্রমান্বয়ে জোরদার হচ্ছিল, ঠিক তখনই পর্দায় নতুন করে আবির্ভূত হয়েছে একাধিক নতুন পক্ষ। এদের মধ্যে জাতীয় সংসদের দুই সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এবং জন-আলোচনায় এ অভিমতও রয়েছে যে শেষ পর্যন্ত এ কাজ হয়তো উল্লিখিত এমপিদের প্রতিষ্ঠানই পেয়ে যেতে পারে। আর তা পারে এ কারণে যে দীর্ঘ সময় তারা ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে এত দিন এসব কাজ বাগিয়ে নিয়েছিল অন্যরা। ফলে বাংলাদেশের রীতি অনুযায়ী এ কাজ এখন নতুন ক্ষমতাসীনদেরই পাওয়ার পালা।

নইলে এত অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তারা গ্রহণইবা করবে কেন? তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ডিবি ওয়ার্ল্ডের হাত থেকে এনসিটিকে বাঁচানোর জন্য এই যে এত দিন ধরে চলা এত মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষাজড়িত আন্দোলন-সংগ্রাম, সেটির কী হবে? ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর সবই মিথ্যা হয়ে যাবে, আর সত্য হয়ে উঠবে শুধু ভাগ-বাঁটোয়ারার বনিবনা? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য জনগণকে এখন আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতেই হবে।

সিডিডিএলের গত প্রায় এক বছরের ধারাবাহিক দক্ষতা প্রয়োগজনিত সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচিত ছিল এত দিন ধরে ডিবি ওয়ার্ল্ডের প্রতি তাদের যে আসক্তি ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসা। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে যে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আগের সেই আসক্তি এখনো তাদের মধ্যে রয়েই গেছে। এমনকি এমপিদের কোম্পানি নতুন করে মঞ্চে আবির্ভূত হওয়ার পরও। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে ন্যস্ত হবে, তা নিয়ে সরকারের ভেতরেই একধরনের ধন্দময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা আসলে পরিপূর্ণতই স্বার্থের দ্বন্দ্ব। আর সে দ্বন্দ্ব-সংঘাতেরই অনিবার্য ফলাফল হচ্ছে ৪ জুন সকাল ও বিকেলে নৌপরিহন মন্ত্রণালয় কর্তৃক চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে লেখা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যসংবলিত দুই চিঠি। প্রথম চিঠিতে ডিবি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা শেষ বা বাতিল করার কথা বলা হলেও দ্বিতীয় চিঠিতে বলা হয়েছে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা। বিষয়টি আসলেই রহস্যময় ও অবোধগম্য এবং একই সঙ্গে অস্বচ্ছতাপূর্ণও।

অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে এনসিটিকে ডিবি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের ব্যাপারে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। কিন্তু তাঁরা এখন আর ক্ষমতায় নেই। তাহলে এখনো কেন উল্লিখিত বিতর্কিত সরকারের ব্যবস্থাপত্র মেনে এনসিটিকে ডিবি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে হবে? তাহলে কি পূর্ববর্তী সরকারের কোনো কোনো প্রতিনিধি প্রকাশ্যে ও ছদ্মবেশে নতুন সরকারের ভেতরেও নানাভাবে পূর্ণাঙ্গ প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে জায়গা করে নিয়েছে? নাকি সংশ্লিষ্ট নতুনদের মধ্যেও নানা স্বার্থের ভূত নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে? বিষয়গুলো ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক বিরক্তি ও অস্বস্তি তৈরি করেছে এবং এর মাত্রা ক্রমেই আরও প্রকট হয়ে উঠছে। কারণ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক নিন্দিত সিদ্ধান্তই বর্তমান সরকার হুবহু বাস্তবায়ন করে চলেছে। তাই এ সরকারকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের সম্প্রসারণ বলেও মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। এ ধরনের জনমন্তব্যকে ভুল প্রমাণ করতে চাইলে সরকারকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা, এনসিটির পরিচালন কার্যক্রম বিদেশিদের কাছে হস্তান্তর না করা, বহুজাতিক কোম্পানির পরামর্শ মেনে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্রতী না হয়ে সংশ্লিষ্ট উৎপাদন-বণ্টন চুক্তিগুলো দেশের স্বার্থের অনুকূলে সংশোধন করা ইত্যাদি কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে দেখাতে হবে। নইলে এ ব্যাপারে মানুষের সন্দেহ ও অস্বস্তি দুই-ই বাড়তে থাকবে।

আসলে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান এমনই একটি আকর্ষণীয় স্থানে যে, সে কারণে এর প্রতি বিশ্বের অনেক বৃহৎ শক্তিরই এখন লোলুপ দৃষ্টি। ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে সহজ নৌসংযুক্তির সুবিধাসম্পন্ন দেশটি যে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নিয়ত মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে, সেটিই এখন এ দেশটির জন্য বড় কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। তদুপরি এর রয়েছে প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল বাজার, যে বাজারে অভ্যন্তরীণ সরবরাহের চেয়ে বহির্দেশীয় পণ্যের দাপটই অধিক এবং শিগগির সেখানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো লক্ষণও চোখে পড়ছে না। এমতাবস্থায় ভূরাজনৈতিক কৌশল ও পণ্য বাজারজাতকরণ উভয় বিবেচনা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র একে নিজেদের কর্তৃত্বাধীনে রাখতে চাইছে, চীন তার পণ্য দিয়ে দেশটিকে সয়লাব করে রাখার কৌশল আঁটছে এবং ভারত কোনো অবস্থাতেই বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে নিজেদের প্রতিবেশী-সুবিধা হারাতে চাইছে না।

মোটকথা বাংলাদেশের বাজার, বন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সমুদ্র-দ্বীপ ও গ্যাসক্ষেত্র, রাজনৈতিক রূপান্তর ইত্যাদি সবই এখন নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় নানা বিদেশি শক্তি। আর তারই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেমন স্বাক্ষরিত হয় পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (বিশিষ্ট নাগরিকের ভাষায় যা মার্কিন প্রশাসনের হুকুমনামা), তেমনি সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতা হয় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রদানের এবং তুরস্কের সঙ্গে আগ্রহ বাড়ে সামরিক সহযোগিতার। এবং একই ধারায় এখন অপেক্ষমাণ আছে ডিবি ওয়ার্ল্ডের কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল হস্তান্তরের চুক্তি (যদি শেষ পর্যন্ত তা সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়ামের কাছে হস্তান্তরিত না হয়)। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ জনগণের একটি সরল জিজ্ঞাসা—যুগ যুগ ধরে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার কশাঘাত নিয়ে মানবেতর জীবনযাপনকারী এ দেশের কোটি কোটি মানুষের দুঃখভরা করুণ মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে হলেও কি দেশের নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্তপ্রণেতারা নিজেদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে এ দেশের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার আত্মঘাতী মরণ খেলা থেকে বিরত রাখতে পারেন না?

আবু তাহের খান, সাবেক পরিচালক, বিসিক

‘সুপার’ এল নিনো ও আমাদের কৃষি

প্রস্তাবিত বাজেট: বড় সংখ্যা কি বড় পরিবর্তন আনে

সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা

বাজেটে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি ও বাস্তবতা

আমরা কেন এমসিকিউ আর লিখিত পরীক্ষায় আটকে থাকব: কাজী মারুফুল ইসলাম

মানুষ, মুনাফা ও মনুষ্যত্বের দ্বন্দ্ব

বিশ্ব কাঁপে ফুটবলে

সংকটময় দেশে, আমরা কোন পথে

সুখবর কি আছে কোনো

শিশুশ্রম শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক সংকটও