হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সৌন্দর্য চিকিৎসায় গড়ে উঠছে নতুন অর্থনীতি

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

সৌন্দর্য চিকিৎসায় নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক বেশি। ছবি: পেক্সেলস

ঢাকার বাণিজ্যিক ভবনগুলোর চিত্র বদলেছে। রেস্তোরাঁ, ক্যাফে বা শোরুমের পাশেই এখন দেখা মেলে লেজার অ্যাসথেটিক ক্লিনিকের। একসময়ের বিলাসী সেবা মধ্যবিত্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং তরুণ পেশাজীবীদের কাছেও এখন সহজলভ্য। অনেকের কাছে এটি আর বিলাসিতা নয়, আত্মপরিচর্যার অংশ। এর পেছনে রয়েছে একটি দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি।

বাংলাদেশের সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যা বাজারের আকার এখন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ৮০০ থেকে ৮২৫ মিলিয়ন ডলার। এই বাজার মূলত তিনটি খাতে গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় অংশ প্রসাধনী এবং ত্বক পরিচর্যার পণ্যের খুচরা বিক্রি, ক্রিম, সেরাম, সানস্ক্রিন, মেকআপ ও চুলের যত্নের পণ্য; যা দোকান, সুপারশপ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হচ্ছে। একটি বাজার পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে শুধু ত্বক পরিচর্যা পণ্যের বাজারই ১৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর পরেই রয়েছে পারলার ও সেলুন-সেবা, যেখানে হাজারো ছোট প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অবদান বাজারকে বড় করেছে। আর সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে চিকিৎসাভিত্তিক অ্যাসথেটিক সেবা। বোটক্স, ফিলার, লেজার থেরাপি, পিআরপি ও থ্রেড লিফটের মতো সেবার বাজার এখন ১৫০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা মোট বাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

এই উপখাতের আকার নিচ থেকে হিসাব করলেও মোটামুটি একই চিত্র পাওয়া যায়। একটি ক্লিনিকে বোটক্সের একেকটি সেশনের খরচ ৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। বোটক্স, ফিলার ও থ্রেড লিফট মিলিয়ে পূর্ণ মুখের চিকিৎসায় লাগে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, যার ফল সাধারণত ৪ থেকে ৬ মাস স্থায়ী হয়। ফলে গ্রাহককে বারবার সেবা নিতে হয়। একটি মাঝারি ক্লিনিক মাসে ১৫ থেকে ২০টি সেবা দিলেই বছরে আয় হয় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা, বড় হাসপাতালভিত্তিক বা চেইন প্রতিষ্ঠানের আয় এর কয়েক গুণ। দেশে ১ থেকে ২ হাজার সক্রিয় সেবাকেন্দ্র ধরলে এই উপখাতের বাজার ১৫০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো অস্বাভাবিক নয়, যদিও এসবের কোনো সরকারি শুমারি নেই। তবু চিত্রটি স্পষ্ট, খুচরা পণ্য সবচেয়ে বড় অংশ, পারলার-সেবা বেশি বিস্তৃত, আর চিকিৎসাভিত্তিক অ্যাসথেটিক সেবাই সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে।

খাতটির ভেতরের চিত্র দেখলে এর বিস্তার আরও স্পষ্ট হয়। ঢাকায় এখন এমন পরিচর্যা কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে একাধিক শাখায় শতাধিক চিকিৎসক ও থেরাপিস্ট কাজ করেন, যাঁদের বড় অংশ নারী। দেশে লেজারভিত্তিক অ্যাসথেটিক চিকিৎসার যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে, দাগ-তিল অপসারণ

ও হেয়ার রিমুভাল দিয়ে, এখন যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। এতে বোঝা যায়, খাতটি শুধু প্রযুক্তিতেই এগোচ্ছে না, নারীর কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়ছে। তুরস্কভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রসাধনী অস্ত্রোপচার হাসপাতাল চালু করেছে, যা প্রযুক্তি, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতায় নতুন গতি আনছে।

এই খাতের প্রভাব গ্রাহকের অভিজ্ঞতাতেও স্পষ্ট। কিছুদিন আগেও বোটক্স বা ফিলারের জন্য অনেককে থাইল্যান্ডে যেতে হতো, এখন তাঁরা একই সেবা দেশেই নিচ্ছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটি আমদানি প্রতিস্থাপনের ছোট কিন্তু বাস্তব উদাহরণ, যাতে চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ দেশেই থাকে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমে। অবশ্য উচ্চমানের অস্ত্রোপচারভিত্তিক চিকিৎসার জন্য এখনো অনেকে থাইল্যান্ড, ভারত কিংবা তুরস্কে যান, তবে অ-অস্ত্রোপচারভিত্তিক সেবায় দেশীয় সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান প্রাথমিক পর্যায়ে। বৈশ্বিক অ্যাসথেটিক মেডিসিন বাজারে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে, ইউরোপে অ্যান্টি-এজিং চাহিদা দীর্ঘদিন স্থিতিশীল, তবে দ্রুত বাড়ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডে মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধি, সৌন্দর্যসচেতনতা

ও মেডিকেল ট্যুরিজম এই প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড এই খাতকে বড় শিল্পে পরিণত করেছে। তুরস্ক চুল প্রতিস্থাপনে বিশ্বনেতা। আর ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কম খরচে উন্নত চিকিৎসা দিয়ে লাখো বিদেশি রোগী আকর্ষণ করছে, যাতে পর্যটন ও হোটেল খাতও লাভবান হচ্ছে। এখনো বাংলাদেশের বাজার মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর, নিজেদের নাগরিকদের বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া কমানোর পর্যায়ে রয়েছি। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক নীতিমালা, দক্ষ জনবল ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই বাজারও অল্প সময়ে রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত হতে পারে।

খাতটির বিস্তারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে সৌন্দর্যবিষয়ক কনটেন্ট, বিফোর-আফটার ছবি ও ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচারণা অ্যাসথেটিক চিকিৎসার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। তবে ফিল্টার এবং সম্পাদিত ছবিতে তৈরি নিখুঁত সৌন্দর্যের ধারণা অনেকের নিজের চেহারা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে, আত্মমর্যাদা অতিরিক্ত বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হলে উদ্বেগ ও আত্মঅসন্তুষ্টি বাড়বে বলে ধারণা মনোবিজ্ঞানীদের। অন্যদিকে সচেতন সিদ্ধান্তেই এসব চিকিৎসা অনেকে নেন, যা তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও পেশাগত উপস্থাপনার অংশ। এই খাতের ইতিবাচক দিকও কম নয়, নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক বেশি, দেশীয় প্রসাধনী শিল্পও সম্প্রসারিত হচ্ছে, আর বিদেশে চিকিৎসার ব্যয় দেশে ধরে রাখা গেলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপও কমে। তবে ঝুঁকিও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। বোটক্স, ডার্মাল ফিলারসহ ইনজেকশনভিত্তিক চিকিৎসা নিবন্ধিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হওয়ার কথা, কিন্তু এ খাতের জন্য এখনো স্বতন্ত্র লাইসেন্সিং ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণকাঠামো নেই। ভুল প্রয়োগ গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে, আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাহিত্যে ত্বকের ক্ষতি থেকে বিরল ক্ষেত্রে স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঘটনাও নথিভুক্ত আছে। পিআরপি থেরাপিতেও কঠোর জীবাণুমুক্ত পরিবেশ জরুরি, অথচ কোথাও কোথাও প্রশিক্ষণহীন কর্মীদের দিয়ে সেবা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। খরচও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, উন্নত মানের বোটক্স বা ফিলার চিকিৎসায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, আর পূর্ণাঙ্গ মুখ পুনর্গঠনে লাখ টাকার বেশি লাগে। ফলে এই সেবা এখনো মূলত উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সামাজিক সংকোচও পুরোপুরি কাটেনি, অনেকে এসব চিকিৎসার কথা বলতে চান না, যা বাজারের স্বচ্ছতা কমায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আমদানিনির্ভরতা, অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ও ইনজেকটেবল উপকরণ বিদেশ থেকে আসে বলে প্রকৃত দেশীয় মূল্য সংযোজন কতটা, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কে যোগ্য চিকিৎসক, কোন ক্লিনিক নিরাপদ, তা যাচাইয়ে কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই। খাতের বড় অংশ করজালের বাইরে থাকায় রাষ্ট্র রাজস্ব হারাচ্ছে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিও বিস্তৃত হচ্ছে। চিকিৎসাশিক্ষায় অ্যাসথেটিক মেডিসিনকে স্বীকৃত বিশেষায়িত শাখা হিসেবে গুরুত্ব না দেওয়ায় দক্ষ জনবল তৈরির পথও সীমিত। অথচ সমন্বিত মানসনদ, নিবন্ধনব্যবস্থা, করকাঠামোর আওতায় আনা এবং ইনজেকশনভিত্তিক চিকিৎসায় আলাদা লাইসেন্সিং চালু করা গেলে অল্প সময়ে এই খাত আরও নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব।

সৌন্দর্য চিকিৎসার বাজার জীবনধারার পরিবর্তনের গল্প শুধু নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতও। একদিকে বাড়ছে ভোগ ও সৌন্দর্যসচেতনতা, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান, আসছে নতুন প্রযুক্তি এবং বিদেশে চিকিৎসার জন্য ব্যয় হওয়া অর্থের একটি অংশ দেশে থেকে যাচ্ছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এই বাজারকে তাই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। সঠিক নীতিমালা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও মান নিশ্চিত করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশি গ্রাহকদেরও আকৃষ্ট করা সম্ভব। প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

গণ-আন্দোলন, নাকি মেটিকুলাস ডিজাইন

সার্জিও গরের সফর প্রশ্ন, কূটনীতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা

যে অভ্যাস পরিবর্তনে অর্থের প্রয়োজন নেই

লোহা দিয়ে লোহা কাটার অব্যর্থ কৌশল

ভয় নয়, জয়েই বাংলাদেশের মুক্তি

একই ব্যবস্থার দুটি পাতানো বিরোধিতার খেলা

গাছ কেটে কিসের উন্নয়ন

গ্যাস-সংকট সমাধানে আশু করণীয়

জলাবদ্ধতায় নগরের সংকট

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক