হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

দেশের চামড়াশিল্পে সম্ভাবনা ও সংকট

শাইখ সিরাজ

বাংলাদেশ এখনো মূলত কাঁচা বা আধা-প্রস্তুত চামড়া রপ্তানি করে। ছবি: আজকের পত্রিকা

কোরবানির ঈদ এলে বাংলাদেশে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। গ্রাম থেকে শহর, অলিগলি থেকে মহাসড়ক, সর্বত্রই যেন একসঙ্গে স্পন্দিত হয় জীবন ও জীবিকার গল্প। ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি এই উৎসবের ভেতর লুকিয়ে থাকে একটি বিশাল অর্থনৈতিক প্রবাহ, যা নীরবে কিন্তু গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয় দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন, এমনকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেও। প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ গবাদিপশু কোরবানি হয়। এর বাইরে সারা বছর মাংসের চাহিদা পূরণে আরও অসংখ্য পশু জবাই হয়। অর্থাৎ কাঁচা চামড়ার সরবরাহের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। এমন এক সম্পদ, যা অনেক দেশ কল্পনাও করতে পারে না।

তৈরি পোশাকশিল্পের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল এই শিল্প। কিন্তু আজ সেই স্বপ্ন থমকে গেছে। সম্ভাবনা আছে, কাঁচামাল আছে, শ্রমশক্তি আছে, কিন্তু নেই সমন্বিত উদ্যোগ, নেই দূরদর্শী বাস্তবায়ন। ফলে একদিকে কোটি কোটি টাকার কাঁচামাল, অন্যদিকে সেই কাঁচামাল ঘিরে হতাশা, অব্যবস্থাপনা আর অপচয়ের দীর্ঘশ্বাস।

আমার সহকর্মী অনেকেই তাঁদের গ্রামের বাড়িতে ঈদ করেছেন। ফোনে তাঁদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম এ বছর কোরবানির পশুর চামড়ার কেমন দাম পেয়েছেন। একজন জানালেন, দেড় লাখ টাকা দামের ষাঁড়ের চামড়া বিক্রি করেছেন ৩০০ টাকায়। একজন জানালেন, তাঁদের কোরবানির চামড়া কেউ কিনতে আসেনি। একজনকে বিনা মূল্যে দিয়ে দিয়েছেন। আরেকজন জানালেন সারা দিনেও কেউ চামড়া নিতে আসেনি। শেষে চামড়া পুঁতে ফেলতে হয়েছে।

অথচ একসময় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় এক বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। সেটি ছিল আমাদের জন্য এক আশার আলো। কিন্তু সেই আলো ক্রমেই ম্লান হয়েছে। আজও আমরা আটকে আছি ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। অথচ বিশ্ববাজারে এই খাতের পরিমাণ প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। সেখানে আমাদের অংশীদারত্ব ১ শতাংশেরও কম। এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় নিজের দিকেই।

ট্যানারিপল্লি হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল পরিবেশ রক্ষার একটি বড় উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই উদ্যোগই আজ নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, যাকে আমরা সিইটিপি বলি, সেটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে নদী দূষিত হচ্ছে। ধলেশ্বরীর পানি যেন আজ এই শিল্পের বোঝা বইছে। পরিবেশ বাঁচানোর যে স্বপ্ন নিয়ে এই স্থানান্তর, তা যেন বাস্তবতার দেয়ালে এসে ধাক্কা খাচ্ছে।

বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে গেলে শুধু উৎপাদন করলেই হয় না, প্রয়োজন মান বজায় রাখা। আজকের পৃথিবীতে পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স একটি বড় বিষয়। বড় বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এখন শুধু পণ্য দেখে না, দেখে সেই পণ্যের পেছনের প্রক্রিয়া। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সার্টিফিকেশন ছাড়া তারা চামড়া কিনতে চায় না। আমাদের ট্যানারিগুলো এই জায়গায় পিছিয়ে আছে। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করি। এই কম দামের মধ্যে লুকিয়ে থাকে আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের অক্ষমতা, আর নীতিগত দুর্বলতা।

গ্রামে গেলে আরেকটি চিত্র চোখে পড়ে। কোরবানির সময় যাঁরা চামড়া ছাড়ান, তাঁদের বেশির ভাগই প্রশিক্ষিত নন। একটি ছোট অসাবধানতায় চামড়ার গায়ে কেটে যায় দাগ, যা তার মান অনেক কমিয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় সংরক্ষণের সমস্যা। সময়মতো লবণ না দিলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবছর লাখ লাখ চামড়া পচে নষ্ট হয়, যা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, এটি একধরনের সম্পদের অপচয়। এই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, আমরা যেন নিজের হাতে নিজের সম্পদ নষ্ট করছি।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাজার ব্যবস্থাপনা। সরকার দাম নির্ধারণ করে দেয়, কিন্তু সেই দাম প্রান্তিক মানুষের হাতে পৌঁছায় না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে দাম কমে যায়। এতিমখানা, মাদ্রাসা কিংবা দরিদ্র মানুষ যাঁরা এই চামড়ার ওপর নির্ভর করেন, তাঁরা বঞ্চিত হন। অনেক জায়গায় ক্ষোভে মানুষ চামড়া ফেলে দেন। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।

চামড়াশিল্পের আরেকটি দিক হলো মূল্য সংযোজন। আমরা এখনো মূলত কাঁচা বা আধা-প্রস্তুত চামড়া রপ্তানি করি। অথচ সবচেয়ে বেশি লাভ হয় চামড়াজাত পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করলে। একটি জুতার দাম, একটি ব্যাগের মূল্য, একটি জ্যাকেটের আন্তর্জাতিক বাজার—সবকিছুই আমাদের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। কিন্তু আমরা সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, ভেতরে প্রবেশ করতে পারছি না। কারণ, আমাদের নেই পর্যাপ্ত দক্ষতা, নেই আধুনিক ডিজাইন, নেই গবেষণার অবকাঠামো।

তারপরও আমি আশাবাদী। কারণ, আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি সম্ভাবনার জন্ম দেয়। এই শিল্পের শক্তি হলো এর কাঁচামাল, যা সম্পূর্ণ দেশীয়। এখানে অর্জিত অর্থ দেশের ভেতরেই থাকে। এটি একটি শ্রমঘন শিল্প, যা লাখো মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করতে পারে। ইতিমধ্যে ফুটওয়্যার খাতে আমরা কিছু অগ্রগতি দেখেছি। আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা বিশ্বমানের পণ্য তৈরি করছেন। সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে এই খাত আরও এগিয়ে যাবে।

আমাদের ছাগলের চামড়া, বিশেষ করে কুষ্টিয়া অঞ্চলের চামড়া, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই ব্র্যান্ডিংকে কাজে লাগানো গেলে আমরা প্রিমিয়াম বাজারে প্রবেশ করতে পারি।

সব সমস্যার সমাধান আছে, শুধু উদ্যোগ প্রয়োজন বাস্তবায়নের। সাভারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দ্রুত উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে। ট্যানারিগুলোকে সহায়তা দিতে হবে যাতে তারা সার্টিফিকেশন অর্জন করতে পারে। গ্রামপর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে চামড়া নষ্ট না হয়। সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাজারব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে প্রান্তিক মানুষ ন্যায্যমূল্য পান।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ভাবনায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা যদি শুধু কাঁচামাল বিক্রি করি, তাহলে আমরা পিছিয়েই থাকব। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে পণ্য তৈরি করা, ব্র্যান্ড তৈরি করা, বিশ্ববাজারে নিজেদের জায়গা তৈরি করা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তৈরি পোশাকশিল্প আমাদের এগিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন বহুমুখীকরণ। চামড়াশিল্প হতে পারে সেই নতুন পথের দিশা। কোরবানির ঈদ আমাদের সামনে যে সম্পদের দরজা খুলে দেয়, তা যদি আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে এই চামড়াই হয়ে উঠতে পারে কোটি মানুষের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার।

লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

কৃষক কেন এখনো মহাজননির্ভর

পরিকল্পনা কঠিন, বাস্তবায়ন আরও কঠিন

বাজেট হোক পরিবর্তনের দলিল

ধর্মীয় অনুশাসন থেকে জনকল্যাণের রাজনীতি

সুবিধাবঞ্চিতদের পুষ্টির উৎসব হোক কোরবানি

বদলে যাওয়া কোরবানির অর্থনীতির গল্প

দঙ্গলবাজির ব্যাক ফায়ার না ফ্রেন্ডলি ফায়ার

প্রবাসের দেশপ্রেম, বন্যার সিডনি জয়

যে তিন বিষয় কৃষকবান্ধব বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত

হামের কারণে এত শিশুর মৃত্যু পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড