হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

কৃষকের কষ্টের কথা পাঠকও শুনতে চায় না

আবু তাহের খান 

বেশির ভাগ মানুষ কৃষকের সমস্যার কথা জানতে একেবারেই অনাগ্রহী। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

বাংলাদেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ বর্তমানে শহরে বসবাস করে, যে হার ১৯৭২ সালে ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। মাত্র ৫৫ বছরে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ উন্নততর জীবনের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে বসবাস শুরু করলেও এবং এখানে এসে তারা নানা শহুরে জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হলেও এখানকার নতুন পেশা তাদের অধিকাংশের জন্যই এখনো পর্যাপ্ত আয়ের ব্যবস্থা করতে পারেনি। ফলে আয়ের এই অপর্যাপ্ততাকে পূরণ করে কোনোরকমে কায়ক্লেশে জীবন চালাবার জন্য এই শহুরে নাগরিকদের একটি বড় অংশকে এখনো গ্রামের চাল-ডাল-আম-কাঁঠালের দিকে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়; এই লেখককেও। অন্যদিকে জীবনবৃত্তান্তের যোগাযোগ-ঠিকানা হিসেবে শহরের নানা অলিগলি ও কানাগলির নম্বরের উল্লেখ করতে হলেও বচন, চিন্তা ও মননে তাদের বেশির ভাগ এখনো আসলেই গ্রামীণ এবং তাদের শরীরে এখনো ফসল-মাঠের ঘামের গন্ধ বেশ ভালোভাবেই লেগে আছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে তাদের মূল পরিচয়ের ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যকে যথেষ্ট গৌরবপূর্ণ ভঙ্গি ও মহিমায় তুলে ধরে বৈকি!

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এই অতি স্বল্প সময় আগে গ্রাম থেকে উঠে আসা এই মানুষদের বেশির ভাগ এখন গ্রাম নিয়ে ভাবতে, আলোচনা করতে কিংবা তার স্বগোত্রীয় কৃষকের সমস্যার কথা শুনতে ও জানতে একেবারেই আগ্রহ পোষণ করে না। এমনকি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে অবস্থানকারী মানুষের মধ্যে যারা গ্রাম থেকে উঠে এসেছে, তারাও না। অভিজ্ঞতা থেকে উদাহরণ হিসেবে বলি, পত্রিকায় লেখা কলামের শিরোনাম যখন নাগরিক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় বিষয়বস্তু হয়, তখন অনায়াসে সে প্রবন্ধের পাঠকের সংখ্যা বহুলাংশে বেড়ে যায়। কিন্তু লেখার বিষয়বস্তু যখন কৃষকের সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ-জল ইত্যাদি সমস্যা কিংবা দাদনদার-মহাজনের শোষণ, হাটবাজারের চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক টাউট-বাটপারদের অত্যাচার সংক্রান্ত হয়, তখন ওই সব লেখার পাঠকসংখ্যা হঠাৎ করে নিচে পড়ে যায়। তার মানে হচ্ছে, কৃষক ও অন্যান্য গ্রামীণ মানুষের সমস্যার কথা কেউ শুনতে চায় না এবং তাদের কষ্ট, দুর্ভোগ, হয়রানি ইত্যাদি তাদের অধিকাংশকে স্পর্শও করে না।

একটি উদাহরণ দিই। ২১ আগস্টের দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর, জয়পুরহাট ও মেহেরপুরে সরকারনির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে। মেহেরপুরে টিএসপি সার পাওয়াই যাচ্ছে না। ঘটনাটি জয়পুরহাট বা মেহেরপুরের হলেও অনুমিত যে অনুরূপ পরিস্থিতি হয়তো দেশের অন্যত্রও বিরাজ করছে। কারণ, বাংলাদেশের কৃষি-আবাদ ও বাজার-সংস্কৃতি সারা দেশে মোটামুটি প্রায় একই ধরনের। ফলে ধারণা করা চলে যে সারের এরূপ অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য ও দুষ্প্রাপ্যতা দেশের অন্যত্রও মোটামুটি একই অবস্থার মধ্যে রয়েছে। আর বিষয়টি ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন আমনের চারা সবেমাত্র মাঠে রোপণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত ফসল নিশ্চিত করতে হলে এখন থেকেই পরবর্তী কয়েক মাস ধরে জমিতে সার এবং অন্যান্য উপকরণ ও পরিচর্যা ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। এবং এটি নিশ্চিত করা না গেলে চলতি মৌসুমের কৃষি-উৎপাদন ব্যাহত হতে বাধ্য। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে হাজার হাজার শিল্প-কারখানা যেমনটি বন্ধ হয়ে গেছে, কৃষি খাতে সারের সমস্যাটিও অনেকটা অনুরূপ। কিন্তু শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে নাগরিক সমাজের ভেতরে ইতিমধ্যে যে ধরনের ন্যায্য উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে, সার তথা কৃষি খাত নিয়ে তেমন কোনো উদ্বেগ মোটেও চোখে পড়ছে না।

কৃষি ও কৃষকের সমস্যা চোখে না পড়ার কারণ অন্তত দুটি। এক. বাংলাদেশের উঠতি শহুরে সমাজের সদস্যরা কৃষি নিয়ে আলোচনা করাটাকে যথেষ্ট চৌকস (স্মার্ট) কাজ বলে মনে করেন না। তদুপরি তাঁরা এ আলোচনায় প্রবৃত্ত হলে এর মধ্য দিয়ে পেছনের অর্থাৎ পিতৃপুরুষের কৃষক পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যায় কি না, সে হীনম্মন্যতায়ও তাঁরা ভোগেন। দ্বিতীয়ত, কৃষকেরা অসংগঠিত বিধায় নিজেদের ঐতিহ্যিক ধারার কাজকর্মের মধ্য দিয়ে তাঁরা দেশের উৎপাদনে যথেষ্ট অবদান রাখলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো তাঁরা নিজেদের কাজকর্ম ও কথাবার্তার মাধ্যমে যথেষ্ট চমক সৃষ্টি করতে পারেন না। ফলে সুবিধাবাদী নাগরিক সমাজও তাদের নিয়ে আলোচনা করতে খুব একটা আগ্রহ বোধ করে না; রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্তগ্রহীতারা তো নন-ই। নইলে দেশে এই মুহূর্তে

সার-বীজসহ কৃষি উপকরণের মূল্য, মান ও প্রাপ্যতা

নিয়ে যে ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে এবং বিদ্যুৎ ও ডিজেল ঘাটতির কারণে জমিতে প্রয়োজনীয় সেচ-জল সরবরাহের ক্ষেত্রে যে ধরনের সংকট চলছে, তাতে করে এই মুহূর্তের জন আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তুই তো হওয়া উচিত ছিল কৃষি। কারণ, অতি নিম্ন আয়ের এ দেশে এ কৃষিই এখন পর্যন্ত এ দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং সবচেয়ে বেশি বাঁচিয়েছে বড় বড় অর্থনৈতিক সংকটের দিনগুলোতে।

কৃষির প্রতি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্রাতিরিক্ত অবহেলা ও তাচ্ছিল্যের কারণে এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার গত দুই বছরে এমনিতেই অনেক নিচে নেমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ ও ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ অঞ্চলকে কৃষির হাব বানানোর ঘোষণা দেওয়া হলে কৃষির প্রতি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে খুব একটা পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয় না। ফলে বিগত দুই বছরের মতো ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও যদি কৃষি খাতে নিম্নপ্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের বিপদে পড়বে বলে আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আর এ বিপদকে সংকটে রূপান্তর করে তুলতে পারে অপ্রতুল জ্বালানি সরবরাহের কারণে শিল্পোৎপাদন ব্যাপক হারে ব্যাহত হওয়ায়।

এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু সরকারের কার্যকালের মেয়াদ ইতিমধ্যে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও যতটুকু জানা যায়, উল্লিখিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এখন পর্যন্ত গঠিত হয়নি। ফলে সেখানে কৃষি খাতের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার বিষয়টিই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের আসন্ন তৃতীয় অধিবেশনেও আলোচনা হতে পারে। তবে গত দুই অধিবেশনের অভিজ্ঞতাদৃষ্টে সে ধরনের আলোচনা সেখানে না হওয়ার আশঙ্কাই সর্বাধিক। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে শেষ পর্যন্ত উল্লিখিত তিন পর্যায়ের কোনো স্তরে আলোচনা হোক বা না হোক, কৃষি উৎপাদন বাড়াবার লক্ষ্যে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ-জল ইত্যাদির মূল্য ও সরবরাহের বিষয়টিতে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তবে শিল্প খাতের সমস্যার বিষয়ে সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানানোর জন্য তাদের একাধিক সংগঠন ও সমিতি রয়েছে, যা কৃষকের নেই। এমতাবস্থায় তাদের পক্ষে দাবি উত্থাপন করতে হলে কৃষক ও কৃষির প্রতি মমতাবান সাধারণ মানুষদেরই তা করতে হবে, বিশেষত সেই সব মানুষ, যারা গ্রাম ও কৃষি থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু

তারা তা করবে কি? খুব একটা ভরসা হয় না। কারণ, আত্মপরিচয় লুকাবার উদ্দেশ্যে তারা যেমন এ নিয়ে কথা বলতে চায় না, তেমনি তথাকথিত বিশ্বায়নের প্রভাবে তাদের মধ্যে যে ধরনের মানসিক রূপান্তর ঘটেছে, তাতে করে এ বিষয়টির সঙ্গে ইতিমধ্যে তাদের একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে এ নিয়ে তারা কথা বলবে না বলেই ধারণা করা চলে।

অবশ্য এত কিছুর পরও আশা করব, সরকারের পক্ষ থেকে কেউ না কেউ বিষয়টির প্রতি মনোযোগী হবেন। নইলে অর্থনীতি যেভাবে মন্দার দিকে যাচ্ছে, তাতে করে যে ১০ শতাংশের হাতে দেশের ৫৮ শতাংশ সম্পদের মালিকানা, তারা ছাড়া বাকি সবাইকে নিশ্চিত ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে। অতএব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিছক বেঁচে থাকার প্রয়োজনে হলেও কৃষির দিকে তাকাতেই হবে। পাঠককেও কৃষিসংক্রান্ত আলোচনার প্রতি আরেকটু আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানাই, যাতে সেই আগ্রহ কৃষির অনুকূলে জনমত গঠনের কাজে সহায়ক হতে পারে।

লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক