হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অবরুদ্ধ দেশের সাংবাদিকতা

প্রেক্ষিত একাত্তর-৯

জাহীদ রেজা নূর  

জাহীদ রেজা নূর

মোনেম খানের কথা অনেকেরই মনে পড়ে যাবে। ‘আইয়ুব-মোনেম ভাই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই’ ছিল একসময়ের জনপ্রিয় স্লোগান। সেই মোনেম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর অবসর জীবনযাপন করছিলেন বনানীতে সদ্যনির্মিত বাড়িতে। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে আততায়ীর হাতে নিহত হন তিনি।

পূর্ব পাকিস্তানকে যেভাবে শোষণ করা হচ্ছিল, তাতে আইয়ুবের পাশাপাশি মোনেম খানেরও হাত ছিল। ফলে আন্দোলনরত বঙ্গবাসী মোনেম খানের প্রতিও ক্ষুব্ধ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মোনেম খানকে হত্যা করার ঘটনা যুদ্ধকে চাঙা করতে অবদান রেখেছিল। খবরটি কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল অবরুদ্ধ বাংলাদেশে, সেটা দেখা যাক। দৈনিক পাকিস্তানে লেখা হয়েছিল এভাবে:

মোনেম খান গুলিতে নিহত স্টাফ রিপোর্টার হাসপাতাল সূত্রে জানান হয়েছে যে, আজ বৃহস্পতিবার ভোর ০৩.৪৫ মিনিটে জনাব মোনেম খান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)

পূর্ববর্তী খবরে প্রকাশ

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জনাব আব্দুল মোনেম খান তার বনানীস্থ বাসভবনে আততায়ীর গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। গভীর রাতে এপিপি পরিবেশিত খবরে হাসপাতাল কর্তৃক বলা হয় যে, জনাব মোনেম খানের অবস্থা গুরুতর।

পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে উক্ত খবরে আরো বলা হয় যে দুজন দুষ্কৃতিকারী জনাব মোনেম খানের উপর গুলি চালায়।

পুলিশ জানায় যে জনাব মোনেম খানের বাসভবনের নীচের তলায় একটি হাত বোমাও পাওয়া গেছে।

গতকাল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জনাব মোনেম খানের জামাতা জনাব জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল ঘটনার বিবরণ দিয়ে আমাকে জানান যে গতকাল মাগরেব নামাজের পর জনাব আব্দুল মোনেম খান তার বনানীস্থ বাসভবনের ড্রইং রুমে আসেন। সেখানে তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যে সাবেক প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী জনাব আমজাদ হোসেন ও অপর কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা অপেক্ষা করছিলেন। জনাব জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেলও তখন বৈঠকখানায় ছিলেন। তারা যখন আলাপ-আলোচনা করছিলেন তখন ড্রইং রুমের দরজা খোলা ছিল এবং বারান্দায় বাতি নেভানো ছিল। এই সময়ে দরজার দিক থেকে কে বা কাহারা জনাব মোনেম খানকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলি তার পেটে বিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার রক্তাক্ত দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গুলি ছুড়ে আততায়ী অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে যায়। ড্রইং রুমের অন্যান্যরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাকে প্রাথমিক পর্যায়ে ৭ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে কেবিনে স্থানান্তরিত করা হয়।

পরে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে যে, জনাব মোনেম খানের শরীরে গুলি বিদ্ধ হয়ে বের হয়ে গেছে। তার শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। জনাব মোনেম খানের আহত হওয়ার সংবাদ পেয়ে তার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব হাসপাতালে তাকে দেখতে যান।

(দৈনিক পাকিস্তান, ১৪ অক্টোবর ১৯৭১)

খবরটি দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপা হয় এভাবে: মোনেম খান গুলিতে নিহত স্টাফ রিপোর্টার

হাসপাতাল সূত্রে জানান হয়েছে যে, আজ বৃহস্পতিবার ভোর ০৩.৪৫ মিনিটে জনাব

মোনেম খান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)

পূর্ববর্তী খবরে প্রকাশ

গতকাল (বুধবার) রাত্রে পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গবর্নর জনাব আবদুল মোনেম খান অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির গুলিতে গুরুতর আহত হইয়াছেন। তাঁহার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন বলিয়া গতকল্য অধিক রাত্রে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়াছে।

সাবেক গবর্নরের তলপেটের বাম দিকে গুলী বিদ্ধ হইয়াছে। আততায়ীরা জনাব আবদুল মোনেম খানের বনানীস্থ নবনির্মিত বাসভবনের বৈঠকখানায় ঢুকিয়া তাঁহাকে গুলী করে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ১৯৬৯ সালে গবর্নর পদ হইতে অবসর লাভের পর জনাব মোনেম খান তাঁহার বনানীস্থ বাসভবনে অবসর জীবন যাপন করিতেছেন।

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, গতকাল সন্ধ্যার পর ২ জন লোক সাবেক গবর্নর জনাব আবদুল মোনেম খানের সহিত সাক্ষাতের জন্য বনানীতে তাঁহার বাসভবনে যান। বৈঠকখানার কামরায় বসিয়া কথাবার্তা বলার মাঝখানে তাহারা সাবেক গবর্নর জনাব মোনেম খানের প্রতি গুলিবর্ষণ করে। গুলী তাঁহার তলপেটে বিদ্ধ হয়। তাঁহাকে গুলীবিদ্ধ করিয়া দুষ্কৃতকারীরা পলায়ন করিতে সক্ষম হয় বলিয়া পুলিশ সূত্রে জানা যায়। সাবেক গবর্নরের বাসভবনের নীচ তলায় একটি কামরা হইতে হাতবোমা উদ্ধার করা হয় বলিয়া এপিপি পরিবেশিত খবরে বলা হয়।

গুলীবিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনুমানিক রাত ৮টায় সাবেক গবর্নর জনাব আবদুল মোনেম খানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে ত্বরিত এক্সরে ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকা মেডিকল কলেজ হাসপাতালের সার্জিকাল প্রফেসরগণ তাঁহার জীবন রক্ষার জন্য কয়েক ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচার চালান এবং রাত ২টায় এই রিপোর্ট লেখার সময়ও অস্ত্রোপচার চলিতে থাকে।

(দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ অক্টোবর, ১৯৭১)

একই খবর দুটি পত্রিকা দুই রকম ট্রিটমেন্টে প্রকাশ করে। ইত্তেফাক শুধু তথ্য তুলে ধরেছে। মোনেম খানের ব্যাপারে বড় কোনো আগ্রহ তাতে প্রতিফলিত হয়নি। দৈনিক বাংলার রিপোর্টে মোনেম খানের প্রতি তাদের একধরনের সহানুভূতির প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তাদের আত্মীয়দের বর্ণনা, ঘটনার সময়কার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে বিস্তারিতভাবে।

মোনেম খানকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন মোজাম্মেল হক। তাঁর বয়স তখন চৌদ্দ বছর। পড়তেন নবম শ্রেণিতে। মেলাঘরে ট্রেনিং নিয়েছেন তিনি। এই দুঃসাহসী কাজটি করার জন্য মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত হন।

মোনেম খান হত্যার খবর যখন যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছাল, তখন তাঁরা তাতে অনুপ্রাণিত হলেন। অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর মনে ঢুকল ভয়। গেরিলা বাহিনী বিভিন্নভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে অতর্কিত আক্রমণ চালাচ্ছিল, তাতে ধীরে ধীরে পাকিস্তানি বাহিনী বেসামাল হয়ে পড়ছিল।

জাহীদ রেজা নূর, উপসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

খালেদা জিয়ার প্রস্থান ও আমাদের প্রত্যাশা

বিদ্যালয়ে ভর্তিতে তবু বৈষম্যের ছায়া

স্বাগত ২০২৬: উত্তরণের পথে যাক দেশ

আসুন, উল্টো করে ভাবতে শিখি

নাইজেরিয়া: মার্কিন হামলার ফল হবে হিতে বিপরীত

সংগ্রামী জীবনের সমাপ্তি

খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী

ফিরে দেখা ২০২৫ সাল

বিদায়ী বছর ভালো কাটেনি, এবার আশা নতুন ভোরের

স্বস্তিটাকে স্থায়ী রূপ দিতে পারবেন তো