বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক জরিপ পুরোনো সত্য নতুন সংখ্যায় প্রমাণ করেছে। দেশে মোট খাদ্য উৎপাদকদের ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক। অথচ তাঁদের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। বড় কৃষকের আয় প্রায় চার গুণ বেশি—১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। শ্রম-দিন হিসাবে দেখলেও একই চিত্র মেলে। ক্ষুদ্র কৃষক প্রতি শ্রম-দিনে আয় করেন ১ হাজার ৪৯৪ টাকা। বড় কৃষকের আয় ২ হাজার ৩০১ টাকা। জাতীয় গড় দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৬৮ টাকায়।
সংখ্যাগুলো শুকনো। কিন্তু এর পেছনে গভীর অর্থনৈতিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। যাঁরা দেশের অর্ধেকের বেশি খাদ্য উৎপাদন করেন, তাঁরা কেন এত কম আয় করেন? উত্তর খুঁজতে হলে অর্থনীতির ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়।
১৯৬৪ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ থিওডোর শুলজ ট্রান্সফর্মিং ট্র্যাডিশনাল অ্যাগ্রিকালচার নামের একটি বই লেখেন, যা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর যুক্তি ছিল সহজ কিন্তু সে সময়ের প্রচলিত ধারণার বিপরীত। উন্নয়নশীল দেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষক অযৌক্তিক নন। তাঁরা যে সম্পদ হাতে পান, তা যথাসম্ভব দক্ষভাবেই ব্যবহার করেন। সমস্যা কৃষকের বুদ্ধিতে নয়, সমস্যা তাঁর হাতে থাকা প্রযুক্তি ও সুযোগে। শুলজ দেখান, সরকারি নীতি প্রায়ই শহরের পক্ষে ঝুঁকে থাকে। ফসলের দাম কম রাখা হয় কৃত্রিমভাবে। কৃষি সম্প্রসারণ-সেবা দুর্বল থাকে। ফলে ক্ষুদ্র কৃষক নতুন প্রযুক্তি নিতে দ্বিধা করেন না, বরং সেই প্রযুক্তি তাঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বাংলাদেশের এই জরিপের ফলাফল সেই তত্ত্বকেই যেন প্রতিধ্বনিত করে। ক্ষুদ্র কৃষক অদক্ষ নন। তাঁদের প্রতি শ্রম-দিনের আয় জাতীয় গড়ের বেশ কাছাকাছি। কিন্তু তাঁদের হাতে জমি কম, মূলধন কম, বাজারে প্রবেশাধিকারও কম। এর ফল হলো, একক দক্ষতা ধরে রেখেও মোট আয়ে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়।
অবশ্য শুলজের তত্ত্বও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। অনেক গবেষক বলেন, তাঁর তত্ত্ব ঘরের ভেতরের অদৃশ্য শ্রম, নারীর অবদান কিংবা জমির অসম মালিকানার রাজনীতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। তবু তাঁর মূল অন্তর্দৃষ্টি আজও প্রাসঙ্গিক। কৃষক যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেন, সুযোগ পেলে বদলান।
পরে অর্থনীতিবিদ মাইকেল লিপটন আরেকটি ধারণা যোগ করেন, যাকে বলে নগর-পক্ষপাত তত্ত্ব। তাঁর মতে, উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টন প্রায়ই শহুরে শিল্প ও ভোক্তার পক্ষে ঝোঁকে। সড়ক, বিদ্যুৎ, ঋণ ও গবেষণা বরাদ্দে গ্রাম তুলনামূলক কম গুরুত্ব পায়। পিটার টিমারের কাঠামোগত রূপান্তর তত্ত্বও একই কথা ভিন্নভাবে বলে। তাঁর মতে, কৃষি থেকে শিল্পে অর্থনীতির স্বাভাবিক রূপান্তর তখনই ন্যায্য হয়, যখন কৃষিতে আগে উৎপাদনশীলতা বাড়ে, তারপর শ্রম ধীরে ধীরে সরে যায়। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে এই ক্রম উল্টে গেছে, কৃষি পিছিয়ে থেকেই শহরমুখী অভিবাসন ত্বরান্বিত হয়েছে।
১৯৮৬ সালে ভিয়েতনাম একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। নাম দোই মোই, অর্থাৎ নবায়ন। তখন ভিয়েতনামের কৃষি ছিল সমবায়নির্ভর, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত। ১৯৮৮ সালের একটি সংস্কার প্রস্তাবের মাধ্যমে সমবায়গুলো তাদের প্রায় সব জমি পরিবারের হাতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেয়। বার্ষিক ফসলের জন্য ১৫ বছর, দীর্ঘমেয়াদি ফসলের জন্য ৪০ বছরের লিজ দেওয়া হয়। জমির চূড়ান্ত মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে থাকলেও ব্যবহারের অধিকার নিরাপদ হয়ে ওঠে।
ফল আশ্চর্যজনক। এক দশকের মধ্যে ভিয়েতনাম চাল আমদানিকারক থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চাল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। মেকং বদ্বীপে ধানের ফলন ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ে। দোই মোই-পরবর্তী সময়ে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার গড়ে বার্ষিক সাড়ে ৩ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। পাশাপাশি কফি ও কাজুবাদামের মতো রপ্তানিমুখী পণ্যেও ভিয়েতনাম বিশ্ববাজারে দৃঢ় জায়গা করে নেয়।
অনুরূপ একটি অভিজ্ঞতা চীনেও ঘটে ১৯৭৮ সালের পর। কমিউনভিত্তিক যৌথ চাষাবাদ ভেঙে পরিবারভিত্তিক দায়িত্ব ব্যবস্থা চালু করা হয়। প্রতিটি পরিবার নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির উৎপাদনের দায়িত্ব নেয়, উৎপাদনের একাংশ রাষ্ট্রকে দিয়ে বাকিটা নিজের জন্য রাখে। কয়েক বছরের মধ্যে শস্য উৎপাদন ব্যাপক বাড়ে। অর্থনীতিবিদেরা পরে দেখান, এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ নতুন প্রযুক্তি নয়, বরং প্রণোদনা কাঠামোর পরিবর্তন থেকে এসেছিল। কৃষক যখন নিজের পরিশ্রমের ফল নিজে ভোগ করার নিশ্চয়তা পান, তখন উৎপাদনশীলতা স্বাভাবিকভাবে বাড়ে। দুই দেশের অভিজ্ঞতা থেকে একই শিক্ষা মেলে, জমি ভাগ করে দেওয়াই যথেষ্ট নয়, কৃষকের হাতে ব্যবহারের নিরাপত্তা থাকতে হবে, যাতে তিনি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সাহস পান।
জমির বাইরেও একটি সমস্যা থেকে যায়—বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা। একজন বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র কৃষক ফড়িয়ার কাছে যে দাম পান, তা প্রায়ই তাঁর প্রকৃত উৎপাদন খরচের কাছাকাছি কিংবা তার নিচে। এই সমস্যার সমাধানে ভারত সরকার ২০২০ সালে ১০ হাজার কৃষক উৎপাদক সংগঠন বা এফপিও গঠনের একটি প্রকল্প হাতে নেয়, যার বরাদ্দ ছিল প্রায় ৭ হাজার কোটি রুপি। প্রতিটি সংগঠন কোম্পানি আইন কিংবা সমবায় আইনের অধীনে নিবন্ধিত হয়। কৃষকেরা একসঙ্গে বীজ ও সার কেনেন, একসঙ্গে ফসল বিক্রি করেন। এতে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে, উৎপাদন খরচ কমে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংগঠনের সদস্য পরিবারের বার্ষিক আয় অসদস্য পরিবারের চেয়ে বেশি। প্রায় ৩০ লাখ কৃষক এখন এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের প্রায় ৪০ শতাংশ নারী। ওডিশার একটি সংগঠন সম্মিলিতভাবে হলুদ রপ্তানি করে প্রিমিয়াম দামে, মধ্যপ্রদেশের একটি সংগঠন সদস্যদের স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিছু সংগঠন ডিজিটাল বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফড়িয়া বাদ দিয়ে সরাসরি অনলাইনে পণ্য বিক্রি করছে। প্রতিটি নতুন সংগঠনকে তিন বছরের ব্যবস্থাপনা সহায়তা এবং ঋণের বিপরীতে সরকারি গ্যারান্টি তহবিলও দেওয়া হয়, যাতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকগুলো এই সংগঠনগুলোকে ঋণযোগ্য মনে করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন্তত চারটি দিক থেকে কাজ শুরু করা যায়। প্রথমত, ক্ষুদ্র কৃষকদের সংগঠিত করা দরকার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিআরডিবি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে ভারতের এফপিও মডেলের আদলে উৎপাদক সংগঠন গড়ে তোলা যায়। এতে বীজ-সার কেনা ও ফসল বিক্রি—দুই দিকেই দর-কষাকষির শক্তি বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, জমি ব্যবহারের অধিকার নিরাপদ করা জরুরি। বাংলাদেশে জমির টুকরো হয়ে যাওয়া একটি পুরোনো সমস্যা। উত্তরাধিকার আইনের কারণে প্রজন্মে প্রজন্মে জমি ভাগ হতে থাকে। ভিয়েতনাম ও চীনের অভিজ্ঞতা বলে, মালিকানাকাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেও দীর্ঘমেয়াদি বর্গা বা লিজ চুক্তির মাধ্যমে কৃষককে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব। এতে সেচ, মাটি উন্নয়ন বা বহুবর্ষজীবী ফসলে বিনিয়োগ করার সাহস তিনি পাবেন।
তৃতীয়ত, ঋণ ও বিমা কাঠামোয় সংস্কার দরকার। ক্ষুদ্র কৃষক প্রায়ই আনুষ্ঠানিক ব্যাংকঋণের বাইরে থাকেন। কারণ, তাঁর কাছে জামানত নেই। ভারতের এফপিও প্রকল্পে যেমন সংগঠনের নামে ঋণ গ্যারান্টি তহবিল আছে, বাংলাদেশেও তেমন একটি কাঠামো তৈরি করা যায়। এতে ব্যক্তি নয়, সংগঠন জামানত হয়ে উঠবে এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি কমবে।
চতুর্থত, নীতি হতে হবে অঞ্চলভিত্তিক। বিভাগভিত্তিক তথ্যই এই বৈচিত্র্যের প্রমাণ দেয়। রাজশাহীতে ক্ষুদ্র কৃষকের শ্রম-দিন প্রতি উৎপাদনশীলতা সর্বোচ্চ, ২ হাজার ৯৩ টাকা এবং বার্ষিক আয়ও সর্বোচ্চ, ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা। এ ছাড়া ময়মনসিংহে উৎপাদনশীলতা সবচেয়ে কম, ১ হাজার ১৩৫ টাকা। সিলেটে বার্ষিক আয় সবচেয়ে কম, ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা এবং এই বিভাগেই ক্ষুদ্র কৃষকের অনুপাতও জাতীয় গড়ের চেয়ে কম, মাত্র ৩৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এই ভিন্নতা বলে দেয়, সবার জন্য একই মাপের নীতি কার্যকর হবে না। চট্টগ্রাম ও রংপুরের মতো বিভাগে, যেখানে ক্ষুদ্র কৃষকের অনুপাত সর্বোচ্চ, সেখানে সংগঠন গড়ে তোলার কাজ সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
শেষ কথা হলো, বিবিএসের জরিপটি শুধু পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদন নয়। এটি একটি আয়না, যেখানে বাংলাদেশের কৃষি নীতির অসম্পূর্ণতা প্রতিফলিত হয়েছে। শুলজ যা বলেছিলেন ষাটের দশকে, তা আজও সত্য। কৃষক অদক্ষ নন, কাঠামো তাঁকে পিছিয়ে রাখে। কাঠামো বদলালে ফল বদলাবে। দারিদ্র্য বিমোচন এবং ক্ষুধামুক্তির লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথেও এই কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এগিয়ে যাওয়ার সহজ কোনো বিকল্প নেই।
এম এম মুসা, উন্নয়নকর্মী ও গবেষক