হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিশ্বকাপ ফুটবল: ঐক্যের এক মহোৎসব

নাজমুল ইসলাম ফারুক

খেলার মাধ্যমে যে বিশ্বকে আরও কাছাকাছি আনা যায়, বিশ্বকাপ ফুটবল তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর মানচিত্রে অসংখ্য রাষ্ট্র, শত শত ভাষা, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, জাতি, ধর্ম ও ঐতিহ্য বিদ্যমান। এই বৈচিত্র্য যেমন মানবসভ্যতার সৌন্দর্য, তেমনি অনেক সময় বিভাজন, সংঘাত ও প্রতিযোগিতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এমন কিছু উপলক্ষ আছে, যখন এই বৈচিত্র্য এক মহামিলনের রূপ নেয়। ফিফা বিশ্বকাপ তেমনই এক অনন্য বৈশ্বিক আয়োজন, যেখানে কোটি কোটি মানুষ রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ধর্মীয় বিভেদ কিংবা ভাষাগত দূরত্ব ভুলে একই আবেগে উদ্বেলিত হয়।

বিশ্বকাপ কেবল একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি মানবসভ্যতার এক বিশাল সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। একদিকে মাঠে ৯০ মিনিটের লড়াই, অন্যদিকে গ্যালারি, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শতকোটি মানুষের সম্মিলিত উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এটি বিশ্বমানবতার এক বিরল অভিজ্ঞতা।

বর্তমান সময়ে ফুটবলকে সামাজিক সম্প্রীতি ও বিশ্বঐক্যের প্রতীক হিসেবে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে ফিফা ‘ফুটবল ইউনিটিস দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ পরিচালনা করছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ফুটবলের মাধ্যমে শান্তি, পারস্পরিক সম্মান, শিক্ষা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করা।

ফুটবল এমন একটি ভাষা, যার জন্য কোনো অনুবাদক প্রয়োজন হয় না। একজন আফ্রিকান শিশু, একজন এশীয় কিশোর, একজন ইউরোপীয় সমর্থক কিংবা লাতিন আমেরিকার কোনো প্রবীণ—সবাই একই গোল উদ্‌যাপন করতে পারে, একই বিজয়ে আনন্দিত হতে পারে এবং একই পরাজয়ে অশ্রু ঝরাতে পারে। এই আবেগই ফুটবলকে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত করেছে।

বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর শুধু চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করে না; এটি বিশ্ববাসীকে শেখায় সহাবস্থান, প্রতিযোগিতার মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নিয়মের প্রতি আনুগত্য। মাঠে প্রতিপক্ষ হলেও ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের করমর্দন মানবিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য প্রতীক।

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, বর্ণবাদ, বিদ্বেষ ও বিভক্তির খবর যখন প্রতিনিয়ত আমাদের ব্যথিত করে, তখন বিশ্বকাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের মিলনের শক্তি বিভেদের শক্তির চেয়ে অনেক বড়। ফুটবল প্রমাণ করে, ভাষা ভিন্ন হতে পারে, পতাকা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আনন্দ, আশা, স্বপ্নের ভাষা এক ও অভিন্ন।

এ কারণেই ফিফা বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি বিশ্বঐক্য, মানবিক সংহতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক জীবন্ত প্রতীক। খেলার মাধ্যমে যে বিশ্বকে আরও কাছাকাছি আনা যায়, বিশ্বকাপ তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

ফিফা বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—প্রকৃত বিজয় কেবল ট্রফি জয় নয়, বরং মানুষের হৃদয় জয়। মাঠে একটি দল শিরোপা অর্জন করে, কিন্তু খেলার সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায়, দলগত প্রচেষ্টা এবং পারস্পরিক সম্মান বিশ্বের কোটি মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। একজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ নৈপুণ্যের পেছনে যেমন বছরের পর বছর কঠোর অনুশীলন থাকে, তেমনি একটি সফল দলের পেছনে থাকে পারস্পরিক আস্থা, আত্মত্যাগ এবং সমন্বিত পরিকল্পনা। এই শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

বিশ্বকাপ তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা বহু ফুটবলার অক্লান্ত পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন। তাঁদের জীবনকাহিনি প্রমাণ করে, প্রতিভার সঙ্গে পরিশ্রম যুক্ত হলে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে। তাই তরুণদের জন্য বিশ্বকাপ শুধু বিনোদনের উপলক্ষ নয়; এটি আত্ম-উন্নয়ন, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা ও লক্ষ্যনিষ্ঠ জীবনের একটি বাস্তব পাঠশালা।

তবে খেলার প্রতি ভালোবাসা যেন কখনো অন্ধ সমর্থনে পরিণত না হয়। একটি দলকে সমর্থন করার অর্থ অন্য দলকে ঘৃণা করা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বাস্তবজীবনে কটূক্তি, বিদ্বেষ বা সহিংসতা খেলাধুলার চেতনাবিরোধী। প্রকৃত ক্রীড়াসুলভ মনোভাব হলো প্রতিপক্ষের ভালো খেলাকে সম্মান করা এবং জয়-পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা।

ইসলামের দৃষ্টিতেও সুস্থ ও কল্যাণকর খেলাধুলাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলাম মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলাবোধকে গুরুত্ব দেয়। তবে এমন বিনোদন গ্রহণযোগ্য, যা মানুষের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি না করে। খেলাধুলা যদি সৌহার্দ্য, স্বাস্থ্য, সহযোগিতা এবং ইতিবাচক চরিত্র গঠনের মাধ্যম হয়, তবে তা সমাজের জন্য কল্যাণকর।

বিশ্বকাপ আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—বিশ্বায়নের যুগে পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যেমন একটি ফুটবল দল একক কোনো খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে সফল হতে পারে না, তেমনি বিশ্বও একক কোনো রাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈষম্য, সংঘাত ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। ফুটবলের দলগত চেতনা সেই বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়, স্টেডিয়ামের আলো নিভে যায়, বিজয়ীরা ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে থেকে যায় কিছু অনুপ্রেরণা—কঠোর পরিশ্রমের মূল্য, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি সম্মান, বৈচিত্র্যের প্রতি সহনশীলতা এবং ঐক্যের শক্তি। এ কারণেই বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি মানবসভ্যতার এক অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে আমাদের প্রয়োজন আরও বেশি সংলাপ, আরও বেশি সহযোগিতা এবং আরও বেশি মানবিক সংহতি। ফুটবল সেই সংহতির একটি শক্তিশালী ভাষা। একটি বল যখন কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনকে এক ছন্দে বেঁধে ফেলে, তখন বোঝা যায়—মানুষের মিলনের শক্তি সব বিভেদের চেয়ে বড়।

ফিফা বিশ্বকাপ আমাদের শেখায়, পৃথিবীকে জয় করা যায় অস্ত্রের শক্তিতে নয়, হৃদয়ের সংযোগে; বিভাজনের মাধ্যমে নয়, সহযোগিতার মাধ্যমে; বিদ্বেষের ভাষায় নয়, সম্মান ও সৌহার্দ্যের ভাষায়। যদি আমরা বিশ্বকাপের এই ইতিবাচক শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রজীবনে ধারণ করতে পারি, তবে একটি আরও শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ফুটবলের মাঠে যেমন একটি গোল লক্ষ-কোটি মানুষকে এক মুহূর্তে আনন্দে একত্র করে, তেমনি মানবতা, ন্যায়, সম্মান এবং সহযোগিতার মূল্যবোধও একদিন পুরো বিশ্বকে একটি বৃহত্তর পরিবারে পরিণত করতে পারে। সেই স্বপ্নই হোক ফিফা বিশ্বকাপের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন—এক বল, এক পৃথিবী, এক মানবতা।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন: একটি রাজনৈতিক পর্যালোচনা

আসিয়ান ও ব্রিকস কেন অপরিহার্য

দুই পারের মৌলবাদ একে অন্যকে পুষ্ট করে

একটি নীরব কিন্তু গভীর রাষ্ট্রীয় সংকেত

স্থায়ী কমিটি গঠনে ধীরগতি কেন

ঐতিহ্যের অমৃত সাগর কলার রপ্তানি-সম্ভাবনা

দ্বিচারিতায় সমুজ্জ্বল ইতিহাস

বাংলাদেশ অর্থনীতির আগামী পথযাত্রা: করণীয় কী

জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রয়োজন জিন ব্যাংক

আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ