সম্প্রতি ঘোষিত ‘জাতীয় বেতনকাঠামো ২০২৬’ অনুমোদনের পর জাতীয় দৈনিকগুলোতে আসা হিসাব-নিকাশগুলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলে সদ্য যোগ দেওয়া তরুণ কর্মকর্তাদের প্রারম্ভিক বেতন এক লাফে দ্বিগুণ হবে। সংবাদটি প্রাথমিকভাবে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও এর আড়ালে যে গভীর নীতিগত অবিচার তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা একপ্রকার অনুপস্থিত। বিগত এক দশক ধরে বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি ইনক্রিমেন্টের সুফল শতভাগ ভোগ করার পরও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই সঙ্গে নতুন স্কেলে ‘ফিক্সেশন’ করে আবারও বিশাল লাফ দেওয়ার আইনি সুযোগ পাচ্ছেন—একই সুবিধা কার্যত দুইবার নেওয়া, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘ডাবল ডিপিং’ বলা হয়। আর এই দ্বিমুখী সুবিধার আসল মূল্য গুনতে হচ্ছে দেশের বাকি মানুষকে, যাদের কোনো ইনক্রিমেন্ট বা পে-স্কেলের সুরক্ষা ছাড়াই বাজারের মূল্যস্ফীতি সামলাতে হয়।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ১৭ বছর ধরে চাকরি করা একজন সহকারী শিক্ষকের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১১ হাজার টাকা হলেও বিগত বছরগুলোতে টানা ইনক্রিমেন্ট পেয়ে পেয়ে তা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৮০০ টাকায়। অর্থাৎ নতুন কোনো পে-স্কেল ছাড়াই বেসিক ইতিমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন নতুন পে-স্কেলে সেই বর্ধিত বেসিকের ওপরই আরেক দফা শতভাগ বা তার বেশি বৃদ্ধি যুক্ত হচ্ছে। একই শ্রেণির মানুষ একই দশকে দুইবার বড় ধরনের বেতন-উল্লম্ফনের সুবিধা পাচ্ছেন, অথচ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আয় বছরে সামান্য হারে বাড়ানোও কঠিন।
২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল প্রবর্তনের সময় ‘টাইম স্কেল’ ও ‘সিলেকশন গ্রেড’ বাতিল করে ৫ শতাংশ বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি ইনক্রিমেন্ট চালুর পেছনে এই যুক্তি ছিল যে এর ফলে বাজারে আতঙ্ক তৈরি করা পাঁচ-সাত বছর মেয়াদি এককালীন পে-কমিশন ব্যবস্থার স্থায়ী অবসান ঘটবে এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। অথচ বাস্তবে ঘটল উল্টো! আইনের প্রজ্ঞাপনে সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা না থাকার সুযোগে ১০ বছর ইনক্রিমেন্ট ভোগ করার পরই নতুন পে-কমিশন এসে হাজির হলো। এই আইনি ফাঁকফোকর কারও অজানা থাকার কথা নয়; কারণ, যাঁরা এই প্রজ্ঞাপন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেন, তাঁরা নিজেরাই এই সুবিধাভোগী শ্রেণির অংশ।
অন্য একটি খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে এবং সিপিডির হিসাবে ২০২৩ সালে আনুমানিক ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে দুর্বল নজরদারি, জটিল আইনকানুন ও করব্যবস্থায় দুর্নীতির কারণে। এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে ওঠে। রাজস্ব আহরণে এই ব্যর্থতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফসল। আর সেই নীতি প্রণয়ন ও তদারকির দায়িত্বে থাকেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই, যাঁরা নিজেরাই আবার ইনক্রিমেন্ট ও পে-স্কেলের দ্বিমুখী সুবিধা ভোগ করতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ যে শ্রেণির হাতে রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষমতা ও দায়িত্ব ছিল, রাজস্ব না বাড়িয়ে তারাই নিজেদের বেতন-সুবিধা দ্বিগুণ করে নেওয়ার পথ সুগম করছে। এই স্বার্থের দ্বন্দ্ব চিহ্নিত না করে কেবল বাজেট ঘাটতি বা মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করলে মূল সমস্যাটাই আড়ালে থেকে যায়।
শতভাগ বা তার বেশি বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা এলেই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। সরকারি চাকরিজীবীরা ইনক্রিমেন্ট ও পে-স্কেলের দ্বিমুখী সুবিধা দিয়ে সেই মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে পারলেও বাজারে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন অপ্রাতিষ্ঠানিক ও বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বেসরকারি চাকুরে, যাঁদের আয় বছরে সামান্য হারে বাড়ানোও কঠিন এবং যাঁদের পক্ষে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দর-কষাকষির সুযোগ নেই। সরকারি খাত যখন বাজার-বাস্তবতা উপেক্ষা করে কেবল আমলাতান্ত্রিক চাপে বেতন এক লাফে দ্বিগুণ করে নেয়, তখন প্রকৃতপক্ষে একটি ক্ষুদ্র, ক্ষমতাবান শ্রেণির স্বার্থ
রক্ষা করা হয় দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ব্যয়ে। এটি কেবল একটি বাজেটগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একধরনের কাঠামোগত অবিচার, যেখানে যাঁদের হাতে নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা আছে, তাঁরাই নিজেদের পক্ষে দুই দফা সুবিধা আদায় করে নেন।
আর যাঁদের সেই ক্ষমতা নেই, তাঁরাই বাজারের প্রতিটি ধাক্কা একা সহ্য করেন।
প্রথমত, আইনি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থা কার্যকর থাকা অবস্থায় বেসিকের ওপর পুনরায় সামগ্রিক পে-স্কেল বৃদ্ধি প্রয়োগের আগে পূর্ববর্তী ইনক্রিমেন্টের প্রকৃত মূল্য বিয়োগ করে নিট বৃদ্ধি নির্ধারণ করতে হবে, যাতে একই সুবিধা দুইবার গণনা না হয়। দ্বিতীয়ত, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দূর করতে একটি স্বাধীন বেতন-পর্যালোচনা কমিশন গঠন করা দরকার, যেখানে বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ ও অর্থনীতিবিদদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তৃতীয়ত, বার্ষিক ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই-ভিত্তিক) ডাইনামিক পে-ইনডেক্সিং চালু করা দরকার, যাতে বেতন বাড়ে প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে মিলিয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক চাপে নয়। আর সবচেয়ে জরুরি হলো, কর ফাঁকি রোধ ও কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধিতে সেই একই কাঠামোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, যে কাঠামো এত দিন রাজস্ব আহরণে ব্যর্থ থেকেও নিজেদের বেতন-সুবিধা দ্বিগুণ করার পথ খুঁজে নিয়েছে।
যত দিন পর্যন্ত নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা আর সুবিধাভোগের অবস্থান একই শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে, তত দিন এই দ্বিমুখী বেতনবৈষম্য দূর হবে না। ন্যায্য বেতনকাঠামো তখনই সম্ভব, যখন যাঁরা নীতি তৈরি করেন, তাঁরা নিজেরাই তাঁর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী না হয়ে ওঠেন।