হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন

কার জন্য লেখা হলো নতুন আইন

কাজী মারুফুল ইসলাম

৬ সেপ্টেম্বর সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন পাস হয়। ফাইল ছবি

জুলাই সনদ যখন গণভোটে অনুমোদিত হলো, তার ভেতরে একটি নিঃশব্দ অঙ্গীকার ছিল: এমন একটি রাষ্ট্র, যা আর তার নাগরিককে রাতের অন্ধকারে গুম করে দেবে না। শহীদ মিনারের সিঁড়িতে যে মায়েরা এক দশক ধরে সন্তানের ল্যামিনেট-করা ছবি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন—‘মায়ের ডাক’-এর সেই মুখগুলো—তাঁদের কাছে ওই অঙ্গীকারই ছিল অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ৬ সেপ্টেম্বর, বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে, সংসদে দুটি আইন পাস হলো—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন। প্রশ্নটি তাই সরল, অথচ অস্বস্তিকর—এই আইন রাষ্ট্র কার কথা ভেবে লিখেছে?

একটি আইন মূলত দুই ধরনের নাগরিকের কথা ভেবে লেখা যায়। একজন সেই নাগরিক, মধ্যরাতে যাঁর বাড়ির ফটকে নম্বরবিহীন মাইক্রোবাস থামলে তাঁর মুঠোফোনে অন্তত একটি প্রভাবশালী নম্বর সংরক্ষিত থাকে। আরেকজন সেই নাগরিক, ফোন করার মতো যাঁর কোনো নম্বরই নেই। নতুন দুই আইনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা শেষ পর্যন্ত এই একটি প্রশ্নেই এসে দাঁড়ায়—বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই দুজনের মধ্যে কাকে সামনে রেখে কলম ধরেছিল?

এ দুটি স্বতন্ত্র আইন, যদিও পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। একটি আইন গুমকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার শাস্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলে। অন্যটি নতুন করে গড়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সব ধরনের অধিকারের, গুমসহ, স্থায়ী প্রহরী। সাধারণ নাগরিকের ওপর এদের প্রভাব বুঝতে হলে আগে এদের আলাদা করে পড়া দরকার, তারপর একসঙ্গে।

শুরু করা যাক গুম আইন দিয়ে। এবং যা নতুন ও ইতিবাচক তা স্বীকার করে নিয়েই। বাংলাদেশে এই প্রথম গুমকে সাধারণ অপহরণের সঙ্গে মিশিয়ে না ফেলে একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। আইনে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার, তদন্ত ও বিচারের নির্দিষ্ট সময়সীমা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা পাঠানোর ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ। যে দেশে গত দেড় দশকে ‘গুম’ শব্দটি প্রাত্যহিক অভিধানে ঢুকে গেছে, সেখানে একটি স্বতন্ত্র আইন নিঃসন্দেহে কম প্রাপ্তি নয়। মানবাধিকার কমিশন আইনটিরও নিজস্ব কিছু ইতিবাচক দিক আছে—যেমন বাছাই সভার লিখিত কার্যবিবরণী প্রকাশ কিংবা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির কমিশনার হওয়ার পথ বন্ধ করা।

সমস্যা অঙ্গীকারে নয়, অঙ্গীকার রক্ষার জন্য দুই আইন যে যন্ত্র নির্মাণ করেছে, তার ভেতরে। দুই আইন জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তিনটি নকশাগত সিদ্ধান্ত এই উদ্যোগের গোটা উদ্দেশ্যটিকে প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দেয়।

প্রথমত, মানবাধিকার কমিশনের সদস্যদের এখন বেছে নেবেন কারা, আর কমিশনটি আদৌ সরকারের নাগালের বাইরে থাকছে কি না? ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পর্যালোচনায় ধরা পড়েছে সবচেয়ে নিঃশব্দ পরিবর্তনটি—অধ্যাদেশে থাকা ‘কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীন হইবে না’ কথাটি খসড়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার জায়গায় বসেছে এমন এক বাছাই কমিটি, যার সভাপতি সংসদের স্পিকার এবং সদস্য দুই মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে এই কমিটিতে ছিলেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, একজন প্রবীণ সাংবাদিক এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা একজন প্রতিনিধি। যে সংসদে একটি দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনের অধিকারী, সেখানে এটি নিরপেক্ষ কমিটি নয়, নির্বাহী বিভাগের নিজের পরিদর্শককে নিজেই বেছে নেওয়া। সরকার বলছে, এই বিন্যাস কমিশনকে আরও শক্তিশালী করেছে; যুক্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশে এমন কমিটির নেতৃত্বে থাকেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সবচেয়ে দুর্বল দৃষ্টান্তকে মানদণ্ড বানিয়ে নিজেকে বড় দেখানো যায় না; আর একটি মানবাধিকার কমিশনের প্রকৃত মানদণ্ড প্রতিবেশীর আইন বা ‘প্যারিস নীতিমালা’ নয় যে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোই এই প্রতিষ্ঠানের কথা।

দ্বিতীয়ত, গুমের তদন্ত করবেন কারা—এ প্রশ্নের উত্তর দুই আইনের মধ্যে সাযুজ্য আছে। গুম আইন প্রতিটি অভিযোগ তুলে দেয় একজন নির্ধারিত তদন্ত কর্মকর্তার হাতে—বাস্তবে যিনি সাধারণত উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার। এখানে একটা শর্ত দেওয়া হয়েছে—যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বাহিনী নিজের মামলা তদন্ত করতে পারবে না; তদন্তভার যাবে অন্য বাহিনীর কাছে। কাগজে-কলমে শর্তটি আশ্বস্ত করে। বাস্তবে এটি রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের এক শাখাকে আরেক শাখার বিচারক বানায়।

আর যে কমিশন এই শূন্যতা পূরণ করতে পারত, নিজের নতুন আইনই তাকে সেই ভূমিকা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা ছিল মানবাধিকার কমিশনের নিজেরই হাতে; নতুন মানবাধিকার কমিশন আইন সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। আর অভিযুক্ত যদি হয় কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী, কমিশন তখন বড়জোর ওই বাহিনীর প্রধানের কাছে তাঁরই বাহিনী সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন চাইতে পারবে। ‘সন্তুষ্ট’ হলে বিষয়টি সেখানেই শেষ, নইলে কেবল ‘সুপারিশ’। টিআইবি বলছে, এটি ২০০৯ সালের আইনের একটি ধারারই প্রায় হুবহু প্রত্যাবর্তন—যে দুর্বলতার কারণেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিদানকারী সংস্থা বাংলাদেশের কমিশনকে আজও সর্বোচ্চ ‘এ’ মর্যাদা দেয়নি। আর আটককেন্দ্র, গোয়েন্দা ও সামরিক স্থাপনাসহ, যেখানে গুম হওয়া মানুষদের রাখা হতো বলে অভিযোগ—নিয়মিত ও অঘোষিত পরিদর্শনের ক্ষমতাও নতুন খসড়ায় টিকে থাকেনি। দুই আইন মিলিয়ে দেখলে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধটির স্বাধীন তদন্তের ভার শেষমেশ কারও হাতেই থাকে না।

সমস্যা কেবল নিয়োগে থেমে থাকে না। সমস্যা আসলে আইনের পরতে পরতে। কমিশনের মোট জনবলের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত হতে পারেন প্রেষণে আসা সরকারি কর্মকর্তা; কমিশনের বাজেট, এমনকি কমিশনারদের বেতন—আগে যা সংবিধানের ৮৮ অনুচ্ছেদের অধীন সংযুক্ত তহবিলের ওপর ‘দায়যুক্ত ব্যয়’ হিসেবে সুরক্ষিত ছিল—এখন নির্ভর করছে নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছার ওপর। আর যে আইনি সহায়তা শাখা একজন দরিদ্র অভিযোগকারীকে নিজের পকেটের টাকায় আইনজীবী না রেখেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে দিত, তা-ও নিঃশব্দে তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে ফাঁপা করা হয়েছে ছত্রে ছত্রে।

তৃতীয়ত, গুম আইনের একটি ধারা, যা আইনপ্রণেতাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ফাঁস করে দেয়। নতুন আইনে পরে ‘মিথ্যা’ প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ভেবে দেখুন, এই ঝুঁকি কে বহন করতে পারে। প্রভাবশালী অভিযোগকারী তা সয়ে নিতে পারেন। ক্ষমতাহীন মানুষটি—পোশাকশ্রমিক, ইউনিয়ন পর্যায়ের বিরোধী কর্মী, কিংবা যে বাবার ছেলে আর ঘরে ফেরেনি—কারাদণ্ডের আশঙ্কাকে মাপবেন রাষ্ট্র নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেবে কি না সেই ক্ষীণ সম্ভাবনার বিপরীতে। আর সেক্ষেত্রে মুখ বুজে থাকাই শ্রেয় মনে করতে পারেন। একটি মাত্র ধারায় আইনের ভয়-উৎপাদক শক্তিটি গুমকারীর দিক থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো অভিযোগকারীর দিকে।

এই তিন সিদ্ধান্ত একসঙ্গে পড়লে শুরুর প্রশ্নটির উত্তর মেলে। ক্ষমতাঘনিষ্ঠ নাগরিকের কাছে এই পরিবর্তন প্রায় অর্থহীন, কারণ তাঁর নিরাপত্তার উৎস কখনোই কমিশন ছিল না, ছিল তাঁর পৃষ্ঠপোষক। আর ক্ষমতাহীন নাগরিকের জন্য আইনটি নিঃশব্দে সেই ক্ষমতা-বিন্যাসকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে, যা বিলোপের দাবি সে করছিল।

অন্তর্ভুক্তি ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের বিনির্মাণের জন্য এই আইনের পরিণতি সরাসরি। মুক্ত সমাজ টিকে থাকে সেই নাগরিকদের ওপর, যাঁরা রাষ্ট্র যা চাপা দিতে চায় তা প্রকাশ্যে আনেন। মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি আর কুক্ষিগত কমিশন—এই দুইয়ে মিলে তাঁদের জন্য উৎসাহজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় না। গুম আইনের সবচেয়ে চোখে-পড়া বৈশিষ্ট্য তার কঠোরতা, আর সেই কঠোরতাই আসল বার্তা। মৃত্যুদণ্ড কঠোরতার একটি দৃশ্য তৈরি করে, অথচ স্বাধীন তদন্তের নিঃশব্দ ও কঠিন কাজটি অসম্পন্নই থেকে যায়। দায়িত্বশীল রাষ্ট্র মানে জবাবদিহিতে বাধ্য রাষ্ট্র। এই আইন জবাবদিহির অভিনয় করে, জবাবদিহি দেয় না।

গুমের জন্য বিএনপির চেয়ে বেশি মূল্য আর কোনো দল দেয়নি। ‘মায়ের ডাক’-এর মায়েরা আজও যে ফাইলগুলো বুকে বহন করেন, তার অনেকগুলোতেই আছে এই দলেরই কর্মীদের নাম। ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরেছিল ঠিক এই ব্যবস্থাটি ভেঙে ফেলার অঙ্গীকারে। আর জুলাই অভ্যুত্থান ও তার সনদের ধার করা নৈতিক পুঁজিতে ভর করে। সাত মাসের মাথায় তাদের প্রথম বড় মানবাধিকার আইনটি অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়ার চেয়েও দুর্বল!

অর্থাৎ বিএনপি রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগমূলক কর্তৃত্বের গোড়ায় পানি দিয়ে গেল। এর স্পষ্টতম প্রমাণ একটিমাত্র ধারা, যা প্রায় অবিকল ফিরিয়ে আনে ২০০৯ সালের সেই আইনকেই—অভ্যুত্থান যাকে কবর দিতে চেয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার হয়ে বিএনপি—এই যাত্রায় দমনযন্ত্রের রক্ষকের হাত বদলায়। বদলায় না যন্ত্রটির কাঠামোগত স্বার্থ।

সরকারকে এর দাম দিতে হবে। দাম দিতে হবে একটি মুদ্রায়, অভ্যুত্থান যার বাস্তবতা ইতিমধ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে—বৈধতা। আর ক্ষুব্ধ মানুষের পরবর্তী প্রজন্ম শিখে নেবে, বিদ্রোহের গর্ভে জন্ম নেওয়া সরকারও একবার আসনে বসলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একচেটিয়া ক্ষমতাটিকেই আগলে রাখে।

তাই ফিরে আসি সেই দুই নাগরিকের কাছে। মুঠোফোনে নম্বর থাকা মানুষটি, চিরকালের মতোই, ভালো থাকবেন। এইমাত্র লেখা আইনটি, আবারও, অন্যজনের জন্য নয়। যত দিন না একটি স্বাধীন কমিশন রাষ্ট্রেরই তদন্ত করতে পারবে, আর যত দিন না গুমের অভিযোগ জানানো মানুষটি গুম করা মানুষটির চেয়ে বেশি নিরাপদ থাকবেন, তত দিন ‘প্রতিরোধ ও প্রতিকার’ কথাটি সেই প্রতিশ্রুতিরই নাম হয়ে থাকবে, যা ঠেকিয়ে রাখতেই আইনটি এত যত্ন করে লেখা হয়েছে।