হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

কিছু বোমা উদ্ধারেই কি কাটবে বৈশ্বিক উদ্বেগ

আজাদুর রহমান চন্দন

আল-কায়েদা ইন দি ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস) বাংলাদেশে সক্রিয় সেল বা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। সংস্থার ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল-কায়েদাসংক্রান্ত অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ৩৮তম প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ১০ আগস্ট প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সদস্যরাষ্ট্রগুলো—ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা মূল্যায়ন করে ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৯ জুন পর্যন্ত সময়কার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় হামলার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হামলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটিকে দায়ী করা হয়। এ প্রসঙ্গে বর্ণনার একপর্যায়ে বাংলাদেশেও একিউআইএসের সেল বা ছোট সাংগঠনিক ইউনিট প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে আল-কায়েদা ও আইএসের সামগ্রিক হুমকি মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকলেও সাহেল অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ায় তা আরও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি ১০ আগস্ট প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত সংবাদটি এসেছে তার দু-তিন দিন পর।

এদিকে ১১ আগস্ট রাতে ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের শ্যামপুর এলাকায় একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বোমা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) বেশ কিছু লিফলেট উদ্ধার করেছেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে নব্য জেএমবির কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাভারের শ্যামপুর এলাকার বাড়িটিতে অভিযান শুরু করার আগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হেমায়েতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শ্যামপুরের ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এরই মধ্যে পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, দেশের বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে সম্প্রতি জব্দ করা বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে মতিঝিল, আশুলিয়া, সাভার ও কেরানীগঞ্জ থেকে পাওয়া বোমায় ‘টাইমার’ যুক্ত ছিল। সব কটি বোমা ছিল ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)। গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি নব্য জেএমবির সদস্য। আরিফকে গ্রেপ্তারের পরদিন সাভারের সাধাপুর এলাকায় একটি মসজিদের মাঠে নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামে স্কচটেপে মোড়ানো একটি ‘প্রেশারকুকার’ বোমা উদ্ধার করা হয়।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও ১০টি ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোতে নব্য জেএমবির সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার দাবি করছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। তদন্তকারীদের দাবি, প্রতিটি ঘটনায় একই গ্রুপের পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে; তাঁরা হলেন নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু’ মামুন, শেখ আল আমিন, মোহাম্মদ আরিফ, রাকিব ও বাপ্পী। তাঁদের মধ্যে পলাতক মামুন নব্য জেএমবির এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ‘বোমারু মামুন’ ৯ বছর আগে জঙ্গিবাদের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েও ৫ আগস্টের পর জামিনে বেরিয়ে যান। ‘তাঁর বানানো’ বোমার আত্মঘাতী বিস্ফোরণে ২০১৭ সালে রাজধানীর পান্থপথে হোটেল ওলিওতে সাইফুল ইসলাম নামের এক তরুণ নিহত হয়েছিলেন। হোটেল ওলিওতে বিস্ফোরণের মামলায় মামুনসহ সব আসামিকেই গত জানুয়ারিতে খালাস দেন ঢাকার একটি আদালত। ওই রায়ে আদালত তাঁদের ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী নেতা-কর্মী’ হিসেবে অভিহিত করেন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন-সংক্রান্ত সংবাদটি দেখার পর থেকে বারবারই মনে প্রশ্ন জাগছে, এই প্রতিবেদনের সঙ্গে কি সাভারে পুলিশি অভিযানের কোনো সম্পর্ক আছে? কারণ বর্তমান ক্ষমতাসীন দলসহ সমমনা কোনো দল বাংলাদেশে জঙ্গিদের অস্তিত্বই স্বীকার করে না। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার লক্ষ্যে জঙ্গি তৎপরতার নাটক সাজাত।

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকালে এবং এর পরপর অসংখ্য জঙ্গি কারাগার থেকে পালিয়ে গেলেও কিংবা কারাগার ভেঙে জঙ্গিদের বের করে নেওয়া হলেও এ নিয়ে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে উদ্বেগের লেশমাত্র দেখা যায়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মামুনের মতো আরও অনেক অভিযুক্ত জঙ্গি আদালত থেকে জামিন নিয়েও বেরিয়ে গেছেন মূলত ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা-ঘনিষ্ঠদের ‘উদার দৃষ্টিভঙ্গির’ সুযোগে। জঙ্গি ইস্যুতে এমন দৃষ্টিভঙ্গির একটি সরকারের পক্ষে হঠাৎ জঙ্গিবিরোধী তৎপরতা চালানোটা কি শুধুই জাতিসংঘের উদ্বেগ প্রশমনের প্রয়াস নাকি প্রকৃত অর্থেই জঙ্গিবাদ দমনের চেষ্টা?

প্রাসঙ্গিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে, রাজনৈতিক, সামাজিক ও মতাদর্শিক কারণে তীব্র ও গভীরভাবে বিভক্ত একটি সমাজে শুধু পুলিশি তৎপরতার মাধ্যমে কি জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভব? এ ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রতি সামান্যতম আস্থাশীল দলগুলোর মধ্যেও যদি সমঝোতা না থাকে, তবে শতচেষ্টায়ও জঙ্গিবাদ দমন দূরের কথা সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জন করাটাও দুরূহ। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আজকের পত্রিকায়ই গত ২২ জুন ছাপা হওয়া এক নিবন্ধে গুরুতর অপরাধের বিচারের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে রিকনসিলিয়েশন তথা পুনর্মিলন বা পুনঃ সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলাম। পরের মাসেই দেখলাম, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ‘পলিটিক্যাল রিকনসিলিয়েশন সংস্কৃতি’ চালু করার পরামর্শ দিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় শীর্ষস্থানীয় এক জাতীয় দৈনিকে। একই পত্রিকায় চলতি মাসে পর পর তিনটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে একই বিষয়ে। এগুলোর মধ্যে শুধু একটি নিবন্ধে লেখক বাংলাদেশের বাস্তবতায় রিকনসিলিয়েশনের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

এ দেশে রাজনীতি নিয়ে কিছু লেখার একটি বড় ঝুঁকি হলো, বেশির ভাগ পাঠকও খোঁজার চেষ্টা করেন যে লেখাটি বৃহৎ দুই রাজনৈতিক মেরুর কোনটির পক্ষে বা বিপক্ষে। লেখকদেরও বড় অংশ প্রভাবিত হয়ে লিখতে অভ্যস্ত। আমার লেখার পাঠক-পরিসর যে খুব বড় নয়, সে বিষয়ে আমি সচেতন। স্বল্পসংখ্যক যে পাঠকেরা লেখাটি পড়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে খুব কাছের কেউ কেউ একটি দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছেন। যদিও যে দলটির প্রতি তাঁরা পক্ষপাত খুঁজে পেয়েছেন, সেই দলের নেতৃত্ব পর্যায়ের তেমন কেউই লেখাটির বিষয়ে সন্তুষ্ট নন। দেশের বাইরে অবস্থানরত দলটির শীর্ষ নেতা সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেছেন যে তিনিও রিকনসিলিয়েশন চান; কিন্তু তিনি বা তাঁর দল গুরুতর কোনো অপরাধ করেছে বলে তিনি মনেই করেন না। অথচ রিকনসিলিয়েশনের একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হলো দোষী পক্ষের মধ্যে অনুশোচনা এবং তার ভুল অনুধাবন করার তাড়না। তাঁরা যে সন্তুষ্ট হবেন না, সে বিষয়ে সচেতন ছিলাম লেখার আগেই। তবে হ্যাঁ, এই প্রক্রিয়ায় একটি পক্ষের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা; সে পক্ষটি হলো রিকনসিলিয়েশনের উদ্যোগ যে দল নেবে।

যে বা যাঁরাই খুশি বা বেজার হোন না কেন, আমি আবার বলব যে রিকনসিলিয়েশন ছাড়া আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ এগোতে পারবে না। শুধু তা-ই নয়, কেবল ১৫ বা ১৬ বছরের অপরাধের হিসাবনিকাশ করেও রিকনসিলিয়েশনের পথে সমাধান মিলবে না। কারণ, আমাদের বিভাজনের শিকড় আরও অনেক গভীরে, অনেক পেছনে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিই যে আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, তার বহিঃপ্রকাশ তো বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেও ঘটেছে ব্যাপকভাবে। একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে সেই অধিবেশনে, সামনেও আরও হবে। এ ছাড়া ১৫ আগস্ট শোক দিবস নাকি জন্মদিবস পালন করা হবে, সেই বিতর্কও তো কম বিভাজন সৃষ্টিকারক নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ হত্যা করা হয়েছিল এই রাষ্ট্রের স্থপতিকেই। একই বছরে নভেম্বর মাসের ৩ তারিখে জাতীয় চার নেতা এবং ৭ নভেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ও এ টি এম হায়দারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়েও পক্ষ-বিপক্ষ আছে। এ দেশে ৭ নভেম্বর কারও কাছে ‘মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস’, কারও কাছে ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’, আবার কারও কাছে ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। এমন বিতর্ক আরও অনেক কিছু ঘিরেই আছে।

একটি বাস্তবধর্মী রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন ছাড়া রাজনৈতিক বিতর্ক নিরসন তো দূরের কথা, সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশ গড়াও সম্ভব হবে না। জঙ্গিবাদের ঝুঁকি থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে মুক্ত রাখতে চাইলে রাজনৈতিক পুনর্মিলন ছাড়াও শিক্ষানীতি ঢেলে সাজানোসহ আরও অনেক কিছু করতে হবে। রাজনৈতিক বিভাজন জিইয়ে রেখে সেসব কাজ করা কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক