সকালে ঘুম ভাঙার পর, বিকেলে সব কাজের শেষে অথবা সারা দিনে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ধোঁয়া ওঠা চায়ের চুমুক আমাদের চাঙা করে তুললেও এই চায়ের কাপে কত মানুষের শ্রম-ঘাম-রক্ত মিশে থাকে, তা হয়তো কখনোই আমাদের চিন্তায় আসে না। চা-বাগানে ঘুরতে গিয়ে হয়তোবা আমরা ভাবি না যে এই বাগানের মাটি আর চাগাছের প্রতিটি কুঁড়ি, প্রতিটি পাতায় কতশত শ্রমিক আর তাঁদের স্বজনদের কান্না লুকিয়ে আছে। নাটকে বা চলচ্চিত্রে দেখানো হয়, শ্রমিকেরা পিঠে বাঁধা বিশাল ঝুড়িতে চা-পাতা তুলছেন, টিলা বা পাহাড়ের গায়ে সবুজ বাগান, সন্ধ্যায় আগুন জ্বালিয়ে বাগানিয়াদের গান আর নাচ—কতই না আকর্ষণীয় জীবন! চা-বাগানকে কেন্দ্র করে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। সারা দেশের মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। অথচ এই আনন্দ-হাসির মাঝে জমাট বেঁধে থাকা বেদনার কথা আড়ালেই থেকে যায়।
সম্প্রতি দেশের চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকদের মজুরি ৯ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন তাঁদের সর্বোচ্চ দৈনিক মজুরি ১৯৬.৮০ টাকা। এটি এ গ্রেডের বাগানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বি গ্রেডে মজুরি ১৯৫ টাকা এবং সি গ্রেডে ১৯৪ টাকা। কিন্তু শ্রমিকেরা এই টাকা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, তাঁরা এটি নেবেন না। দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করতে হবে এই দাবিতে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। মজুরি বৃদ্ধির পরও সেটি না নেওয়ার ঘোষণা দিলেন কেন চা-বাগানের শ্রমিকেরা?
১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরুর পর বর্তমানে বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি) অনুমোদিত চা-বাগানের সংখ্যা ১৭৩, এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০টি বাগান মৌলভীবাজারে; যে কারণে এই জেলা চায়ের রাজধানী নামে খ্যাত। হবিগঞ্জে রয়েছে ২৫টি বাগান, সিলেটে ২১, চট্টগ্রামে ২২, উত্তরের জেলা পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে যথাক্রমে ১০ ও ১, এবং পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে রয়েছে দুটি ও খাগড়াছড়িতে একটি বাগান। উত্তরবঙ্গে অনিবন্ধিত কয়েক হাজার ছোট ছোট চা-বাগান রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের যেসব বাগানে বার্ষিক চা-পাতা উৎপাদনের পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার কেজি, সেগুলোকে এ গ্রেডের বাগান ধরা হয়। চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি অঞ্চলের এ গ্রেড বাগান হলো সেগুলো, যেগুলোতে বার্ষিক উৎপাদন ১ লাখ ১৩ হাজার কেজি চা-পাতা। এখানে বলা দরকার, পঞ্চগড়-লালমনিরহাট অঞ্চলের চা-পাতাও যথেষ্ট উন্নতমানের। বিশ্বের মোট উৎপাদিত চায়ের ৩ শতাংশ হয় বাংলাদেশে। বিশ্বে চা উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান নবম।
ব্রিটিশ শাসনামলে চা-বাগানে অল্প মজুরিতে কাজ করার জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অন্তত ১১৬টি আদিবাসী জাতি ও নিম্ন গোত্রের হিন্দুদের নিয়ে আসা হয়। অতি অল্প মজুরিতে কাজ করতে গিয়ে মালিকদের কাছ থেকে এইসব শ্রমিক ঋণ নিতেন। কত বছর কাজ করবেন তা শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকের চুক্তি হতো, কিন্তু সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় ঋণ পরিশোধের শর্তে সেই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হতো। ঋণ পরিশোধ হতো না। শ্রমিকেরাও কাজ ছেড়ে যেতে পারতেন না। এভাবেই বছরের পর বছর চা-শ্রমিকেরা শ্রমদাসে পরিণত হতেন। এখন সেইসব শ্রমিকের বংশধররাই বংশ পরম্পরায় চা-বাগানে শ্রম দিয়ে চলেছেন। তাঁদের সন্তানেরাও ধরেই নিয়েছেন যে তাঁদের ভবিষ্যৎও
এই বাগানের মাঝেই নির্ধারিত। তাই তাঁদের মধ্যে শিক্ষার হার কম। স্কুলে যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও উচ্চশিক্ষার হার অতিমাত্রায় নগণ্য।
চা-শ্রমিকদের বসবাসের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া ঘর আছে, যা ২২০ বর্গফুটের। বাগানগুলোতে হাসপাতাল আছে। হাসপাতালে নাপা, অ্যামোডিস, অ্যান্টাসিড দেওয়া হলেও বড় রোগের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ ১৯৬২ সালের চা-শ্রমিক অধ্যাদেশে চা-বাগান শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা এবং শ্রমিক ও তাঁদের সন্তানদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিধান থাকলেও শ্রমিকের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য বিশেষায়িত কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। একটি কোটাব্যবস্থা সরকারি স্কুলের জন্য থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। শ্রমিকেরা শুধু মজুরি আর রেশন এবং উৎসব বোনাস বাদে গ্র্যাচুইটি, গ্রুপ বিমা, নিয়োগপত্র, কোম্পানির লভ্যাংশের শতকরা ৫ ভাগ—এসব কিছুই পান না। বোনাসের নিয়ম হলো, ৩২ কর্মদিবসের বেতনের ৬০ শতাংশ দুর্গাপূজায় আর বাকি ৪০ শতাংশ দোলযাত্রার সময় দেওয়া হয়। এ ছাড়া দুর্গাপূজা এবং পৌষসংক্রান্তির সময় চা-পাতাও দেওয়া হয়। তবে প্রভিডেন্ড ফান্ড রয়েছে।
যখনই চা-শ্রমিকেরা মজুরি বাড়ানোর দাবি করেন, তখনই সামনে আনা হয় তাঁদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার কথা—বোনাস, রেশন, বাসা ইত্যাদি। কিন্তু ভালোভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায়, রেশন দিয়ে কোনো পরিবারের আর্থিক অবস্থার স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব না। বাংলাদেশে এখন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ভিজিট এক হাজার টাকা। ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর সরকারি খরচই ৪০০ টাকা। এক খিলি পানের দাম ১০ টাকা। যে চা-পাতা উৎপাদনে এইসব শ্রমিক ঘাম ঝরাচ্ছেন, সেই চায়ের দাম প্রতি কাপ কোথাও আর পাঁচ টাকার নিচে নেই। তাহলে রেশন দিয়ে কীভাবে বাকি সমস্যার সমাধান সম্ভব? তা ছাড়া সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড যখন শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে, তখন একটি সর্বনিম্ন হার (মিনিমাম বেসিক স্যালারি) ঠিক করা হয়। সেটির অনুপাতে বাসাভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব বোনাস ইত্যাদি চূড়ান্ত করা হয়।
চা-বাগান বাংলাদেশের বড় একটি রপ্তানিমুখী শিল্প। তাহলে এই খাতের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের এই প্রক্রিয়া কার্যকর হবে না কেন? আমাদের পাশের দেশ ভারতের আসামের চা জগদ্বিখ্যাত। সেখানকার ব্রহ্মপুত্র ভ্যালির (অনেকগুলো বাগানের সমন্বয়ে একটি ভ্যালি) চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫৮ টাকা, বরাক উপত্যকায় ৩৩০ টাকা। কেরালায় সর্বোচ্চ ৫৪৩ টাকা, তামিলনাড়ুতে ৫২৪ টাকা, কর্নাটকে ৪৮৫ টাকা। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কায় চা-শ্রমিকেরা দৈনিক মজুরি পান বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৫০০ টাকা। অথচ বাংলাদেশে সর্বোচ্চ মজুরি ১৯৬ টাকা ৮০ পয়সা হিসেবে মাসিক মজুরি ৫ হাজার ৯০৪ টাকা। এটি পাওয়া যায় কমপক্ষে ২৩ কেজি চা-পাতা তুলতে পারলে।
ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরির হিসাব ছিল এ রকম: পুরুষের চার আনা, নারীদের তিন আনা আর শিশুদের দুই আনা। বাংলা বিভক্তির পর ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলায় একের পর এক ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন হতে থাকে। পাট, সার, কাগজ, রেশম, তুলা, সিমেন্ট, চিনিসহ বিভিন্ন শিল্প বিকাশ লাভ করে। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সরকার শ্রমনীতি ঘোষণা করে। সেই নীতিতে অবশ্য চা-শ্রমিকদের একটি মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল—এ গ্রেড বাগানের শ্রমিকেরা পাবেন ১২০ টাকা, বি গ্রেডে ১১০ টাকা এবং সি গ্রেডে ১০০ টাকা। মনে রাখা দরকার যে, এই কাঠামো ছিল মাসিক ভিত্তিতে। সে সময়ের বাজার বাস্তবতায় এই টাকার পরিমাণ যৌক্তিক ছিল।
১৯৫৫ সালের শ্রমনীতির এই ঘোষণার সঠিক বাস্তবায়ন যে হয়নি, তার প্রমাণ মেলে এখন। মাসিক মজুরি নেমে যায় দৈনিক মজুরিতে। বাজারদরের অনুপাতে সেই সময়ে নির্ধারিত মজুরি এসে দাঁড়ায় দৈনিক মজুরিতে। এই শ্রম খাতে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির কোনো বিধান নেই। সবাই একই টাকা পান। যিনি চাগাছ লাগান, যাঁরা আগাছা নিড়ানোর কাজ করেন, বাগান পরিষ্কার করে পানি দেন—সবার বেতন একই। চা-পাতা তোলার শ্রমিকদেরও একই বেতন। বাংলাদেশে সম্ভবত আর একটিও সেক্টর মিলবে না যেখানে এ রকম অভিন্ন বেতনকাঠামো রয়েছে। অথচ দৈনিকভিত্তিক না হয়ে মজুরিকাঠামো হওয়া উচিত ছিল মাসিক হারে। এখন কেউ বাগান থেকে বরাদ্দ দেওয়া বাসায় থাকলে তাঁর বাড়িভাড়া কেটে রাখা যেতেই পারে। বাগানের হাসপাতালে ওষুধ দেওয়া হলে চিকিৎসাভাতাও কর্তন করা যুক্তিযুক্ত। তবে এসব হাসপাতালে সার্বক্ষণিক সার্জন, অপারেশন থিয়েটার, ডেলিভারির ব্যবস্থা, শিশু বিভাগ এবং জরুরি বিভাগ থাকতে হবে। পাশাপাশি দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকার দাবিটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন