হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মূল্যস্ফীতি: জীবনে অস্বস্তি, বাজার ব্যর্থতা, নীতির দ্বিধা

মূল্যস্ফীতির দায় কোনো একক সরকার বা প্রতিষ্ঠানের নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। আর দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক ঋণ সংস্কৃতি, বাজার তদারকির ঘাটতি এবং নীতি ধারাবাহিকতার অভাব।

এম এম মুসা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে তা ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। সংখ্যাটি দেখলে মনে হতে পারে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বাস্তবতা তা বলে না। গত ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম গতিতে। প্রতি মাসে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি নেমেছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে, কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। একদিকে সামান্য স্বস্তি, অন্যদিকে নতুন চাপ। এই টানাপোড়েনই বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি সমস্যার প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। এটি সাময়িক বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত অসুখ।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো। যাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসস্থান ও পরিবহনে ব্যয় হয়। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে হচ্ছে এবং ঋণনির্ভরতা বাড়াচ্ছে। মূল্যস্ফীতি তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি নীরব দারিদ্র্য-উৎপাদনকারী প্রক্রিয়া।

কাঠামোগত কারণ চারটি

তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়ছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছিল। তখন মূল্যস্ফীতি ৯-১০ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। কিন্তু চার বছর পর বৈশ্বিক পণ্যমূল্য অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসার পরেও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। এর পেছনে অন্তত চারটি কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করা যায়।

প্রথম কারণ টাকার অবমূল্যায়ন ও বিনিময় হারের অস্থিরতা। আইএমএফের শর্ত মেনে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালু করেছিল, যাতে ধাপে ধাপে পূর্ণ বাজারভিত্তিক বিনিময় হারে উত্তরণ ঘটে। কিন্তু বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা নেই। কখনো হস্তক্ষেপ, কখনো ছাড়, এই দোদুল্যমানতা আমদানি ব্যয় অননুমেয় করে তুলেছে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে টাকার প্রতিটি পতন সরাসরি ভোক্তামূল্যে যুক্ত হয়, বিশেষ করে জ্বালানি, ভোজ্যতেল ও শিল্প কাঁচামালে।

দ্বিতীয় কারণ বাজারকাঠামোর প্রতিযোগিতাহীনতা। বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজার হাতে গোনা কয়েকটি করপোরেট গোষ্ঠী ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের নিয়ন্ত্রণে। ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, আলুর মতো পণ্যে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে অতিরিক্ত মুনাফা যুক্ত হয়। প্রতিযোগিতা কমিশন কার্যত নিষ্ক্রিয়। কারণ, তাদের তদন্তক্ষমতা ও জনবল উভয়ই অপ্রতুল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার প্রতিফলন দেশের বাজারে পড়ে ধীরে, আর বাড়লে প্রতিফলন পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে। অর্থনীতিবিদেরা যাকে বলেন ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য সঞ্চালন’।

তৃতীয় কারণ রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। সরকারি ভর্তুকি ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাজেট ঘাটতিকে চাপে রাখে। ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা মুদ্রা সরবরাহ বাড়ায়। মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি আর প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্যহীনতাই মূল্যস্ফীতির অন্যতম মৌলিক কারণ, যা নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।

চতুর্থ কারণ রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের নিম্নতা। অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখন প্রায় ৮ শতাংশ, কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। কর না বাড়িয়ে ব্যয় নির্বাহের প্রতিটি চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ঋণ বা মুদ্রা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থায়িত হয়, যা মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী করে।

দায়ের ভাগাভাগি

দায় কার? এই প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক নয়। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, রাজনৈতিকভাবে ঋণ বিতরণ এবং তথ্য গোপনের সংস্কৃতি মূল্যস্ফীতির বীজ বপন করেছিল। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার মুদ্রানীতি কঠোর করে কিছুটা স্থিতিশীলতা এনেছিল—নীতি সুদহার ১০ শতাংশে তুলে দীর্ঘদিন ধরে রাখা তারই প্রমাণ। ২০২৬ সালের ৩০ জুন ঘোষিত অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতেও এই কঠোর অবস্থান বহাল রাখা হয়েছিল।

কিন্তু নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একধরনের শিথিলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়েছে। যুক্তি দেখানো হয়েছে প্রবৃদ্ধি ও বেসরকারি ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু মূল্যস্ফীতি তখনো ৮ শতাংশের ওপরে, যা আইএমএফের সন্তোষজনক মাত্রার অনেক দূরে। আইএমএফ স্পষ্টভাবে শর্ত দিয়েছে, মূল্যস্ফীতি সন্তোষজনক পর্যায়ে না নামা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখতে হবে এবং সুদহার শিথিল করা যাবে না। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, সরকার এই মৌলিক শর্তগুলো থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে।

আইএমএফকে দেওয়া চিঠিতে অর্থমন্ত্রী লিখেছেন, পুরোনো কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা এখন আর নেই। তাই সংস্কার বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে, দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। কথাটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক শোনায়। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে তা ঝুঁকিপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের আগেই সুদহার শিথিল করা

মানে মানুষের প্রত্যাশিত মূল্যস্ফীতি (ইনফ্লেশন এক্সপেক্টেশন) স্থায়ী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করা। একবার এই প্রত্যাশা বাজারে বদ্ধমূল হয়ে গেলে, তা নামিয়ে আনতে আরও কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী নীতি প্রয়োজন হয়, যেমনটা ঘটেছিল পাকিস্তানে।

প্রতিবেশীদের অভিজ্ঞতা

এখানেই প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা শিক্ষণীয়। ভারত ২০১৬ সাল থেকে নমনীয় মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রাকাঠামো (ফ্লেক্সিবল ইনফ্লেশন টার্গেটিং) অনুসরণ করছে—৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা, ২ থেকে ৬ শতাংশের সহনশীল ব্যান্ড। ২০২৬ সালে এই কাঠামো আরও পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতজনিত জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভারতের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশে উঠলেও তা এখনো লক্ষ্যমাত্রার সহনশীল সীমার মধ্যে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নীতিগত ধারাবাহিকতা বাজারের প্রত্যাশা স্থিতিশীল রেখেছে।

পাকিস্তান একসময় ৩৬ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হয়েছিল। স্থিতিশীল বিনিময় হার এবং ধারাবাহিক কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করে দেশটি তা একক অঙ্কে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালের সংকটের পর আইএমএফ কর্মসূচি মেনে মূল্যস্ফীতি দ্রুত নামিয়ে এনেছিল, এমনকি সাময়িকভাবে ঋণাত্মক পর্যায়েও গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তা আবার বেড়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশে উঠেছে। এই ওঠানামা প্রমাণ করে একবার সাফল্য এলেই স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি-শৃঙ্খলা। এই তিন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে একটি মিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল দেশগুলো স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপের কাছে সুদহার নীতি বদলায়নি।

করণীয় পাঁচটি ক্ষেত্রে

প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংককে আইনিকাঠামোর মাধ্যমে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে, যাতে রাজনৈতিক চাপে সুদহার নীতি ঘন ঘন পরিবর্তন করতে না হয়। ভারতের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সংশোধিত একটি মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কাঠামো প্রণয়ন করা যেতে পারে, যেখানে গভর্নরের সিদ্ধান্ত সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে সংখ্যাভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রার মাধ্যমে, প্রতিদিনের রাজনৈতিক নির্দেশনার মাধ্যমে নয়।

দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতা কমিশনকে প্রকৃত তদন্ত ক্ষমতা, স্বাধীন বাজেট ও পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে সক্রিয় করতে হবে। নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে সিন্ডিকেট ভাঙতে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও প্রতিটি স্তরে মূল্য প্রকাশের আইনি বাধ্যবাধকতা আনা দরকার।

তৃতীয়ত, বিনিময় হার নীতিতে ধারাবাহিকতা জরুরি। ক্রলিং পেগ থেকে সরে আসা বা তাতে বারবার বিচ্ছিন্ন হস্তক্ষেপ আমদানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে। একটি স্বচ্ছ, পূর্বনির্ধারিত ও প্রকাশিত সমন্বয় সূত্র অনুসরণ করাই উত্তম, যাতে বাজার আগে থেকেই প্রবণতা অনুমান করতে পারে।

চতুর্থত, ভর্তুকি ব্যবস্থাকে সর্বজনীন থেকে লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুতে ঢালাও ভর্তুকির বদলে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা অধিকতর কার্যকর এবং কম মুদ্রাস্ফীতিমুখী। কারণ, তা সামগ্রিক চাহিদা না বাড়িয়ে লক্ষ্য জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করে।

পঞ্চমত, রাজস্ব ঘাটতি অর্থায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে এবং সমান্তরালভাবে কর প্রশাসন ডিজিটালাইজেশন ও করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি বিবিএসের উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রকাশ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও আরও স্বচ্ছ করা দরকার, কারণ নীতিনির্ধারণের ভিত্তিই হলো নির্ভরযোগ্য উপাত্ত।

শেষ কথা

মূল্যস্ফীতির দায় কোনো একক সরকার বা প্রতিষ্ঠানের নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। আর দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক ঋণ সংস্কৃতি, বাজার তদারকির ঘাটতি এবং নীতি ধারাবাহিকতার অভাব। তবে বর্তমান সরকারের একটি নির্দিষ্ট দায় আছে—অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার লোভে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বিসর্জন না দেওয়ার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হতে সময় লাগে, কিন্তু হারাতে সময় লাগে না। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এই সহজ সত্যটি মনে রাখা জরুরি। কারণ, প্রতিটি দোদুল্যমান সিদ্ধান্তের মূল্য শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করে সেই মানুষেরা, যাদের আয় মূল্যস্ফীতির চেয়ে ধীরে বাড়ে।

এম এম মুসা ,উন্নয়নকর্মী ও গবেষক