হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পর্যটন মহাপরিকল্পনা ২০২৬

এবার কি পর্যটন অর্থনীতির পথে হাঁটবে বাংলাদেশ

সালেক উদ্দিন

পর্যটনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সহজ যোগাযোগব্যবস্থা এবং শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। ছবি: আজকের পত্রিকা

২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হবে বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬। দিবসটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ আবারও পর্যটন খাত নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখছে। জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটনকেন্দ্র চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রণয়ন করা হচ্ছে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০২৬, প্রস্তুত করা হচ্ছে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট এবং গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক পর্যটনকে।

উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—বাংলাদেশ কি আরেকটি পরিকল্পনা তৈরি করছে, নাকি অবশেষে পর্যটনকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তরের পথে হাঁটতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের ইতিহাস নতুন নয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে নীতিমালা প্রণয়ন, পর্যটন বোর্ড প্রতিষ্ঠা, বিশেষ পর্যটন অঞ্চল ঘোষণা এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে খাতটি এগিয়ে গেছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, সাজেক, বান্দরবান, কুয়াকাটা ও সেন্ট মার্টিন আজ দেশের পরিচিত পর্যটন গন্তব্য। অভ্যন্তরীণ পর্যটনেরও উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেছে।

তবুও প্রশ্ন রয়ে গেছে—এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন পর্যটন এখনো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারেনি?

বাস্তবতা হলো, আমাদের প্রধান সংকট কখনোই পরিকল্পনার অভাব ছিল না; সংকট ছিল বাস্তবায়নে। বর্তমানে আলোচিত ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটনকেন্দ্রের ধারণাটিও নতুন নয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইপিই গ্লোবাল ২০১৯ সালে যে দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল, সেখানে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্থানের মূল্যায়ন, ৫১টি পর্যটন ক্লাস্টার, ১৪টি থিম, দুই শর বেশি প্রকল্প এবং এক বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ২০৪১ সালের মধ্যে বিদেশি পর্যটক বৃদ্ধি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পর্যটনকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাতে উন্নীত করা। কিন্তু ছয় বছর পরও সেই মহাপরিকল্পনা কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং সমন্বয়ের অভাবে পরিকল্পনার বড় অংশ কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো পরিকল্পনা কেবল পর্যটনকেন্দ্রের সংখ্যা বা প্রকল্পের আকারের কারণে সফল হয় না। সফলতা নির্ভর করে বাস্তবায়ন কাঠামো, নেতৃত্ব, জবাবদিহি এবং সমন্বয়ের ওপর।

বর্তমানে পর্যটন খাতের সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পর্যটন করপোরেশন, ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ বহু সংস্থা জড়িত। কিন্তু পুরো মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, তদারকি ও মূল্যায়নের জন্য একক কোনো কর্তৃত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলেও জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ফলাফল তৈরি হয় না।

তবে পর্যটন অর্থনীতির পথে এগোতে হলে শুধু প্রতিষ্ঠানগত সংস্কারই যথেষ্ট নয়। পর্যটনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো—সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।

বিশ্বের সফল পর্যটন গন্তব্যগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে পর্যটক সহজে, দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। বিমানবন্দর, মহাসড়ক, রেলপথ, নৌপথ, গণপরিবহন, ডিজিটাল তথ্যসেবা এবং পর্যটন নির্দেশনা একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশেও কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, পার্বত্য অঞ্চল কিংবা উপকূলীয় পর্যটন এলাকাগুলোকে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করতে হবে। রাজধানী থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ না হলে পর্যটন অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

একইভাবে নিরাপত্তা এখন পর্যটনশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি। একজন পর্যটক তখনই ভ্রমণ করেন, যখন তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করেন। সড়ক নিরাপত্তা, পর্যটন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা, জরুরি চিকিৎসাসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নারী ও বিদেশি পর্যটকের নিরাপত্তা এবং প্রতারণামুক্ত সেবা নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পর্যটন পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে একজন পর্যটক দেশের যেকোনো প্রান্তে ভ্রমণের সময় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি পান।

এখানেই পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়ন এবং পর্যটন অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়। একটি নতুন রিসোর্ট নির্মাণ বা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা নিজে নিজে পর্যটন অর্থনীতি সৃষ্টি করে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলো, কত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলো, স্থানীয় জনগণের আয় কত বাড়ল এবং কত বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশকে ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে বেছে নিল—এসব।

এই কারণেই আমি আমার গ্রন্থ ‘পর্যটন অর্থনীতি: বদলে যেতে পারে বাংলাদেশ’ এবং বিভিন্ন কলামে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু নতুন প্রকল্প নয়; একটি নতুন পর্যটন শাসনব্যবস্থা।

প্রথমত, একটি স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যান অথরিটি’ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন, সমন্বয়, বিনিয়োগ সহায়তা, অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।

দ্বিতীয়ত, একটি স্বতন্ত্র পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পর্যটন কেবল পরিবহন খাত নয়; এটি অর্থনীতি, সংস্কৃতি, পরিবেশ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের সমন্বিত ক্ষেত্র।

তৃতীয়ত, বিওএসটি (বাংলাদেশ অর্গানাইজেশন ফর সাসটেইনেবল ট্যুরিজম) নামে একটি গবেষণা ও নীতিসহায়ক প্রতিষ্ঠান গঠন করা দরকার, যা পর্যটন গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যায়ন এবং নীতিগত সুপারিশ প্রদান করবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬-এ বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন তাই একটাই—আমরা কি শুধু ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটনকেন্দ্রের তালিকা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি ১ হাজার ৪৯৮টি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তব সম্পদে রূপান্তর করতে চাইব?

পূর্ববর্তী মহাপরিকল্পনা আমাদের শিখিয়েছে যে লক্ষ্য, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরামর্শক থাকলেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ পর্যটন পরিবেশ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো না থাকলে পরিকল্পনা ফাইলের ভেতরেই আটকে থাকে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। যদি ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটনকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, উন্নত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং শতভাগ নিরাপদ পর্যটন পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, তাহলে আগামী দুই দশকে পর্যটন দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় আমরা আরও কিছু প্রকল্পের উদ্বোধন দেখব, আরও কিছু পরিকল্পনা লিখব; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠবে না।

অতএব, আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ নয়; একটি কার্যকর, নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা। সময় এসেছে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে, অবকাঠামো থেকে অর্থনীতিতে এবং সম্ভাবনা থেকে ফলাফলের পথে যাত্রা শুরু করার।