সম্প্রতি বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেট উপস্থাপনা-পরবর্তী সময়ে আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে, বাজেটের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন কোথা থেকে হবে; ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগ কতখানি; কিংবা বাজেটে প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের অন্তরায়গুলো কীভাবে উতরানো যাবে?
এরই মধ্যে অবশ্য বর্তমান সরকারের কার্যভার গ্রহণের পর ১০০ দিনের বেশি কেটে গেছে। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে সরকার যেমন নানান রকমের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে, তেমনি দেশজ নানান অর্থনৈতিক সমস্যাও সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের আগামী পথযাত্রায় করণীয় কী?
বাজেট-পরবর্তী বিষয়াবলিতে সরকারকে তিনটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমটি হচ্ছে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার। সে ক্ষেত্রে একদিকে যেমন কর ও জাতীয় আয়ের অনুপাত বাড়াতে হবে, তেমনি কর-জাল কিংবা করের ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে পরোক্ষ করের ওপরেই বেশি নির্ভরশীল। এর ফলে একদিকে যেমন করভার সাধারণ মানুষের ওপর বেশি পড়ে, তেমনি সরকারি রাজস্বও বৈশ্বিক সংকটের ঝুঁকিতে পড়ে। এর পরিবর্তন করে প্রত্যক্ষ করের ওপর বাংলাদেশ অর্থনীতিকে বেশি নির্ভর করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন হবে কর আহরণের দক্ষতা বৃদ্ধি। সেই প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বিভাজিত করে এক অংশে করনীতি এবং অন্য অংশে কর আহরণের প্রায়োগিক দিকটি ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেই সংস্কার এখনো করা হয়নি।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সরকারি ব্যয় কাঠামো এবং ব্যয়-প্রক্রিয়ার সংস্কার। যেহেতু বর্তমান অর্থবছরে সরকারি ব্যয় অর্থায়নের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, তাই ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এবং সেই সঙ্গে প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কোন কোন উদ্যোগ প্রাধান্য কিংবা অগ্রাধিকার পাবে। যেসব উদ্যোগ একান্তভাবে প্রয়োজনীয় কিংবা যেগুলো সরাসরিভাবে উৎপাদনশীল প্রক্রিয়ায় অবদান রাখবে, সেগুলো প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। বিশাল ও মর্যাদামূলক প্রকল্পগুলোকে আপাতত পেছনে রেখে দিতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে অর্থনৈতিক বাস্তবতাই সরকারের আগামী উদ্যোগগুলোর নির্ণায়ক হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, বাজেটে প্রস্তাবিত বিষয়াবলি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ারও সংস্কার প্রয়োজন। প্রথাগতভাবে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে নানান সরকারি উদ্যোগ ও প্রকল্প বিভিন্ন অন্তরায়ের সম্মুখীন—তার কিছু আইনগত জটিলতা, কিছু অতিমাত্রায় নিয়মতান্ত্রিকতার কারণে, কিছু অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক ধাপের কারণে। এর ফলে একদিকে যেমন কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রলম্বিত ও বিলম্বিত হয়, অন্যদিকে এগুলো নানান দুর্নীতিরও জন্ম দেয়। এর প্রতিটি অংশে সংস্কার সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
বাজেট-পরবর্তী সময়ে সরকারকে তিন ধরনের অন্তরায়ের দিকে মনোযোগ দিতে হবে—চলমান সমস্যা, গভীরায়িত সমস্যা এবং আবির্ভূমান সমস্যা। বাংলাদেশের চলমান সমস্যার মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা, অর্থনৈতিক ধীরগতি, কর্মহীনতা, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততা ইত্যাদি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের আপাতন বেড়ে গেছে এবং বর্তমানে দেশে ৩ কোটি ৬০ লাখ লোক চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। বাংলাদেশে অর্থনীতির বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার ৩ শতাংশের কিছু বেশি। কৃষি এবং শিল্প খাতেও শ্লথতা আছে। সরকারি হিসাব মতে, দেশে ৩০ লাখের মতো লোক কর্মহীন। মূল্যস্ফীতির হার বেশ কিছুদিন ধরে উঁচু এবং তা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান সময়ে দেশজ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের শ্লথতা লক্ষণীয়।
আগামী দিনগুলোতে সরকারকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দরিদ্র-অভিমুখী প্রবৃদ্ধি কৌশলের দিকে নজর দিতে হবে। এর কেন্দ্রে থাকবে কর্মনিয়োজনভিত্তিক প্রবৃদ্ধি। এর জন্য গুরুত্ব দিতে হবে কৃষি খাতকে। মানবসম্পদের উন্নয়ন উচ্চতর প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উচ্চতর বিনিয়োগ এবং মানব উন্নয়নমুখী নীতিমালা। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার জন্য একদিকে যেমন দরকার হবে বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, অন্যদিকে প্রয়োজন হবে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যসামগ্রীর কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু প্রণোদনামূলক অর্থনৈতিক নীতিমালাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে সংস্কার প্রয়োজন বিনিয়োগের পরিবেশে; যার মধ্যে কাঠামোগত দিক তো আছেই, আর আছে রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
গভীরায়িত সমস্যার মধ্যে রয়েছে অসমতা ও বৈষম্য, আর্থিক খাতের সংকট, বৈদেশিক ঋণ ও ভর্তুকির ভার, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং পরিবেশদূষণ। আজকের বাংলাদেশে অসমতা একটি গভীর সমস্যা; যেখানে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠী দেশের তিন-পঞ্চমাংশ সম্পদের মালিক এবং দেশের উচ্চতম ১ শতাংশ জনগোষ্ঠী দেশের এক-চতুর্থাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি ডলার। গত অর্থবছরে সরকার নানান খাতে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বিষাক্ত পর্যায়ে চলে গেছে, যেখানে শুধু যে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা-ই নয়; তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস নারীর অস্তিত্বকেই বিঘ্নিত হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবেশ এবং পরিবেশদূষণ শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, তা উন্নয়নের সমস্যাও বটে।
অসমতা এবং বৈষম্য দূরীকরণের জন্য অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণের কোনো বিকল্প নেই। কারণ, বৈষম্য শুধু ফলাফলেরই নয়, বৈষম্য রয়েছে সুযোগেও। সেই জন্য অর্থনীতির কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, সেখানে সম্পদে এবং সুযোগে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক খাতে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, একটি দৃশ্যমান জবাবদিহিমূলক দায়বদ্ধ কাঠামোর প্রতিষ্ঠা জরুরি। খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ঋণের পুনর্বিন্যাসসহ নানান সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা, ঋণ পরিশোধ কাঠামোর পুনর্বিন্যাসসহ, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের সুযোগ খুঁজে দেখা যেতে পারে।
ভর্তুকির ক্ষেত্রে নানান খাতে এর যৌক্তিকীকরণ বিবেচিত ও মূল্যায়িত হওয়া দরকার। তারপর পালাক্রমে ভর্তুকি কমার একটি পথরেখা তৈরি করা দরকার। এর মাঝেই নানান ক্ষেত্রে দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, যাতে ভর্তুকির প্রয়োজন কমে আসে। নারী-পুরুষের সমতা এবং নারীর সব রকমের ক্ষমতায়নের জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকা অনন্য। এ লক্ষ্যে সরকারের অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন সরকারের নীতিমালার, আইনের প্রয়োগ এবং পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তার অংশীদারত্ব। কোনো অবস্থাতেই নারীর প্রতি সহিংসতাকে ছাড় দেওয়া যাবে না। অর্থনীতি ও পরিবেশের সমন্বয়ে একটি বজায়ক্ষম উন্নয়ন কৌশল সরকারের অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকারের দাবি রাখে। সে ক্ষেত্রে যেসব কার্যকর পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি।
আবির্ভূমান সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট যুদ্ধ ও সংঘাত, বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট এবং ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের’ বিস্তার। যেহেতু বাংলাদেশ বৈশ্বিক কাঠামোর অংশ, তাই ইউক্রেন যুদ্ধ, কোভিড অতিমারি এবং সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যপ্রাচ্য সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি, আমদানি-রপ্তানির প্রবণতা, বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ এবং তাঁদের আয়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের ওপর নেতিবাচক অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। সেই সঙ্গে ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের’ কারণে পরাশক্তিগুলো উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ যেহেতু অন্তর্মুখী অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণ করছে, ফলে বাংলাদেশের জন্য অনুদান, ঋণ এবং বাণিজ্য-সুবিধার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। বহুপাক্ষিকতার পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই উন্নত দেশগুলো গ্রহণ করছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়ন-উন্মুখ দেশগুলোর সঙ্গে। ফলে এসব দেশ বহুপাক্ষিকতার নানান সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এসব বিষয় মোকাবিলা করতে হলে সরকারকে ভবিষ্যৎমুখী সক্রিয় ব্যবস্থা ও নীতিমালা সম্পর্কে ভাবতে হবে। যেমন জ্বালানির ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা, বিকল্প দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানি, বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতার কথা ভাবা যেতে পারে। তেমনিভাবে, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে নানান আঞ্চলিক মোর্চা গড়ার কথা ভাবতে পারে।
আবির্ভূমান বিষয়াবলির মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাতারে বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়টিও রয়েছে। বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়াকে ৩ বছর বিলম্বিত করার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে, যার সিদ্ধান্ত আগামী মাসে জানা যাবে। বাংলাদেশের আবেদন গৃহীত হলে আগামী তিন বছরের মধ্যে নানান বিষয়ে বাংলাদেশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে উত্তরণ বিষয়ে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে। এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, উন্নয়নশীল বিশ্বের কাতারে উন্নীত হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ নানান সুবিধা; যেমন অনুদান, স্বল্প সুদে ঋণ এবং কম শুল্কের সুবিধা হারাবে। সুতরাং উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের জন্যও প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের জন্য একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছে। ধাপে ধাপে তার কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার। সে ব্যাপারে বিলম্বিত উত্তরণের পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি সুনির্দিষ্ট পথরেখা তৈরি করা যেতে পারে।
শেষের কথা বলি। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ও দেশজ—উভয় কারণে নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হবে। সেগুলো জটিল, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য নয়। নিষ্ঠা, সদিচ্ছা, সততা এবং জোরালো নেতৃত্বের সঙ্গে সরকার সেগুলোর মুখোমুখি হলে যূথবদ্ধভাবে তার সমাধান করা সম্ভব।
লেখক: অর্থনীতিবিদ