হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নতুন রূপে পররাজ্য দখলের সনাতনি পর্ব

নির্বাচিত একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, শাসক হিসেবে তিনি যেমনই হোন না কেন, তাঁকে সস্ত্রীক অপহরণ করার পর হাতকড়া পরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বাসযোগ্যতাহীন মনগড়া অভিযোগে প্রমাণবিহীন বিচারের জন্য হাজির করার কড়া সমালোচনা হচ্ছে খোদ মার্কিন মুলুকেই।

আজাদুর রহমান চন্দন

বিশ্বে প্রমাণিত মজুত তেলসম্পদের দিক দিয়ে শীর্ষে আছে ভেনেজুয়েলা। ছবি: সংগৃহীত

কয়েক মাসের নিপুণ পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্কিন সামরিক বাহিনী ২ জানুয়ারি রাতের আঁধারে হামলা চালায় ভেনেজুয়েলায়। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এর কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে এবং তাঁদের দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই পদক্ষেপ আকস্মিক মনে হলেও সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জটিল এই অভিযানের পরিকল্পনা চলছিল কয়েক মাস ধরেই। ছিল অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ মহড়াও। সেনাবাহিনীর ডেলটা ফোর্সসহ মার্কিন এলিট সেনারা মাদুরোর ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ বাসস্থলের একটি হুবহু প্রতিকৃতি তৈরি করেছিলেন। অত্যন্ত সুরক্ষিত সেই বাসভবনে তাঁরা কীভাবে প্রবেশ করবেন, তার অনুশীলনও চালিয়েছিলেন সেনারা। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) একটি ছোট দল গত আগস্ট মাস থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে ট্রাম্প ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামের ওই আগ্রাসনের চূড়ান্ত সবুজসংকেত দেন।

যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের বানোয়াট অভিযোগে কয়েক মাস আগেই ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিশাল সামরিক শক্তির সমাবেশ ঘটায় পেন্টাগন। যুক্তরাষ্ট্র গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলার উপকূলে বড় আকারের নৌবহর মোতায়েন করার পাশাপাশি ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে মাদক পাচারের অভিযোগে বিভিন্ন নৌযানে বিমান হামলা চালায়। ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজও জব্দ করা হয়। ওই অঞ্চলে একটি বিমানবাহী রণতরি ছাড়াও সাতটি যুদ্ধজাহাজ এবং অসংখ্য এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে ১৫ হাজারের বেশি সেনাকে জড়ো করা হয় ওই অঞ্চলে। এই পদক্ষেপকে মার্কিন কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছিলেন। ওই সেনাদের ছোট নৌযানের ওপর অবৈধ হামলা চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছিল। ট্রাম্পের দাবি, ওই সব নৌযান মাদক বহন করছিল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিভিন্ন সরকার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের নেতাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে সামরিক আগ্রাসনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযান হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে সেই দাবি বিশেষভাবে হাস্যকর। কারণ, ভেনেজুয়েলা ফেন্টানিল বা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ওভারডোজ সংকটের জন্য দায়ী অন্য মাদকের বড় উৎপাদক দেশ নয়। আর দেশটি যে কোকেন উৎপাদন করে, তার বড় অংশই যায় ইউরোপে। এ ছাড়া ট্রাম্প যখন ভেনেজুয়েলার নৌযানে হামলা চালাচ্ছিলেন, তখন তিনি হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ক্ষমা করে দেন, যিনি ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে মাদক কারবারের বিশাল চক্র পরিচালনা করেছিলেন।

সাধারণ বিচার-বুদ্ধিও বলে, মাদক পাচারের চেষ্টা যদি সত্যিই হয়ে থাকে, সেটা কোনো দেশের সরকার উৎখাত বা সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার অজুহাত হতে পারে না। মাদক পাচার প্রতিরোধ নয়; বরং ভিন্ন উদ্দেশ্যে যে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালানো হয়—তার আরও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ট্রাম্পের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে। সেখানে বলা হয়েছে, লাতিন আমেরিকায় আধিপত্য বিস্তারের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিনের অবহেলার পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও “মনরো নীতি” কার্যকর ও প্রয়োগ করবে, যাতে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।’ ‘ট্রাম্প করোলারি’ নাম দেওয়া এই নথির আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে মোতায়েন সেনা প্রত্যাহার করে এই অঞ্চলে আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বৈধতা, সুনির্দিষ্ট আইনি কর্তৃত্ব বা ঘরোয়া সমর্থন—কোনোটি ছাড়াই ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে ট্রাম্প চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিধর দেশগুলোর হাতে অজুহাত তুলে দিচ্ছেন, যাতে তারা নিজ প্রতিবেশীদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। বিশেষ অপশক্তি যেভাবে বারবার উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে এই অঞ্চলেও এমন কিছু ঘটা অসম্ভব নয়। এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার নজির টেনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জকে অপহরণের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ। দিমিত্রি মেদভেদেভ বর্তমানে রাশিয়ার সিকিউরিটি কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউক্রেনের পুতুল প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতীকী বন্দিদশার একটি ছবি তুলে ধরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, বিশ্বকে অচিরেই এমন একটি ছবি দেখতে হতে পারে। তেমনটি সত্যি হলে কী বলবে গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের তথাকথিত মোড়ল?

নির্বাচিত একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, শাসক হিসেবে তিনি যেমনই হোন না কেন, তাঁকে সস্ত্রীক অপহরণ করার পর হাতকড়া পরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বাসযোগ্যতাহীন মনগড়া অভিযোগে প্রমাণবিহীন বিচারের জন্য হাজির করার কড়া সমালোচনা হচ্ছে খোদ মার্কিন মুলুকেই। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘একনায়কতান্ত্রিক’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন। মার্কিন বাহিনীর ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানকে ‘তেলের জন্য রক্তপাত’ বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসম্যান জ্যাক অচিনক্লজ। তিনি ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট দলীয় সদস্য। কংগ্রেসম্যান জ্যাক সিএনএনকে বলেন, ‘তেলের জন্যই এ রক্তপাত। এর সঙ্গে মাদক পাচারের কোনো সম্পর্ক নেই। মাদকের বেশির ভাগই ইউরোপের দেশগুলোতে যায়। আর কোকেন সেই মাদক নয়, যেটি মার্কিনদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বরং সেটা ফেন্টানিল, যা চীন থেকে আসে।’ নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি একে ‘যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এডিটরিয়াল বোর্ড ৩ জানুয়ারি একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। তাতে ভেনেজুয়েলায় হামলার তীব্র সমালোচনা ও আইন লঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনকে জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন সমালোচকেরা। সনদে বলা আছে, কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হামলার হুমকি দিতে পারে না। ভেনেজুয়েলা কার্যত নতুন যুগে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রথম শিকার। এই আগ্রাসনের পর ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মনোভাব আরও বেড়ে গেছে। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করবে এবং দেশটির বিশাল জ্বালানি তেলসম্পদ ব্যবহার করবে। বিশ্বে প্রমাণিত মজুত তেলসম্পদের দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভেনেজুয়েলা। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৯ নম্বরে। ওপেকের ২০২৪ সালের হিসাবমতে, ভেনেজুয়েলার মজুত অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এই মজুতের পরিমাণ ৪ হাজার ৮০০ কোটি ব্যারেল।

এটি শুধু ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নয়, একই সঙ্গে সেসব দেশের জন্য হুঁশিয়ারিও বটে—যারা ট্রাম্প ডকট্রিনের কাছে মাথা নোয়াতে নারাজ। এটি এমন এক জঘন্য নজির সৃষ্টি করেছে, যা জন্ম দিয়েছে কিছু জরুরি প্রশ্নের—এরপর কোন দেশ, কোন রাষ্ট্রপ্রধান, কিংবা কোন রাজনৈতিক নেতা হবেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট? ট্রাম্প নিজেই অবশ্য তা জানিয়ে দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে হুমকি দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর সঙ্গে তিনি বলেন, কিউবার সরকারও শিগগিরই পতনের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক পদক্ষেপসহ সব ধরনের বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন ট্রাম্প।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে কেন এত মরিয়া ট্রাম্প? বরফরাজ্য গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব কেবল তার আয়তনে নয়; বরং তার মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা গুপ্তধনে। এই দ্বীপে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুষ্প্রাপ্য খনিজ পদার্থের খনি। নিওডাইমিয়াম, প্রাসিওডাইমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মতো এসব খনিজ ছাড়া আধুনিক স্মার্টফোন, ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন কিংবা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে এই বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। ট্রাম্পের লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ড কবজা করে খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের একাধিপত্য খর্ব করা।

এর আগে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে অপসারণ করে তাঁর প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল মিথ্যা অভিযোগেই। লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির নৃশংস হত্যা, সিরিয়ায় দখলদারি, ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর নির্বিচার গণহত্যা, গাজা দখলে নিয়ে উপনিবেশ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প মনোনীত ‘বড়লাট’-এর মাধ্যমে শাসন করা—এগুলো সবই সাম্রাজ্যবাদের পররাজ্য গ্রাস পর্বের নানা রকম চেহারা। ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন মূলত সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন দখলদারির এই পর্বের নতুন নজির।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

মোগলহাট ও লালমনিরহাট: উন্নয়ন বঞ্চনার এক বাস্তব দলিল

যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য না বুঝলে তাকে বোঝা যাবে না

যুক্তরাষ্ট্রে তুষারময় দিন ও বাংলাদেশের শীতকাল

এলপি গ্যাসের সংকট একটি সংকেতমাত্র

জামানতের কাঁটাতারে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা

তীব্র শীতে গরিবের হাহাকার

তরুণদের স্বপ্নের আসন থেকে কোন পথে এনসিপি

সংসদ নির্বাচনে ভোটারের দায়বদ্ধতা

মাদুরোকে নিয়ে যে বার্তা পেল বিশ্ব

ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা কার হাতে