একটি গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর তারা দেড় বছরের এলেবেলে শাসন চালিয়েছে। অনেক অনিশ্চয়তার পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছেন। এর মাধ্যমে দেশে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলা যায়। কারণ, তিনি দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক কারণে বিদেশে থাকতে বাধ্য হন। জীবনে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ এবং দল হিসেবে বিএনপি ১৯ বছর পর ক্ষমতাসীন হলো। এ কারণে এ নতুন পর্বে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের জন্য সময়টা এমন যে মাথার ওপর দলের দীর্ঘদিনের কান্ডারি ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী তাঁর মা খালেদা জিয়া নেই। তাই তিনিই এখন দলের এবং সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি। যদিও খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার কারণে তারেক রহমান কয়েক বছর ধরেই দলের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন, তারপরও প্রায় ১৭ বছর পর দেশে ফিরে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষস্থানে দায়িত্ব পালনের মধ্যে নিশ্চয়ই ভিন্নতা আছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত তিনি সব মহলের প্রশংসাই পাচ্ছেন। তবে এ কথাও ঠিক যে সব বিঘ্ন মোকাবিলা করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে সফলতা পেতে তাঁকে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশবাসী তারেক রহমানকে ভোটের মাধ্যমে যে রায় দিয়েছে, তাতে এ কথা বলাই যায়, দেশ পরিচালনায় দু-এক বছরের মধ্যে তাঁদেরকে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক বিঘ্ন মোকাবিলা করতে হবে না। তবে এই পর্বের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ইসলামি ধারার রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনে যে অভূতপূর্ব গণরায় পেয়েছে, তাতে সংসদের ভেতরে তো তারা সোচ্চার ভূমিকা পালন করবেই, চেষ্টা করবে সংসদের বাইরে রাজপথেও সোচ্চার হতে। এ জন্য তাদের কাছে জুতসই ইস্যু হিসেবে আছে জুলাই সনদকে সংবিধানে যুক্ত করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের বিষয়াদি, যার অনেক কিছুর সঙ্গে বিএনপির নীতিগত মতভিন্নতা রয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দেশের নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থাকে সামলানো। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের সময় উত্তরাধিকার সূত্রে বিএনপি সরকারের কাঁধে চেপেছে ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণের বোঝা। এর পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় রয়েছে বিপুল অঙ্কের বাজেট ঘাটতি। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করে গেছে। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫) সরকার মোট ২ লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে এবং এই সময়ে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা মাত্র। ফলে এ সময় বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা, যার বেশির ভাগই ঋণ নিয়ে মেটানো হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ব্যাংকিং খাত এখনো নড়বড়ে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই অর্থবছর শেষে বাংলাদেশকে দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ মেটাতে সব মিলিয়ে ৩০ বিলিয়ন (৩ হাজার কোটি) ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। আইএমএফের তথ্যমতে, (২০২৪-২৫ অর্থবছর) বাংলাদেশের ঘাড়ে মোট ঋণের বোঝা ছিল প্রায় ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। আমাদের দেশের মোট অর্থনীতির (জিডিপি) তুলনায় এই ঋণের হার এখন ৪১ শতাংশ। বৈশ্বিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়েছে, বাংলাদেশ যদি নিজস্ব আয় বা রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে না পারে, তবে দেশটিকে ঋণ নবায়নের তীব্র ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
এ অবস্থার পাশাপাশি বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করেছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বর্তমানের প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বছরে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন, যেখানে বর্তমানে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৪ শতাংশে। কাজেই ইশতেহার বাস্তবায়নের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগকে জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৩৫ শতাংশে নিতে হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে খুবই দুরূহ ব্যাপার।
নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দেওয়া; নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এরই মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আসন্ন ঈদের আগে পাইলট ভিত্তিতে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদেরও সম্মানী ভাতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। কৃষকদের ঋণ মওকুফ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। সরকারের এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য বেশ বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। শুরুতে পাইলট ভিত্তিতে এসব কর্মসূচি চালু হলেও সামনে এর পরিধি বাড়বে। তখন অর্থের পরিমাণও বাড়বে। কিন্তু এত ব্যয় মেটানোর কোনো স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা দৃশ্যমানতা আছে কি?
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা অতীতের ঋণনির্ভরতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জনবান্ধব বাজেট করার কথা বলছেন। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজের নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রামে গিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, দেশে কোনো পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি আর চলবে না। বাজেট হবে জনবান্ধব। বিগত আমলে ঋণ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা কোনো ভালো প্রকল্পে ব্যয় হয়নি। ফলে এ সরকারের ওপর বিশাল ঋণের বোঝা রয়েছে।
তবে ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুযোগ বেশ সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, ঋণ না নিয়ে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। কিন্তু প্রতিবছর যে হারে রাজস্ব আয় বাড়ছে তার তুলনায় ব্যয় বাড়ার গতি আরও বেশি। রাজস্ব আয় আরও বাড়াতে গিয়ে যদি করের পরিমাণ বাড়াতে হয়, তাহলে সেটি আবার জনগণের ওপর চাপ বাড়াবে। ফলে সরকার একধরনের ফাঁদের মধ্যে পড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সীমিত সামর্থ্য, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ—এই তিনের ভারসাম্য রক্ষা করাই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে। অর্থসংস্থানে সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হবে।
এরপর দেশের যেকোনো সরকারের মতোই বর্তমান সরকারের জন্যও ভূরাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। চীন হলো আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী। বাংলাদেশে বর্তমানে চীনের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যার মধ্যে অবকাঠামো ও উৎপাদন খাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার এবং জ্বালানি খাতে বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। চীনের প্রভাব রোধ করার জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় তারা যে প্রভাব বিস্তার করবে, তা নিশ্চিত। আর ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার ওপর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক খাতের অনেক বিষয় জড়িত।
সব মিলিয়ে নতুন সরকার অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে কতটা সাফল্যের পরিচয় দেবে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের সামনের পথচলা।