হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জাপানে বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা

প্রবীর বিকাশ সরকার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ওকাকুরা তেনশিন

জাপানের সঙ্গে অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলের সম্পর্ক শত বর্ষের বেশি। ১৮৭৮ সালে জাপানের মিকাদো তথা মেইজি সম্রাট মুৎসুহিতো এবং কলকাতার পাথুরিয়া ঘাটার ঠাকুর পরিবারের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব সংগীতজ্ঞ, সংগীতের ইতিহাসবিদ রাজা শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের মধ্যে দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বিনিময়ের ঘটনাই জাপান-বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রকৃত সূচনা।

এই ঘটনার ২০ বছর পর ১৯০২ সালে ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতায় পদার্পণ করেন জাপানি মনীষী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কালজয়ী লেখক গবেষক শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন। তিনি স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বাঁধা পড়েন গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্কে। ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ওকাকুরা এবং সদ্য শান্তিনিকেতনে আশ্রমিক শিক্ষাগুরু হিসেবে আবির্ভূত রবীন্দ্রনাথের যৌথ আগ্রহ ও পৌরহিত্যে প্রত্যক্ষভাবে জাপান-বাংলা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ভাববিনিময়ের সূত্রপাত ঘটে।

রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যা আশ্রমের প্রথম বিদেশি ছাত্র ছিলেন এক তরুণ বৌদ্ধভিক্ষু হোরি শিতোকু, যিনি সে সময় ওকাকুরার ভারত ভ্রমণ সঙ্গী হয়েছিলেন। তিনি ১৯০২ সালের ১৩ জুন থেকে ১৯০৩ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা ও সংস্কৃত অভিধান ‘অমরকোষ’-এর মূল ও টীকা কপি করেন। ওকাকুরা এবং হোরি শিতোকু বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। এঁরাই কি প্রথম বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন? তাঁদের আগে কোন জাপানি নাগরিক বাংলা অঞ্চলে এসেছেন এখনো সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না।

বাংলা ভাষা প্রশিক্ষণে রবীন্দ্রকবিতা, ১৯৬০

এই ঘটনার পর ১৯০৩ সালে ওকাকুরা তাঁর দুজন প্রধান শিষ্য তরুণ চিত্রশিল্পী য়োকোয়ামা তাইকান ও হিশিদা শুনসোওকে কলকাতায় পাঠান। তখন ত্রিপুরা রাজ্যের সদ্য নির্মিত রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে দেয়ালচিত্র অঙ্কনের কাজে তাঁরা গিয়েছিলেন। তাঁরাও বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। ধারাবাহিকভাবে ১৯০৫ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের অনেক বিখ্যাত জাপানি নাগরিক কলকাতা, শান্তিনিকেতন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে গিয়েছেন নানা উপলক্ষে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চিত্রশিল্পীদের মধ্যে কাৎসুতা শোওকিন, আরাই কাম্পো, কিরিয়া ছেনরিন, নোওসু কোওসেৎসু ও হিগুচি তোমিতারোও, নৃত্যশিল্পী সঙ্গীতজ্ঞ ইরিয়ে শিজুয়ে ও মাসু গেনজিরোও, বৌদ্ধপণ্ডিত ভিক্ষু গবেষক কবি শিক্ষাবিদ কাওয়াগুচি একাই, কিমুরা নিক্কি, ড. তাকাকুসু জুনজিরোও, মাদাম ড. কোওরা তোমি, নোগুচি য়োনেজিরোও এবং ড. ৎসুশোও বিয়োওদোও, স্থপতি ইতোও চুউতা, জুডো/জুজুৎসু প্রশিক্ষক সানো জিননোসুকে ও শিনজোও তাকাগাকি, আলোকচিত্রী হাসেগাওয়া দেনজিরোও, ব্যবসায়ী তাকেদা উয়েমোন প্রমূখ।

টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের মুখপত্র সাচিয়া

উনবিংশ শতকের শেষদিক থেকে বিংশ শতকের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত জাপানের সঙ্গে ভারতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল। জাপানের বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শিপিং ও পরিবহন কোম্পানি ‘নিপ্পন য়ুসেন কাইশা’ ও ‘ওসাকা শোজেন কাইশা’; ট্রেডিং কোম্পানি ‘মিৎসুই’, ‘মিৎসুবিশি’, ‘সুমিতোমো’, ‘মিৎসুই বুস্সান’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ হুগলির খিদিরপুর বন্দরসংলগ্ন এলাকায় বহু জাপানি কর্মরত ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধপূর্ব সময় পর্যন্ত ১০ হাজার জাপানি নাগরিক পশ্চিমবঙ্গে ছিলেন বলে জানা যায়। সন্দেহ নেই যে তাদের অনেকেই বাংলা ভাষা শিখেছিলেন, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারও করেছেন। কিন্তু তাদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না।

জাপানিদের মধ্যে কে প্রথম বাংলা ভাষা শিখেছিলেন সঠিকভাবে জানা নেই। তবে ধারণা করা হয়, ১৯০৩ সালে কলকাতায় ভাগ্যবদলের আশায় গিয়েছিলেন তরুণ প্রযুক্তিবিদ তাকেদা উয়েমোন। কিন্তু সেখানে সুবিধা করতে না পেরে ঢাকায় আসেন তিনি এবং খিলগাঁওয়ের সাবান প্রস্তুতকারী ‘বুলবুল সোপ’ ফ্যাক্টরিতে প্রধান টেকনিশিয়ান নিযুক্ত হন। অল্পসময়ের মধ্যে তিনি ‘ইন্দো-জাপানিজ সোপ ফ্যাক্টরি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৭ সালে স্থানীয় এক ব্রাহ্ম পরিবার শশীভূষণ মল্লিকের জ্যেষ্ঠ কন্যা হরিপ্রভা মল্লিককে বিয়ে করেন তাকেদা উয়েমোন। কিছুদিন পর তাঁর অনুজ তাকেদা সোয়েমোন ঢাকায় আসেন এবং রানি নামের একজন নারীকে বিয়ে করেন।

বাংলা ভাষা পাঠচক্র, বাঁ থেকে চতুর্থ উপবিষ্ট ড. নারা ৎসুয়োশি

উয়েমোন-হরিপ্রভা দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। তবে সোয়েমোনের ছিল তিন কন্যা সিজু, হানা ও মিতু। ভারত ভাগের পর দুই ভাইয়ের পরিবারই কলকাতায় স্থায়ী হয়। কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রমাণ্যচিত্র নির্মাতা সুরজিৎ দাশগুপ্তের ভাষ্য থেকে জানা যায়, দুই ভাইই বাংলা শিখেছিলেন। প্রয়াত সুরজিৎ দাশগুপ্ত ছিলেন হরিপ্রভা মল্লিকের বোন চিকিৎসক অশ্রুবালার ছেলে।

এরপর ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে জুজুৎসু প্রশিক্ষক হিসেবে ওকাকুরা জুডো ক্রীড়াবিদ সানো জিননোসুকে শান্তিনিকেতনে পাঠান। তিনি সেখানে তিন বছর অবস্থান করেন। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে বাংলা ভাষা শেখেন তিনি। ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি বিষয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেন। ১৯২৪ সালে তিনি মূল বাংলা থেকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘গোরা’ জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন। এ ছাড়াও ভারত বিষয়ে আরও একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।

১৯০৭ সালে পালি ভাষা শিক্ষালাভের জন্য চট্টগ্রামে আসেন বৌদ্ধপণ্ডিত ও ভিক্ষু কিমুরা নিক্কি/কিমুরা রিউকান। তিনি একটি প্রাচীন মহাস্থবির মন্দিরে তিন বছর পালি ভাষা শেখেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি এবং উচ্চতর পালি ভাষা শিখে পালি বিভাগের অধ্যাপক হন। তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহচর্যে থেকে বাংলা ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৯১৬ সাল এবং ১৯৪৩ সালে তিনি জাপানে যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দোভাষীর কাজ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আর কোনো জাপানি নাগরিকের নাম জানা যায় না, যিনি বাংলা ভাষা জানতেন। তবে আগ্রহ ছিল হয়তো অনেকেরই। কারণ, ঊনবিংশ শতকে ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর চেয়ে বাঙালি জাতির উত্থান ও অগ্রগতি ছিল সমগ্র এশিয়ায় বৈপ্লবিক, ঈর্ষণীয়। সম্পূর্ণ না হলেও কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা, গবেষণা, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা সর্বোপরি সাংস্কৃতিক নবজাগরণ ঘটেছিল।

জাপানের শীর্ষ রবীন্দ্রগবেষক দেশিকোত্তম কাজুও আজুমা

১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এশিয়া মহাদেশে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান। এই ঘটনায় জাপান, চীন ও কোরিয়ায় কবির জনপ্রিয়তা পর্বতসমান উচ্চতায় পৌঁছায়। এই কৌতূহল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ১৯১৪ সালেই ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কবিতা জাপানি ভাষায় অনুবাদ শুরু হয়ে যায়। ১৯১৫ সালে প্রথম জাপানি ভাষায় ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ অনুবাদ করেন তরুণ সাহিত্যিক, সমালোচক মাশিনো সাবুরোও। অচিরেই রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যপ্রেমী জাপানিদের মধ্যে আগ্রহের শীর্ষে চলে আসেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের ইংরেজি রচনা থেকে অনুবাদের হিড়িক পড়ে যায়। কবির শিক্ষাভাবনা, শিশুশিক্ষা, ব্রহ্মাশ্রম, মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব, তাঁর দর্শন, স্বাধীনতা আন্দোলন, বিশ্বজনীন চিন্তা, শান্তিবাদ, আধ্যাত্মিকতা, প্রাচ্যাদর্শ, পল্লীউন্নয়ন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা ও গবেষণামূলক প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশ হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথকে আরও গভীরভাবে অনুধাবনের জন্য তাঁর মাতৃভাষা বাংলার প্রতি কেউ কেউ আকৃষ্ট হলেও শিক্ষালাভের সুযোগ ছিল না। তবে ১৯১৬ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত নোবেলজয়ী কবির পাঁচবার জাপান ভ্রমণে তাঁর প্রদত্ত বাংলা বক্তৃতা, স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি আবালবৃদ্ধবনিতা অনেককেই অভিভূত করেছিল। সেই অনুভূতির কথা তাঁর দোভাষী জাপান মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী ওয়াদা তোমিকো-পরবর্তীকালে বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ ও রবীন্দ্রগবেষক, নোবেলজয়ী সাহিত্যিক কাওয়াবাতা ইয়াসুনারি, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক, গবেষক এবং শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা শতবর্ষী ডা. হিনোহারা শিগেআকি প্রমুখের ভাষ্য থেকে জানা যায়। রবীন্দ্রভক্ত ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বৌদ্ধধর্ম গবেষক, অনুবাদক অধ্যাপক ড. ওয়াতানাবে শোওকোও বাংলা ভাষা জানতেন। বাংলা ভাষা যে শ্রুতিমধুর ভাষা সেটা গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন রবীন্দ্র সুহৃদ ওকাকুরা তেনশিন ১৯১২ সালেই। দ্বিতীয়বার কলকাতায় স্বল্প অবস্থানকালে তিনি রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়া সেই সময়কার অগ্রসর কবি, সাহিত্যিক ও সমাজসেবী প্রিয়ম্বদা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রেমে পড়েন। বেশ কিছু চিঠি চালাচালিও হয়েছিল দুজনের মধ্যে ইংরেজিতে। ওকাকুরা তাঁর লেখা চিঠিতে প্রিয়ম্বদার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, যাতে তাঁকে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫৫-৫৬ সাল থেকে পুনরায় কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে জাপানিরা যেতে শুরু করেন। ষাট ও সত্তর দশকে জাপানি তরুণদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ আবার আগ্রহের শীর্ষে উঠে আসেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের শততম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপন উপলক্ষে ১৯৬১ সালেই বিপুল পরিকল্পনা ও প্রকল্প গৃহীত হয়। অধ্যাপক ড. ওয়াতানাবে ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন। কবির জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আপোরোনশা প্রকাশনা সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত ৮ খণ্ডের নির্বাচিত রবীন্দ্র রচনাবলীতে এটা অন্তর্ভুক্ত হয়। উল্লেখ্য, বাংলা ভাষাপ্রেমী বহুভাষী পণ্ডিত অধ্যাপক কাজুও আজুমা এবং মাদাম কেইকো আজুমা উভয়েই ড. ওয়াতানাবের কাছে বাংলা শিখেছিলেন। অধ্যাপক আজুমা সস্ত্রীক ১৯৬৭ সালে শান্তিনিকেতনে যান বিশ্বভারতীর জাপানি বিভাগে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে। উভয়েই অনর্গল বাংলা বলতেন ও লিখতেন। দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং রবীন্দ্র রচনা অনুবাদ ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তর কাজ করেছেন এই দম্পতি। ওসাকা গাইগোকুগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বাংলা ভাষা ও হিন্দি ভাষায় পারদর্শী ড. মিজোকামি তোমিওও ছিলেন একজন স্বনামধন্য রবীন্দ্রভক্ত।

বাংলা ভাষা পাঠচক্রের মুখপত্র কল্যাণী

১৯৬০ সালে রবীন্দ্র জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে ‘তাগো-রু কিনেনকাই’ বা ‘টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন’ অন্যতম প্রকল্প হিসেবে বাংলা ভাষা প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে প্রকৃতরূপে অনুধাবন এবং তাঁর বাণী তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে। এর প্রধান শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক ড. ওয়াতানাবে শোওকোও। তাঁর সহযোগী ছিলেন জাপানপ্রবাসী ভারতীয় বাঙালি অশোক সরকার। টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক ‘সাচিয়া’ বা ‘সত্য’ নামক ২২টি ট্যাবলয়েড মুখপত্রে এ সম্পর্কে তথ্য বিদ্যমান।

১৯৬৬ সালে জাপানে গঠিত হয় ‘বাংলা ভাষা পাঠচক্র’ বাংলাভাষী বহুভাষাবিদ অধ্যাপক ড. নারা ৎসুয়োশি, জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক ও শিক্ষক ইসকান্দার আহমেদ চৌধুরী ও কলকাতার বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কল্যাণ দাশগুপ্তের উদ্যোগে। একঝাঁক তরুণ-তরুণী ছিল শিক্ষার্থী, যাঁরা পরবর্তীকালে বিশিষ্ট বাংলাভাষী লেখক ও গবেষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এখনো বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্রসাহিত্যের অনুবাদ, গবেষণা ও আলোচনা করে চলেছেন। অভূতপূর্ব প্রচুর কাজ তাঁরা সম্পাদন করেছেন, যদিওবা বৃহত্তর বাঙালি পাঠক সেসব জানেই না! জানে না ‘বাংলা একাডেমি’ ও ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’ কর্তৃপক্ষও। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অধ্যাপক ড. নারা ৎসুয়োশি, বাংলা ভাষার শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক ড. উসুদা মাসয়ুকি, একদা ‘এনএইচকে’র বাংলা সম্প্রচার বিভাগের সাংবাদিক ও প্রধান ওয়াতানাবে কাজুহিরো, বাংলা ভাষার শিক্ষক অধ্যাপক ড. নিওয়া কিওকো। আরও যাঁরা স্বনামধন্য বাংলা ভাষাজ্ঞাত, তাঁরা হলেন অধ্যাপক ড. ওওনিশি মাসায়ুকি, অনুবাদক ও বাংলাদেশভিত্তিক বার্ষিক ম্যাগাজিন ‘সোকা’ বা ‘উজানযাত্রী’ সম্পাদক সুজুকি কিকুকো, তামোৎসু নাগাই, নিশিওকা নাওকি, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদ্বয় শ্রীমতী কাম্বে তোমোকো ও শ্রীমতী ওকুদা য়ুকা, অধ্যাপক গবেষক ড. তোগাওয়া মাসাহিকো উল্লেখযোগ্য।

ড. নিওয়া কিওকো অনূদিত ও সম্পাদিত বাংলাদেশের কবিতা

‘বাংলা ভাষা পাঠচক্র’ দীর্ঘ বছর অনিয়মিত একটি মুখপত্র হিসেবে ‘কল্যাণী’ নামে ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে। সর্বমোট সম্ভবত ১৮টি সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে। এগুলোয় প্রকাশিত অধিকাংশ রচনাই ছিল রবীন্দ্ররচনা এবং বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা লেখকদের রচিত মূল বাংলা রচনা থেকে জাপানি অনুবাদ।

আজকে জাপানে শতবর্ষী পুরনো তোওকিয়োও গাইগোকুগো দাইগাকু তথা বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পাঠদান চলছে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বল্পমেয়াদী পাঠক্রমে জাপানিরা যাচ্ছেন বাংলা ভাষা শেখার জন্য নানা উপলক্ষে। ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে এই পরিধি। ওকাকুরা তেনশিন এবং রবীন্দ্রনাথের কল্যাণে জাপানে বাংলা ভাষাশিক্ষা ও বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ঐতিহ্যগত রূপ ধারণ করতে চলেছে বলে প্রতীয়মান হয়। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সন্দেহ নেই।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক

আমাদের ভাষার সংগ্রাম ও বর্তমান সময়

বিএনপির প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নতুন সরকারের প্রথম দিন ও সামনের পথ

একুশের এক বিস্মৃত শহীদ আবদুস সাত্তার

মধ্যপ্রাচ্যে কি কোনো দিন শান্তি আসবে

মারণ-রাজনীতির নয়া হাতিয়ার এআই-অ্যালগরিদম

আরব বিশ্বের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের অর্থনীতি: বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ‍্যৎ অন্তরায়

‘কলি’র ক্রীতদাস

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত