হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

স্মার্টফোন নয়, দরকার স্মার্ট দক্ষতা

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

তরুণদের হাতে সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন অথচ সবচেয়ে কম প্রশিক্ষণ। ছবি: পেক্সেলস

আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি আর শুধু জীবনের সহায়ক অংশ নয়। এটি এখন একটি জাতির টিকে থাকা, স্বনির্ভরতা ও সার্বভৌমত্বের প্রধান ভিত্তি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডেটাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর সুফলও তারা পাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা ডিজিটাল সাক্ষরতা এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। দেশে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যাপ্তি বেড়েছে। কিন্তু দক্ষ ও গঠনমূলক ব্যবহারের অভাব রয়ে গেছে। এই ঘাটতি আমাদের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এটি জাতীয় অগ্রগতির পথে এক বড় অন্তরায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তো প্রতিবছরই বাড়ছে, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা ব্যবহারকারীর সংখ্যায় নয়, প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করছি, সেখানেই। আমাদের দেশে প্রায়ই ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রধান সূচক হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু এই পরিসংখ্যানে বাস্তবতার পুরো চিত্র ফোটে না। বাস্তবতা হলো, বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছে প্রযুক্তি মানেই এখনো ফেসবুক, ইউটিউব বা বিনোদন। তথ্যের সত্যতা যাচাই, অনলাইন আর্থিক নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা এবং পেশাগত কাজে প্রযুক্তির দক্ষ প্রয়োগে আমাদের অভাব স্পষ্ট।

এর মাশুল দিতে হচ্ছে সরাসরি সমাজ ও অর্থনীতিকে। সাইবার ফ্রড, ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে প্রতারণা, হ্যাকিং এবং গুজব ছড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির ঘটনা দিন দিন বহুগুণ বাড়ছে। দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সাইবার আক্রমণের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। কারণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের গতি যত বেড়েছে, নিরাপত্তা অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল সেই তুলনায় বাড়েনি। গত পাঁচ বছরে দেড় লাখের বেশি নাগরিক সাইবারসংক্রান্ত অভিযোগ দাখিল করেছেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ, যাদের হাতে সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন অথচ সবচেয়ে কম প্রশিক্ষণ। দ্য ডেইলি স্টারের একটি গবেষণা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের শিকার মানুষদের প্রায় অর্ধেক সামাজিক মর্যাদাহানির শিকার হন, আর ৪০ শতাংশের বেশি সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এই পরিসংখ্যান একক কোনো ঘটনা নয়। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের একটি দুর্বলতার চিত্র।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারিক ডিজিটাল দক্ষতার বড় ঘাটতি রয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পাসের জন্য তত্ত্বীয় বিষয় শেখে। কিন্তু আধুনিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা, যেমন ডেটা প্রসেসিং, প্রাথমিক প্রোগ্রামিং বা ডিজিটাল কমিউনিকেশনে তারা পিছিয়ে পড়ছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম বড় ফ্রিল্যান্সিং বাজার হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সিংহভাগ তরুণ কম মূল্যের সাধারণ কাজে আটকে আছে। সফটওয়্যার প্রকৌশল বা সাইবার নিরাপত্তার মতো উচ্চমূল্যের খাতে তারা বৈশ্বিক বাজার দখল করতে পারছে না। বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার বছরে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন। এর সিংহভাগই আসছে তুলনামূলক কম দক্ষতার ডেটা এন্ট্রি বা সাধারণ কনটেন্টের কাজ থেকে, উচ্চমূল্যের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বা এআই-নির্ভর সেবা থেকে নয়। অন্যদিকে সরকারি বিভিন্ন সেবা ‘ই-গভর্ন্যান্স’-এর আওতায় এসেছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের ডিজিটাল দক্ষতার অভাবে দুর্নীতির সুযোগ ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দিকে তাকালে শিক্ষার চিত্রটি স্পষ্ট হয়। এস্তোনিয়া আশির দশকেই প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকে কোডিং ও সাইবার নিরাপত্তার পাঠ বাধ্যতামূলক করে। আজ তারা বিশ্বের শীর্ষ ডিজিটাল সমাজে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের মানবসম্পদকে প্রযুক্তি-সক্ষম করে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভিয়েতনামও কারিগরি শিক্ষায় ডিজিটাল লিটারেসিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, আর তাতেই তারা বৈশ্বিক প্রযুক্তি উৎপাদন ও আউটসোর্সিংয়ের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাদের সফলতার মূলে ছিল একটি বিষয়, শুধু প্রযুক্তি কিনলেই হয় না। সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এমন মানুষ গড়ে তোলাই বেশি জরুরি। তবে এই পথ সহজ নয়, তা স্বীকার করাও জরুরি। একটি বিশ্লেষণ মনে করিয়ে দেয়, শুধু কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। প্রোগ্রামিং শেখানোর মতো প্রশিক্ষিত শিক্ষক জোগাড় করাই আসল চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই এগোতে হবে, সবাইকে তাড়াহুড়ো করে কোডার বানানোর অবাস্তব স্বপ্ন না দেখিয়ে।

আমাদের জাতীয় বাজেট এবং নীতিমালায় ফাইবার অপটিক কেব্‌ল বা হার্ডওয়্যার কেনার মতো অবকাঠামোগত খাতে বরাদ্দ আছে। কিন্তু ‘মানবসম্পদের ডিজিটাল সক্ষমতা’ বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও সমন্বিত উদ্যোগ এখনো অপ্রতুল। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। একটি সাম্প্রতিক বিশেষ প্রতিবেদনও একই কথা বলছে। বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের মূল চ্যালেঞ্জ এখন আর মোবাইল ফোন সংযোগের আওতা বাড়ানো নয়। মূল চ্যালেঞ্জ এখন মানসম্মত ইন্টারনেট, ডিভাইসের মালিকানায় নারী-পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণ এবং দক্ষতার ভিত্তিতে মানুষ যেন ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল পায়। অবকাঠামো অনেকটাই তৈরি হয়েছে। এখন মানুষকে সেই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে শেখাতে হবে।

আমার মতে, প্রযুক্তি আর মানুষের দক্ষতার এই ব্যবধান কমাতে না পারলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতির প্রতিটি সাফল্যের গল্পই আসলে অর্ধেক গল্প হয়ে থাকবে। সময় এসেছে ডিজিটাল লিটারেসিকে মৌলিক নাগরিক অধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার। জাতীয় বাজেটে ডিজিটাল সাক্ষরতার জন্য পৃথক ও পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ রাখতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কেবল মুখস্থনির্ভর তথ্যপ্রযুক্তি বই নয়, ব্যবহারিক সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির গঠনমূলক ব্যবহারের পাঠক্রম বাধ্যতামূলক করা দরকার। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা ও প্রান্তিক জনগণের জন্য দেশব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা সময়ের দাবি।

প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা কি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি নতুন প্রযুক্তি তৈরি ও উদ্ভাবনের দিকেও এগোব? উত্তরটা নির্ভর করছে আজ আমরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছি তার ওপর। ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোর কাজ আর পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। দেরি হলে বিশ্বের প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ব, আর সেই অবস্থান ফিরে পাওয়া কঠিন হবে।