এবারের পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন ছিল লক্ষণীয়। রমনা বটমূলে ছায়ানটের চিরাচরিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রসরোবরে সুরের ধারা ও টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আয়োজিত বৈশাখী উৎসবে সংস্কৃতিমনা বাঙালিদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। গত বছরের পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন ছিল অনেকটা প্রাণহীন ও শঙ্কায় ভরা। এই সময়ে বাংলা ও বাঙালির আবেগ, আচার অনুষ্ঠান, ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতির বিষয়গুলো সাম্প্রদায়িক চেতনায় আচ্ছন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী দ্বারা প্রায় প্রতিনিয়ত বিতর্কিত হয়ে পড়ছিল। তাদের বাংলা সংস্কৃতি ও নারীর প্রতি একধরনের বিরুদ্ধাচরণ করতে দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ ভীত হয়েছে এই ভেবে যে বাংলা ও বাঙালি তথা এই জাতি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে কি না শেষমেশ! কিন্তু কোনো অপশক্তির দৃশ্যমান অপতৎপরতার দেখা মেলেনি এবার। এবারের পয়লা বৈশাখ আরও বেশি প্রাণ পেয়েছে বর্তমান সরকারের কৃষক কার্ড বিতরণের উদ্বোধনী দিন হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণে।
বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমান পয়লা বৈশাখের সঙ্গে কৃষি ও কৃষকের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলা বছরের প্রথম দিনটিতে কৃষক কার্ড বিতরণের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর কথায় বাংলা ও বাঙালির শিল্প, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়। টাঙ্গাইল জেলাকে কৃষক কার্ড বিতরণের উদ্বোধনী স্থান বাছাইয়ের পেছনের গল্পটাও মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গেল। মওলানা ভাসানীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ নিঃসন্দেহে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে আগামী প্রজন্মের কাছে। জানা গেছে, প্রথম দফায় ২২ হাজার কৃষক এই কার্ড পাচ্ছেন, যা ব্যবহার করে তাঁরা ১০টি সুবিধা পাবেন। সঙ্গে পাবেন প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা।
একটা কথা না বললেই নয়, বাংলাদেশে শিক্ষা ও কৃষিব্যবস্থা কেন যেন বিগত সরকার আমলগুলোতে খুব একটা কার্যকর অবস্থায় ছিল না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, এই দুই সেক্টরে অমনোযোগিতা ছিল। কিংবা বলা যায়, দক্ষ জনবল ও উপযুক্ত জ্ঞান-পর্যবেক্ষণের যথেষ্ট অভাব ছিল। ফলে, শিক্ষা ও কৃষি সেক্টর যেনতেনভাবে চলেছে। অথচ এই দুটি সেক্টরের উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ও অস্তিত্ব সুরক্ষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমরা শৈশবে জেনেছি, পড়েছি—বাংলাদেশ হলো একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের মাটিতে সোনা ফলে। পাট হলো দেশের সোনালি আঁশ। আরও জেনে বড় হয়েছি যে শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড। একটি শিক্ষিত জাতি হলো একটি দেশের অস্তিত্ব সংকট মোকাবিলার অন্যতম অস্ত্র বা হাতিয়ার। সব উন্নয়ন ভাবনার উপযুক্ততা আসে শিক্ষার গুণগত অবস্থান থেকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে কৃষি ও শিক্ষা—এই দুটি সেক্টর বিগত সরকার আমলে সেই অর্থে গুরুত্ব পায়নি।
শহরে বসবাসকারী একজন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ বলছিল, যখন শহরের বাজার থেকে ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে আলু কিনে খাচ্ছি, তখন গ্রামে একজন কৃষক তাঁর জমির এই ফসল বিক্রি করে মাত্র ৩-৪ টাকা কেজি দরে। কৃষকের ফসল তারা নিয়ন্ত্রণ করে? প্রচারমাধ্যমে এমন সংবাদ পরিবেশনের সংখ্যা কিন্তু কম নয় যে মধ্যস্বত্বভোগীরা কীভাবে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করছে। কৃষকদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কৃষকদের সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকার নেই কেন, আর কারা এবং কীভাবে তাঁদের বাজারের প্রবেশাধিকার লঙ্ঘিত করছে, যে কারণে তাঁরা তাঁদের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না—এমন প্রশ্নের জবাব কিন্তু অতীতে খোঁজার চেষ্টা করেনি কর্তৃপক্ষ। এটা কৃষকদের জীবনে বড় ট্র্যাজেডি।
সার আমদানি, বীজ বিতরণ, কৃষিতে ঋণ প্রদান ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কৃষকের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে বরাবর। তবে আশার আলো দেখা যায় মাঠে গেলে। কিছুদিন আগে মাঠে গিয়ে দেখতে পেলাম সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কৃষকদের কেউ কেউ ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স সিস্টেমে বাজারে সরাসরি প্রবেশ করছেন। মাঝে কেউ নেই। ফলে তাঁরা বাজার থেকে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। এই সংখ্যা কিন্তু আশাব্যঞ্জক হয়ে ওঠেনি বা উঠতে পারেনি এই কারণে যে কৃষকের অনেকেই বাটন ফোন ব্যবহার করেন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেক জটিলতা রয়েছে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এই বিষয়কে সহজ করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।
তারেক রহমানের কৃষির প্রতি যে মনোযোগ ও উদ্যোগ, তা যদি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয় তাহলে বলা যায়, একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে কৃষকের জীবনে। দেশের গতানুগতিক পরনির্ভরশীলতা কমবে। দেশ নিজস্ব সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। আর তাতে ভিক্ষাবৃত্তির অবসান ঘটবে। যাহোক, তারেক রহমানকে সাধুবাদ জানাই এক. পয়লা বৈশাখে এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য; দুই. কৃষকশ্রেণির মানুষের কার্ড দিয়ে সম্মানিত করার জন্য। এই কার্ড প্রদানের বিষয়টি কেবল নির্বাচনী প্রচারণার ফলে না হয়ে সর্বজনীন হয়ে উঠুক, সেই প্রত্যাশা।