হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ফুটবলে কেপ ভার্দের অর্জন, আমাদের শিক্ষা

আমরা আর কতকাল অন্যের জয়ে নিজেদের ছাদে ভিনদেশি পতাকা ওড়াব? আমরা আর কতকাল শুধু আফসোসের দীর্ঘশ্বাস ফেলব? কেপ ভার্দে যদি মাত্র সাড়ে ৫ লাখ মানুষ আর এক আকাশ অভাব নিয়ে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিতে পারে, তবে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ কেন পারবে না? ঘাটতি আমাদের স্কিলে নয়, ঘাটতি আমাদের মেরুদণ্ডে, আমাদের সদিচ্ছায় এবং আমাদের ফুটবল ব্যবস্থাপনায়।

চিররঞ্জন সরকার

যে কেপ ভার্দেকে কেউ কোনো দিন ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি, তারা আজ ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। ছবি: সংগৃহীত

কেপ ভার্দে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা মাত্র সাড়ে ৫-৬ লাখ মানুষের একটা পুঁচকে দ্বীপরাষ্ট্র। বছরখানেক আগেও বাংলাদেশের সিংহভাগ ফুটবলপ্রেমী হয়তো এই দেশটার নামও শোনেননি। না শোনাটাই স্বাভাবিক। বিশ্ব মানচিত্রে বুক ফুলিয়ে নিজেদের জাহির করার মতো কোনো অমূল্য রতন বা প্রাকৃতিক সম্পদ কেপ ভার্দের নেই। অর্থনৈতিকভাবে তারা এখনো পুরোপুরি স্বাবলম্বী নয়। বৈশ্বিক জিডিপির মাথাপিছু আয়ের নিরিখে বিশ্বে তাদের অবস্থান ১১৪ নম্বরে, হ্যাপিনেস ইনডেক্সে ১৩৫ আর ক্ষুধার সূচকে ৪৮ নম্বরে। এককথায় সবকিছুতেই তারা ‘মধ্যবিত্ত’। না খুব ভালো, না খুব খারাপ। আমাদের চেনা-জানা অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই যেন এই দেশটির যাপনচিত্র। ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই পুঁচকে দেশে বিশ্ববাসীকে তাক লাগানোর মতো কিছুই ছিল না।

কিন্তু সম্প্রতি পাশার দান উল্টে গেছে। যে কেপ ভার্দেকে কেউ কোনো দিন ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি, তারা আজ ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। আজ তাদের দলে আছেন জোসিমার জসে এভোরা দিয়াজ—যাঁকে গোটা বিশ্ব এখন ‘ভোজিনহা’ নামে চেনে। আছেন সিডনি লোপেজ কাবরাল বা ডেরয় ডুয়ার্টেরা। মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে স্পেন, উরুগুয়ে কিংবা আর্জেন্টিনার মতো বিশ্ব ফুটবলের প্রবল পরাক্রমশালী জায়ান্টদের বিরুদ্ধে এঁরা যেভাবে বুক চিতিয়ে লড়েছেন, তাতে আজ পুরো ফুটবল বিশ্ব এই দলটির হার না-মানা মানসিকতাকে কুর্নিশ জানাচ্ছে। অখ্যাত, মধ্যবিত্ত এই দেশটি আজ গুগল সার্চের ট্রেন্ডিংয়ে একেবারে ওপরের সারিতে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ আজ বুঁদ হয়ে খুঁজছে—কে এই ভোজিনহা? কে এই কেপ ভার্দিয়ান, যাঁরা বিশ্বকাপে এসে এমন রূপকথা লিখছেন?

অথচ ভোজিনহাদের দেশের ভেতরের গল্পটা মোটেও রূপকথার মতো মসৃণ নয়, বরং তীব্র সংকটে তারা জর্জরিত। প্রথম সংকট হলো জনসংখ্যা। এত কম মানুষের দেশে খেলোয়াড় বাছাইয়ের জন্য ‘ট্যালেন্ট পুল’ বা প্রতিভার চারণভূমি বড্ড ছোট। দেশের ভেতরের ফুটবলের সামগ্রিক কাঠামো একেবারেই ভঙ্গুর। ঘরোয়া শীর্ষ লিগটি কিছুদিন আগপর্যন্তও পুরোপুরি পেশাদার ছিল না। এখন কাগজে-কলমে পেশাদার লিগ চালু হলেও দেশে প্রকৃত পেশাদার ফুটবলারের সংখ্যা হাতে গোনা। উন্নতমানের বড় স্টেডিয়াম নেই, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তো দুরস্ত। সবচেয়ে বড় সংকট হলো দেশের অর্থনৈতিক অনটন। নিজ দেশে ভালো রোজগারের অভাব এতটাই তীব্র যে দেশের মোট জনসংখ্যার সমপরিমাণ মানুষ জীবিকার তাগিদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন।

এই চরম বাস্তবতার প্রভাব পড়েছে তাদের ফুটবল দলেও। কেপ ভার্দে দলের অধিকাংশ ফুটবলারই আসলে প্রবাসী, যাঁরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বড় হয়েছেন বা খেলছেন। দেশের ফুটবলের করুণ দশা বোঝাতে একটি তথ্যই যথেষ্ট যে, গোলরক্ষক ভোজিনহার নাম আজ বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে, এই মুহূর্তে তাঁর নিজের কোনো ক্লাবও নেই! তিনি ফ্রি এজেন্ট। বিশ্বকাপ নামক এই মহাযজ্ঞ শেষ করে দেশে ফিরে তাঁর ফুটবলার ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ কী হবে, কোন ক্লাবে তিনি খেলবেন, তা তিনি নিজেও জানেন না। এতসব ‘নেই’-এর মাঝে দাঁড়িয়েও তারা বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়ছে এবং জিতছে।

ঠিক এই জায়গাতেই একজন বাঙালি হিসেবে, বাংলাদেশের একজন ফুটবল অনুরাগী হিসেবে আমাদের মনে এক তীব্র ও রক্তাক্ত প্রশ্ন জাগে—কেপ ভার্দের যা আছে, তা কি আমাদের নেই? নাকি আমাদের যা আছে, তা কেপ ভার্দেরও নেই?

আসুন একটু খতিয়ে দেখি। আমাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। আমাদের দেশের আনাচকানাচে, গ্রামগঞ্জে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যেকোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিকেলে একটু চোখ ফেরালেই দেখা যায় শয়ে শয়ে কিশোর-তরুণ কাদামাটি মাখিয়ে ফুটবল নিয়ে মেতে আছে। আমাদের ফুটবল নিয়ে যে আবেগ, তা বিশ্বের যেকোনো ফুটবল পরাশক্তিকে টেক্কা দিতে পারে। আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতলে বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে উন্মাদনায় ভাসে, তা ফিফা পর্যন্ত স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি ঘরোয়া ফুটবলে ঢাকা আবাহনী আর মোহামেডানের সেই সোনালি অতীতের উন্মাদনার কথা আমরা ভুলে যাইনি। অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকেও বাংলাদেশ আজ আর পিছিয়ে নেই। জিডিপির আকার কিংবা মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের সক্ষমতায় আমরা কেপ ভার্দের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী রাষ্ট্র। আমাদের আধুনিক স্টেডিয়াম আছে, সরকার থেকে শুরু করে করপোরেট স্পনসরদের বিপুল অর্থের জোগান দেওয়ার সামর্থ্য আছে। তবু কেন আমরা পারি না? ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে আমরা কেন বছরের পর বছর ১৫০ বা ১৭০-এর ঘরের গোলকধাঁধায় আটকে থাকি? কোথায় আমাদের আসল ঘাটতি?

আমাদের ঘাটতি কি তবে ফুটবল স্কিলের, নাকি বুক চিতিয়ে লড়াই করার মানসিকতার? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের ফুটবল সংস্কৃতি, দূরদর্শিতা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবের মধ্যে।

প্রথমত, কেপ ভার্দে তাদের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপান্তর করেছে। তাদের সম্পদ কম, দেশের ভেতরের লিগ দুর্বল—তাই তারা চোখ ফিরিয়েছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের প্রবাসী সন্তানদের দিকে। ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণে বেড়ে ওঠা কেপ ভার্দে বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের তারা এক সুতায় গেঁথেছে। জাতীয় দলের জন্য তারা তৈরি করেছে একটি আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত স্কাউটিং নেটওয়ার্ক। অথচ আমাদের দেশেও ইউরোপ-আমেরিকায় বেড়ে ওঠা প্রবাসী বাংলাদেশি প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু আমরা তাঁদেরকে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর অনীহার এক অভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে রেখেছি। হামজা চৌধুরী, জামাল ভূঁইয়া বা তারিক কাজীর মতো দু-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া এই ধারাকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি।

দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় গলদ আমাদের ঘরোয়া ফুটবলকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে। আমাদের দেশে কোটি কোটি টাকার টুর্নামেন্ট হয়, জমকালো লিগ হয়, কিন্তু একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে (যেমন অনূর্ধ্ব-১২, অনূর্ধ্ব-১৫) যেভাবে খেলোয়াড় তৈরি করার কথা, সেই একাডেমিভিত্তিক বা পাইপলাইনভিত্তিক ফুটবল আমাদের দেশে অনুপস্থিত। আমাদের এখানে ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয় মূলত ‘অ্যাডহক’ বা জোড়াতালি দিয়ে। কোনো একটা টুর্নামেন্ট সামনে এলে তড়িঘড়ি করে ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়, বিদেশি কোচ এনে কয়েক সপ্তাহ অনুশীলন করিয়ে অলৌকিক কিছুর আশা করা হয়। কিন্তু আধুনিক ফুটবল কোনো অলৌকিকতার ওপর ভর করে চলে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া, যা আমাদের নীতিনির্ধারকেরা হয় বোঝেন না, অথবা বুঝেও ক্ষমতার দাপটে এড়িয়ে যান।

তৃতীয়ত, মানসিকতা এবং লক্ষ্য নির্ধারণের অভাব। কেপ ভার্দের ফুটবলাররা যখন মাঠে নামেন, তাঁদের হারানোর কিছু থাকে না, কিন্তু অর্জনের থাকে এক বিশাল আকাশ। ভোজিনহাদের মতো ক্লাবহীন খেলোয়াড়েরা জানেন, এই ৯০ মিনিটের লড়াই তাঁদের জীবন বদলে দিতে পারে, বিশ্বমঞ্চে দেশের সম্মান এনে দিতে পারে। তাঁদের সেই ক্ষুধা, সেই তাড়না মাঠের প্রতিটি সেকেন্ডে স্পষ্ট দেখা যায়। অন্যদিকে, আমাদের দেশের ফুটবলারদের এক বিরাট অংশ ঘরোয়া লিগে মোটা অঙ্কের টাকা পেয়েই সন্তুষ্ট হয়ে যান। আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের নিয়ে যাওয়ার বা বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সেই তীব্র ক্ষুধা বা ‘কিলার ইন্সটিঙ্কট’ আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে দানা বাঁধতে পারছে না। কারণ, আমরা তাঁদেরকে সেই স্বপ্ন দেখতে শেখাইনি। আমাদের ফুটবল অভিভাবকেরা বছরের পর বছর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে যাওয়াকেই সাফল্যের চূড়া মনে করে এসেছেন। যে দেশের লক্ষ্য এত ছোট, সেই দেশ কীভাবে বিশ্বমঞ্চে দাপট দেখাবে?

কেপ ভার্দে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে ফুটবল খেলার জন্য কোটি কোটি জনসংখ্যা লাগে না, শত শত আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামও লাগে না। যা লাগে, তা হলো একটা স্পষ্ট ভিশন বা দূরদর্শিতা, সততা, আধুনিক ফুটবলের সঠিক দর্শন এবং জাতীয় দলের জার্সির প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা।

আমরা আর কতকাল অন্যের জয়ে নিজেদের ছাদে ভিনদেশি পতাকা ওড়াব? আমরা আর কতকাল শুধু আফসোসের দীর্ঘশ্বাস ফেলব? কেপ ভার্দে যদি মাত্র সাড়ে ৫ লাখ মানুষ আর এক আকাশ অভাব নিয়ে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিতে পারে, তবে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ কেন পারবে না? ঘাটতি আমাদের স্কিলে নয়, ঘাটতি আমাদের মেরুদণ্ডে, আমাদের সদিচ্ছায় এবং আমাদের ফুটবল ব্যবস্থাপনায়। এখনো সময় আছে কেপ ভার্দের এই রূপকথা থেকে শিক্ষা নেওয়ার। জোড়াতালির সংস্কৃতি বাদ দিয়ে যদি তৃণমূল থেকে সঠিক প্রতিভা অন্বেষণ এবং প্রবাসী প্রতিভাদের সমন্বয় করা যায়, তবে হয়তো একদিন লাল-সবুজের জার্সি গায়েও কোনো এক ‘ভোজিনহা’ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবেন। সেই দিনের অপেক্ষায় বুক বাঁধাই এখন কোটি বাঙালি ফুটবলপ্রেমীর একমাত্র সান্ত্বনা!

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ

প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে কি রেয়াত মেলে

শিরদাঁড়া সোজা রাখার শিক্ষা

ডাইরেক্ট কানেকটিভিটির প্রস্তাবটুকুই এ সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক

জলবায়ু পরিবর্তনে হাওরের মাছের ভবিষ্যৎ

একসময় আড্ডায় ‘জীবন’ খুঁজে পাওয়া যেত

মাঠ থেকে বিমানবন্দর: বিশ্বকাপ ফুটবলে বৈষম্যের বহুমুখী চেহারা

প্রধানমন্ত্রীর চীনযাত্রা: কোনো গতানুগতিক সফর নয়

অর্থনীতির অদেখা ভুবন: পুষ্টি, পুঁজি ও মানুষের শ্রম

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন: একটি রাজনৈতিক পর্যালোচনা