হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

যান্ত্রিক উৎকর্ষ ও মানবিকতার ভবিষ্যৎ

আসিফ

একুশ শতকের শুরুতে আমরা প্রযুক্তির যে দ্রুতগতির কথা কল্পনা করেছিলাম, ২০২৬ সালে এসে তা শুধু গতির নামান্তর নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের সংজ্ঞাকেই আমূল বদলে দিচ্ছে। আজকের বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুমুখী শাখার একীভবন। তথ্যপ্রযুক্তি, অণুপ্রযুক্তি (মলিকিউলার টেক) এবং ন্যানোপ্রযুক্তি আজ আর আলাদা কোনো সত্তা নয়; বরং এরা মিলেমিশে এমন এক একীভূত বিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছে, যা মানুষের জৈবিক সীমাবদ্ধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

রোবোটিকসের খ্যাতনামা অধ্যাপক হ্যানস মোরাভেক আজ থেকে কয়েক দশক আগে যে ‘যান্ত্রিক স্বর্গে’র কথা বলেছিলেন, তা আজ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। একদিকে যান্ত্রিক স্বর্গের হাতছানি, অন্যদিকে মানুষের জৈবিক ও নৈতিক অস্তিত্বের সংগ্রাম—এই দুই বৈপরীত্যই আজ আমাদের নতুন বাস্তবতা।

একসময় মানুষের বংশগতি বা জেনেটিক কোডকে মনে করা হতো অলঙ্ঘনীয় নিয়তি। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, ডিএনএর ত্রুটি সংশোধন বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এখন শুধু গবেষণাগারের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, বরং বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্র। আধুনিক বংশগতিবিদ্যা যেভাবে এইডস, ক্যানসার বা বংশগত রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তা নিঃসন্দেহে আশীর্বাদ।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে ‘ডিজাইনার বেবি’ তৈরির হাতছানি আমাদের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ। যদি জীবন বিমা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো গ্রাহকের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে তাদের প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে, তবে জন্মগতভাবে নির্দিষ্ট জিনের অধিকারী ব্যক্তিরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম বৈষম্যের শিকার হবেন। এই পরিস্থিতিতে সমাজ আজ বিজ্ঞানীদের চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করছে নীতিশাস্ত্রবিদ, দার্শনিক এবং আইনজ্ঞদের কাছে, যাতে প্রযুক্তির প্রয়োগ মানবিক অধিকারকে লঙ্ঘন না করে।

২০২৬ সালে আমরা যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা রোবোটিক সহায়তার মুখোমুখি হই, তা ন্যানো-স্কেল ইঞ্জিনিয়ারিং ও উচ্চতর কম্পিউটেশনের এক বিস্ময়কর মিশ্রণ। অণুপ্রযুক্তি আজ আমাদের শরীরের কোষগুলোকে মেরামত করার সক্ষমতা দিচ্ছে, আর ন্যানোপ্রযুক্তি পাল্টে দিচ্ছে পদার্থের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এই দুইয়ের সঙ্গে যখন ‘সুপার ইন্টেলিজেন্ট’ তথ্যপ্রযুক্তি যুক্ত হয়, তখন মানুষ আর শুধু একটি জৈবিক প্রাণী থাকে না; সে হয়ে ওঠে প্রযুক্তির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘পোস্ট-বায়োলজিক্যাল’ বা উত্তর-জৈবিক সমাজের দিকে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।

বিগত কয়েক দশকের প্রাযুক্তিক বিবর্তন পরিবেশ গবেষণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী একটি জটিল পর্যবেক্ষণ জাল (গ্লোবাল মনিটরিং নেটওয়ার্ক) বিস্তৃত হয়েছে, যার মাধ্যমে দূষণের উৎস এবং তীব্রতা প্রতি মুহূর্তে (রিয়েল-টাইম) পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তির সুফল সর্বত্র সমান নয়। তথ্যের এই প্রবাহ এবং সামর্থ্য অর্জনে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যে ভূরাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা বৈশ্বিক বাস্তুসংস্থান রক্ষার পথে বড় বাধা।

তথাপি, ‘প্রোডাক্ট-লিঙ্কড তথ্য ব্যবস্থা’ আজ সার্কুলার ইকোনমি বা চক্রাকার অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। কোনো পণ্যের জীবনচক্র শেষে তার প্রতিটি উপাদানকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে পুনরায় কাঁচামালে রূপান্তর করার এই পদ্ধতি সম্পদ সংরক্ষণে এক বৈপ্লবিক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধতা আমাদের নবায়নযোগ্য শক্তির পূর্ণ ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে সৌরকোষের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এর উৎপাদন খরচ নাটকীয়ভাবে কমে আসায় ২০২৬ সালে আমরা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছি। আজ জার্মানিসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার এক বিশাল অংশ সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।

অন্যদিকে নিউক্লিয়ার ফিউশন নিয়ে দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক সংশয় এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। একসময় একে জ্বালানি সংকটের চূড়ান্ত ‘হাই-টেক’ সমাধান মনে করা হলেও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বিজ্ঞানীদের প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তুলছে। এই অনিশ্চয়তা আমাদের বারবার বাধ্য করছে আরও নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প শক্তির উৎস সন্ধান করতে। একইভাবে, পরিবহন খাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণমুক্ত ইঞ্জিনের বিকাশ আজ আর কোনো বিলাসী উদ্ভাবন নয়, বরং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধ করে টিকে থাকার লড়াইয়ে এটি এক পরম আবশ্যকতা ও অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে হিউম্যানয়েড রোবট বা মানবসদৃশ যন্ত্রগুলো আমাদের প্রথাগত শ্রমবাজারের প্রায় প্রতিটি স্তর দখল করে নিয়েছে। ভারী শিল্প থেকে শুরু করে সূক্ষ্ম সেবা খাত—সবখানে আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একচ্ছত্র আধিপত্য। এই রূপান্তরের একটি ইতিবাচক দিক হলো সম্পদের অভূতপূর্ব উৎপাদন; কারণ, উৎপাদনশীলতা এখন আর মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বা সময়ের সীমাবদ্ধতায় আটকা পড়ে নেই। তাত্ত্বিকভাবে, যন্ত্রের এই উত্থান মানুষকে হাড়ভাঙা খাটুনি থেকে মুক্তি দিয়ে এক অফুরন্ত অবকাশের জীবন উপহার দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যান্ত্রিক এই উৎকর্ষের সমান্তরালে সৃষ্টি হয়েছে এক বিশাল কর্মহীন জনগোষ্ঠী। যখন মানুষের কাজগুলো যন্ত্রই নিখুঁতভাবে সম্পাদন করছে, তখন সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনধারণের টেকসই উপায় কী হবে, তা আজ ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন আর অর্থনৈতিক নয়, বরং দার্শনিক। আমরা কি তবে এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মানবিকতা সত্যিই ‘অবসরে’ চলে যাবে? অধ্যাপক মোরাভেক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যন্ত্র যখন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক কাজগুলো নিখুঁতভাবে করতে শুরু করবে, তখন মানুষ তার জৈবিক পরিচয় ছাপিয়ে এক নতুন ডিজিটাল অস্তিত্বে বিলীন হতে চাইবে। কিন্তু আবেগ, নৈতিকতা, সহানুভূতি এবং সৃজনশীলতার মতো যে গুণগুলো আমাদের ‘মানুষ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যান্ত্রিক স্বর্গে সেগুলোর স্থান কোথায়?

২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা আজ অনস্বীকার্য এক আমূল পরিবর্তনের মুখোমুখি। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিশ্বজনীন প্রতিযোগিতার ডামাডোলে একটি মৌলিক সত্য প্রায়ই ঢাকা পড়ে যায়; তা হলো, বর্তমান লড়াইটি শুধু গাণিতিক শ্রেষ্ঠত্ব বা অর্থনৈতিক আধিপত্যের নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার। প্রফেসর ড. হান্স-ইয়ুর্গেন ওয়ার্নেকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিজ্ঞানের চাহিদা ও গবেষণার গতি অনিবার্যভাবেই আগামীর দিকে ধাবিত হবে। তবে এই অগ্রগতির সমান্তরালে যদি আমরা সুদৃঢ় মূল্যবোধ এবং অলঙ্ঘনীয় নৈতিক সীমানা নির্ধারণে ব্যর্থ হই, তবে প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে মানুষের সেবকের বদলে খোদ মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যই চরম হুমকি।

আমাদের বর্তমান লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক বৈশ্বিক সংহতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রযুক্তির সৃষ্ট অফুরন্ত সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে জিম্মি না থেকে সাধারণের কল্যাণে সমানভাবে বণ্টিত হবে। যন্ত্র আমাদের হাড়ভাঙা কায়িক শ্রম থেকে মুক্তি দিক, তা কাম্য; কিন্তু সেই অবসরে আমাদের আত্মিক ও মানসিক বিকাশের পথ যেন রুদ্ধ না হয়। উত্তর-জৈবিক (পোস্ট-বায়োলজিক্যাল) সমাজের দিকে যাত্রার এই জটিল মুহূর্তে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে যন্ত্রের দেওয়া স্বাচ্ছন্দ্য সহায়ক হলেও মানুষের অনন্য মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার কোনোভাবেই বিসর্জনযোগ্য নয়। গন্তব্য যদি হয় ‘যান্ত্রিক স্বর্গ’, তবে সেখানে পৌঁছাতে গিয়ে যেন আমরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ‘মানবতা’ হারিয়ে না ফেলি।

আসিফ, বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত

আসন্ন বাজেট কেমন দেখতে চাই

সামাজিক ব্যবসার হাত থেকে স্বাস্থ্যকে বাঁচান

জাতীয় বাজেট ও কৃষকের প্রত্যাশা

মাজারে হামলা কারা করে

শিশু ধর্ষণ বন্ধ হোক

সরকারের কাজ ফুটবল মাঠের রেফারির ভূমিকার মতো: ড. রুশাদ ফরিদী

বৃষ্টির ধরন কি বদলে যাচ্ছে

মানুষ কী করে বাঁচবে

সম্ভাবনার পথ কি দেখাবে এবারের শিক্ষা বাজেট

বিশ্বজুড়ে ডানপন্থার উত্থান