চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে আজকের সর্বোত্তম চিকিৎসাপদ্ধতি বছরের মধ্যে নতুন গবেষণা, নতুন ওষুধ, নতুন ডিভাইস কিংবা নতুন প্রযুক্তির কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। একজন চিকিৎসকের শিক্ষা তাই এমবিবিএস, এমডি বা অন্য কোনো উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে শিখতে হয়। আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা, ফেলোশিপ, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক চিকিৎসা শিক্ষা চিকিৎসকদের এই জ্ঞান হালনাগাদের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে হৃদ্রোগ, ক্যানসার, স্নায়ুরোগ, সার্জারি, রেডিওলজি ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর শাখায় নতুন ওষুধ, ডিভাইস ও চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই চিকিৎসকের বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশগ্রহণকে কোনোভাবেই বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি শেষ পর্যন্ত রোগীর উন্নত চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক, বৈজ্ঞানিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ওষুধ ও মেডিকেল ডিভাইস শিল্পের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা রয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক কংগ্রেস ও বৈজ্ঞানিক সভা আয়োজন করে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন, বৈজ্ঞানিক সোসাইটি, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে ওষুধ ও মেডিকেল ডিভাইস কোম্পানিগুলো এসব কার্যক্রমে স্পনসরশিপ, শিক্ষা-অনুদান, গবেষণা সহায়তা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা দিয়ে থাকে।
অতএব, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বা সহযোগিতা মানেই অনৈতিকতা—এমন ধারণা বৈজ্ঞানিক ও নীতিগতভাবে সঠিক নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—অর্থায়ন হয়েছে কি না, শুধু সেটি নয়; বরং কী উদ্দেশ্যে হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়েছে কি না, এবং এর বিনিময়ে চিকিৎসকের স্বাধীন চিকিৎসা সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়েছে কি না?
ইউরোপের ওষুধশিল্পের নীতিমালায় স্বাস্থ্য পেশাজীবী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা ও অন্যান্য মূল্য হস্তান্তরের তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে। মেডিকেল ডিভাইস শিল্পেও শিক্ষা-অনুদান ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের জন্য পৃথক নৈতিক কাঠামো রয়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে মূল দর্শনটি হচ্ছে— সহযোগিতা বন্ধ নয়; সহযোগিতাকে স্বচ্ছ, নৈতিক ও জবাবদিহিমূলক করা।
চিকিৎসক-শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কের বৈধ ও বৈজ্ঞানিক অংশের পাশাপাশি অনৈতিক লেনদেনের ঝুঁকিও বাস্তব। কোনো কোম্পানি যদি চিকিৎসকের পেশাগত সিদ্ধান্ত, প্রেসক্রিপশন, রোগী রেফারেল, হাসপাতালের ক্রয় বা ডিভাইস নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে অর্থ, উপঢৌকন বা অন্য কোনো সুবিধা দেয়, তা বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা নয়; এটি স্বার্থের সংঘাত, অনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতির পর্যায়ে পড়তে পারে।
এ ধরনের লেনদেনকে ‘উপহার’, ‘সৌজন্য’, ‘সম্পর্ক রক্ষা’, ‘বৈজ্ঞানিক সহায়তা’ বা ‘মার্কেটিং ব্যয়’ নামে আড়াল করা যাবে না। লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, মূল্য, প্রাপক, প্রদানকারী এবং সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করেই এর নৈতিকতা নির্ধারণ করতে হবে।
সব ধরনের উপহার একই মাত্রার অনৈতিক নয়। সম্মেলনে ব্যবহারের জন্য সামান্য মূল্যের কলম, নোটবুক বা শিক্ষামূলক উপকরণ কিছু নীতিমালায় অনুমোদিত হতে পারে। তবে উপহারের মূল্য, ঘনত্ব, উদ্দেশ্য এবং চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনা করতে হবে।
তা গ্রহণ না করাই নৈতিকভাবে নিরাপদ। প্রতিষ্ঠানভেদে উপহার গ্রহণের সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। নির্ধারিত সীমার বেশি কোনো সুবিধা পেলে তা প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা কমিটি বা স্বচ্ছতা নিবন্ধনে ঘোষণা করতে হবে।
চিকিৎসক বক্তা, গবেষক, প্রশিক্ষক বা পরামর্শক হিসেবে কাজ করলে যুক্তিসংগত সম্মানী পেতে পারেন। তবে সেটি হতে হবে—
অন্যদিকে কোনো কাজ না করেও অর্থ নেওয়া, ভুয়া কাজ দেখিয়ে অর্থ নেওয়া, প্রেসক্রিপশন বা রোগী রেফারেলের ভিত্তিতে অর্থ নেওয়া কিংবা গোপনে নগদ গ্রহণ করা কমিশন বা ঘুষের পর্যায়ে পড়তে পারে।
চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে যে প্রশ্নগুলো ওঠে, সেগুলোও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে চিকিৎসক সমাজকেও আত্মসমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না। বিভিন্ন সময়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ও প্রশ্ন সামনে আসে।
যেমন—
এসব প্রশ্ন তোলা চিকিৎসকদের অপমান করা নয়। বরং চিকিৎসক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান—উভয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্যই প্রশ্নগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান দরকার। অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো চিকিৎসক সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও অন্যায়। কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটির তদন্ত হওয়া উচিত। প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কিন্তু কিছু ঘটনার কারণে দেশের হাজার হাজার চিকিৎসকের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডকে সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা ওষুধ ও ডিভাইস কোম্পানির সব শিক্ষা-সহায়তাকে অনৈতিক হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসংগত হবে না।
একজন চিকিৎসক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিজের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে পারেন। কেউ নতুন একটি জটিল অস্ত্রোপচার শিখতে পারেন। একজন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ নতুন ক্যাথেটার, স্টেন্ট, ইমেজিং প্রযুক্তি বা জটিল ইন্টারভেনশন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ নতুন ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতির ক্লিনিক্যাল তথ্য জানতে পারেন।
এই জ্ঞান দেশে ফিরে শত শত কিংবা হাজার হাজার রোগীর উপকারে আসতে পারে। তাই অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পথ সংকুচিত করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে একটি ‘চিকিৎসা শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা ও পেশাগত স্বচ্ছতা কমিশন’ অথবা সমজাতীয় স্বাধীন কাঠামো গঠন করা যেতে পারে। এটি কোনো চিকিৎসককে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়ার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ হবে না। বরং এর প্রধান কাজ হবে নীতিমালা তৈরি, তথ্য সংরক্ষণ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করা।
কমিশনে চিকিৎসক সংগঠন, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ, গবেষক, চিকিৎসা-নৈতিকতা বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ এবং হিসাব ও সুশাসন বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে। তবে কমিশনকে ওষুধ ও ডিভাইস কোম্পানি এবং দলীয় বা গোষ্ঠীগত প্রভাব থেকে স্বাধীন রাখতে হবে।
বাংলাদেশ চাইলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে একটি ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিবন্ধন তৈরি করতে পারে। নির্ধারিত সীমার ওপরে কোনো ওষুধ বা ডিভাইস কোম্পানি চিকিৎসকের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে অর্থায়ন করলে সেখানে উল্লেখ থাকবে—
কে সহায়তা দিয়েছে, কী ধরনের বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির জন্য দিয়েছে, নিবন্ধন ফি, যাতায়াত ও আবাসনের কোন ব্যয় বহন করা হয়েছে এবং চিকিৎসক সেখানে বক্তা, গবেষক, প্রশিক্ষণার্থী নাকি সাধারণ প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। একইভাবে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া সম্মানী, গবেষণা অনুদান, পরামর্শক ফি, প্রশিক্ষণ ব্যয়, উপহার ও অন্যান্য সুবিধার তথ্যও নির্ধারিত সীমার ওপরে প্রকাশ করা যেতে পারে।
তবে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্য সুরক্ষা এবং বিদ্যমান আইন মানতে হবে। এতে গুজব কমবে এবং প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে। কোম্পানি সরাসরি চিকিৎসক নির্বাচন করবে, নাকি প্রতিষ্ঠান? এ বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে।
বিশ্বের কিছু নৈতিক কাঠামোতে শিক্ষা-অনুদান সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় বা পেশাজীবী সংগঠনকে দেওয়া হয় এবং চিকিৎসক নির্বাচনে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশেও বড় ধরনের শিক্ষা-অনুদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক সোসাইটি, হাসপাতাল বা একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বচ্ছ নির্বাচনব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। তবে কোনো চিকিৎসক যদি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আমন্ত্রিত বক্তা, গবেষণাপত্র উপস্থাপক, বৈজ্ঞানিক কমিটির সদস্য, প্রশিক্ষক বা নির্দিষ্ট প্রযুক্তির প্রশিক্ষণার্থী হন, তাহলে তার ক্ষেত্রে আলাদা যৌক্তিক বিধান থাকতে হবে।
কাদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে? স্বচ্ছ নীতিমালায় গবেষণাপত্র বা বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা আছে এমন চিকিৎসক, তরুণ গবেষক, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞ, নতুন প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এমন চিকিৎসক এবং যাঁরা প্রশিক্ষণ শেষে দেশে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে পারবেন—তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে একই ব্যক্তিকে অযৌক্তিকভাবে বারবার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ বিস্তৃত করা যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক সফর আর বিলাসভ্রমণের পার্থক্য স্পষ্ট করতে হবে।
স্পনসরশিপের আওতায় যুক্তিসংগত বিমানভাড়া, সম্মেলনের নিবন্ধন ফি, প্রয়োজনীয় আবাসন ও স্থানীয় যাতায়াত গ্রহণযোগ্য হতে পারে—যদি তা নীতিমালা অনুযায়ী হয়। কিন্তু অতিরিক্ত বিলাসবহুল হোটেল, অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অবস্থান, পরিবারের পর্যটন ব্যয় বা বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যয়কে স্পনসরশিপের অংশ করা উচিত নয়। নীতিমালা যত স্পষ্ট হবে, চিকিৎসক এবং কোম্পানি—দুই পক্ষই তত নিরাপদ থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত— কোনো স্পনসরশিপ, সম্মানী, শিক্ষা-অনুদান বা বিদেশ ভ্রমণের বিনিময়ে কোনো চিকিৎসককে নির্দিষ্ট ওষুধ প্রেসক্রাইব বা নির্দিষ্ট ডিভাইস ব্যবহার করতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধ্য করা যাবে না। চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং রোগীর সামর্থ্য। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নৈতিক বিধিতেও চিকিৎসকের জনসম্মুখে দেওয়া তথ্যকে সঠিক, যাচাইযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখার এবং চিকিৎসা-সম্পর্কিত পণ্যের বাণিজ্যিক প্রচারণায় ব্যবহার না করার নীতি রয়েছে।
স্বার্থের সংঘাত থাকা আর দুর্নীতি করা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি সমাজে পরিষ্কার করা জরুরি। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কোনো ওষুধ বা ডিভাইস কোম্পানির গবেষণায় অংশ নিতে পারেন, বক্তৃতা দিতে পারেন, পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারেন অথবা বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। এতে তাঁর একটি সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। কিন্তু স্বার্থের সংঘাতের অস্তিত্ব নিজেই দুর্নীতির প্রমাণ নয়।
সঠিক ব্যবস্থা হলো—স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ করা, নথিভুক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখা। গোপনীয়তাই সমস্যাকে বড় করে; স্বচ্ছতা সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে।
বছরে একবার স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হোক। কতজন চিকিৎসক বৈজ্ঞানিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, কোন ধরনের কর্মসূচিতে গেছেন, মোট কত শিক্ষা-সহায়তা দেওয়া হয়েছে, কোন কোন বিশেষায়িত ক্ষেত্র বেশি বা কম সুযোগ পাচ্ছে এবং কোনো গুরুতর নীতিভঙ্গ শনাক্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কমিশন প্রতিবছর একটি সামগ্রিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। এতে ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবর্তে নীতিগত ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা তৈরি হবে।
শাস্তির পাশাপাশি চিকিৎসকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। নীতিমালা শুধু চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতার দলিল হলে চলবে না; এটি তাঁদের অধিকারও রক্ষা করবে। কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে প্রকাশ্যে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। অভিযোগের লিখিত ভিত্তি থাকতে হবে, চিকিৎসককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে এবং স্বাধীন তদন্তের আগে তাঁর পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা যাবে না। প্রমাণিত অনিয়মের জন্য আনুপাতিক ব্যবস্থা থাকবে; একই সঙ্গে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি থেকেও চিকিৎসককে সুরক্ষা দিতে হবে।
অভিযোগ উঠলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাম প্রকাশ, অপমান বা একতরফা প্রচারণার পরিবর্তে একটি নির্ধারিত তদন্তপদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। প্রথমে অভিযোগ লিখিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। এরপর অভিযোগের ধরন অনুযায়ী প্রাথমিক যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ, আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা, কোম্পানি ও চিকিৎসকের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে হবে। তদন্ত চলাকালে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয়ের পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। প্রমাণিত হলে চিকিৎসা-নৈতিকতা, দুর্নীতি দমন, কর, সরকারি চাকরি বা ফৌজদারি আইনের প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। শাস্তির ধরন অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী হতে পারে—সতর্কীকরণ, অর্থদণ্ড, সুবিধা ফেরত, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্পনসরশিপ নিষেধ, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল, পেশাগত তদন্ত, চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা কিংবা গুরুতর ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা।
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন চিকিৎসক ও ওষুধ/মেডিকেল ডিভাইস শিল্পের বৈজ্ঞানিক সম্পর্ককে অস্বীকার করা নয়; বরং একটি আধুনিক, বাস্তবসম্মত ও আন্তর্জাতিক মানের আইনি ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
চিকিৎসকদের দেশ-বিদেশের বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় অংশগ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা হোক। ওষুধ ও মেডিকেল ডিভাইস কোম্পানির বৈধ শিক্ষা-সহায়তা ও বৈজ্ঞানিক স্পনসরশিপকে নিষিদ্ধ না করে আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। নগদ কমিশন, প্রেসক্রিপশনভিত্তিক অর্থ, রোগী রেফারেল ফি, গোপন উপঢৌকন, পারিবারিক সুবিধা, বিলাসভ্রমণ এবং বৈজ্ঞানিক কাজের আড়ালে ব্যক্তিগত লাভকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হোক। স্পনসরশিপ, শিক্ষা-অনুদান, সম্মানী, উপহার ও স্বার্থের সংঘাতের জন্য জাতীয় স্বচ্ছতা নীতিমালা এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করা হোক। চিকিৎসক ও কোম্পানি—উভয় পক্ষের জন্য উপহার, আতিথেয়তা, সম্মানী, গবেষণা ও ভ্রমণ ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা হোক। অনিয়ম হলে ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক—পুরো চিকিৎসক সমাজকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো না হোক।
চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়, বৈজ্ঞানিক সংগঠন এবং ওষুধ ও মেডিকেল ডিভাইস শিল্প—আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে প্রত্যেকেরই ভূমিকা রয়েছে। এই সম্পর্ক ছিন্ন করা সমাধান নয়। আবার সম্পর্কটি অস্বচ্ছ রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
চিকিৎসকের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেন—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না। গবেষণা, প্রশিক্ষণ, সম্মেলন ও যুক্তিসংগত সম্মানী যেমন বৈধ হতে পারে, তেমনি প্রেসক্রিপশনভিত্তিক কমিশন, রোগী রেফারেল ফি, গোপন নগদ অর্থ, দামি উপঢৌকন, পারিবারিক সুবিধা ও বিলাসভ্রমণ স্পষ্টতই অনৈতিক এবং প্রয়োজনে আইনগত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
আমাদের সামনে তাই তৃতীয় এবং সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথটি বেছে নেওয়া উচিত— ‘নিষেধাজ্ঞা নয়—নীতিমালা’, ‘গোপনীয়তা নয়—স্বচ্ছতা’, ‘বৈষম্য নয়—যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ’, ‘অভিযোগ নয়—প্রমাণভিত্তিক জবাবদিহি’, ‘উপঢৌকন ও কমিশন নয়—রোগীর স্বার্থে স্বাধীন চিকিৎসা সিদ্ধান্ত’, ‘বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বন্ধ নয়—আইনসম্মত ও নৈতিক সহযোগিতা নিশ্চিত হোক’।
চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক জ্ঞান অর্জনের দরজা খোলা থাকুক। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বৈধ বৈজ্ঞানিক সহযোগিতাও চলুক। একই সঙ্গে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠুক যেখানে রোগী, চিকিৎসক, সরকার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সবার কাছেই সম্পর্কটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য থাকে। কারণ শেষ পর্যন্ত আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় সুফলভোগী কোনো কোম্পানি নয়—রোগী।
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভুঁইয়া মাসুম, বিভাগীয় প্রধান (কার্ডিওলজি) পপুলার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল