দেশের জনসংখ্যা পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, দীর্ঘ ৫৪ বছর পর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আবার বাড়তে শুরু করেছে। এ হিসাব খোদ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কখনোই বাড়েনি, বড়জোর স্থির থেকেছে। ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ হার ১ দশমিক ১২ শতাংশে স্থির ছিল। অবশ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, এ স্থির থাকার বিষয়টিও কোনো ভালো খবর নয়, বরং অনেকটাই উদ্বেগের। তবে এ ধরনের সব উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে পেছনে ফেলে ২০২৫ সালের এ-সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যায়, পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় তা দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেড়ে গেছে। আর জনমিতির অন্য পরিভাষায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দেশে নারীর মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট—টিএফআর) ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে বিষয়টি এখন আর শুধু উদ্বেগের পর্যায়ে নেই, বরং তা গভীর সংকটের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিষয়টি কি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মানুষের বিচলিত করতে পারছে? এ হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে দেশের কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই যে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে না এবং উন্নয়ন কেবল চমকপ্রদ কথাবার্তার মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকবে, তা কি তাঁরা বুঝতে পারছেন?
ঢাকা শহরের গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন, যানজট নিরসন, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার সম্প্রসারণ, আবাসন সুবিধা বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা প্রয়োজনে কিছুদিন পরপরই নতুন নতুন উদ্যোগ এবং তার আওতায় নানা আঙ্গিকের নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেসব উদ্যোগ ও প্রকল্প রাজধানীবাসীর ক্রমবর্ধমান চাহিদাগুলোকে কিছুতেই পূরণ করতে পারছে না। আর তা না পারার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে, রাজধানীর জনসংখ্যা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারসংক্রান্ত যেসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওই সব কাজের প্রাক্কলন করা হচ্ছে, জনসংখ্যার ঢাকামুখী অভিগমন ঘটছে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে। ফলে নবসৃষ্ট ওই সব অবকাঠামো ও সেবার সুবিধা ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। আর ঢাকামুখী এ রকম অস্বাভাবিক উচ্চ অভিগমন প্রবণতার পেছনে গ্রামে ও ছোট শহরগুলোতে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ না থাকা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠা ইত্যাদি বহুলাংশে দায়ী। এ ক্ষেত্রে যে দুটি উদ্বেগজনক ঘটনা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো তার একটি হচ্ছে, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কাম্য ও অনুমিত উভয় হারের চেয়ে বেশি থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এ রকম বিপজ্জনকভাবে বাড়তে থাকা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত শৈথিল্যপূর্ণ বলেই প্রতিভাত হচ্ছে।
দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ৩৬৬ জনের বসবাসের হিস্যা নিয়ে বিশ্বের সর্বাধিক জনঘনত্বপূর্ণ দেশের তালিকায় নবম স্থানে আছে বাংলাদেশ। এ সমস্যা নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের পর থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ১৯৭৩ সালে প্রণীত দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল একটি খুবই আশাব্যঞ্জক ঘটনা। আর সে ধারাবাহিকতায় ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়কার সরকারগুলোও সে অগ্রাধিকারের ধারা কমবেশি অব্যাহত রাখে। কিন্তু ২০০১ সালে এসে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে অনেকটাই সংকুচিত করে ফেলে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন জোট সরকারের ভেতরকার ধর্মীয় পার্টিগুলোর কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও ২০১১ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধীরগতিতে হলেও মোটামুটি নিম্নমুখীই ছিল। কিন্তু ২০১১ সালে এসে সেই যে এটি ১ দশমিক ১২ শতাংশে স্থির হয়ে দাঁড়াল, ২০২৪ সাল পর্যন্ত তা আর কেউ কমানোর উদ্যোগ নেয়নি। এ সুযোগে ২০২৪ সালে ধর্মীয় রাজনীতি প্রভাবিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে ১৩ বছরের স্থিতাবস্থা থেকে এটিকে আরও দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বাড়িয়ে নেয়।
অনেকের ধারণা, তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস হামের টিকাদান কার্যক্রমকে গ্রামীণ হেলথকেয়ার সার্ভিসের (জিএইচএস) আওতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে হামের টিকা কেনা যেমন বন্ধ করে দিয়েছিলেন, একইভাবে ডিএফপির আওতাধীন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকেও জিএইচএসের আওতায় নিয়ে যাওয়ার গোপন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই হয়তো ওই অধিদপ্তরকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বর্তমান সরকার হামের টিকা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে জিএইচএসের আওতায় এখনো নিতে পারেনি। সেটা করা না হলে এ দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শিগগির বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করা যায়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষ অনুরোধ রাখছি।
ওপরের তথ্য থেকে বোঝা যায়, রাঙামাটি ও বান্দরবান ছাড়া বাকি সব জেলাতেই জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে এবং সেখানেও রয়েছে মাত্র দুই ধরনের সামগ্রী। এসব সামগ্রী না কেনার পেছনে দুই রকমের কারণ থাকতে পারে—এক. হামের টিকাদান কার্যক্রমকে জিএইচএসের আওতায় নিয়ে যাওয়ার যে উদ্দেশ্যে তখন ওই টিকা কেনা হয়নি, সেই একই উদ্দেশ্যে হয়তো জন্মনিরোধক সামগ্রীও কেনা হয়নি। দুই. ধর্মীয় রাজনীতি প্রভাবিত অন্তর্বর্তী সরকারের রক্ষণশীল অংশ হয়তো এসব সামগ্রী কেনাকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ বলে মনে করেনি। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি যে বর্তমানে খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।
স্বাস্থ্য খাতের নীতিকাঠামো, কর্মপরিকল্পনা ও কর্মসূচির মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক মাত্রার অদক্ষতা ও অপেশাজীবীর ছাপ। গণমাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ‘জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানে কোনো দিকনির্দেশনা বা পরামর্শ নেই’। বিভিন্ন সময়ে প্রণীত জাতীয় জনসংখ্যা নীতির প্রতিটিতেই টিএফআর কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা থাকলেও ২০২৫ সালের এ-সংক্রান্ত নীতিতে এর কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি এ সময়ে প্রণীত ২০২৫-৩০ মেয়াদে জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলপত্রেও এটি রাখা হয়নি। ডিএফপির আওতাধীন ৫৪ হাজার পদের প্রায় ২৭ শতাংশই বর্তমানে শূন্য। বিভিন্ন দপ্তরে জরুরি ভিত্তিতে লোক নিয়োগে অন্তর্বর্তী সরকার বলতে গেলে অনেকটা মরিয়াই হয়ে উঠেছিল এবং আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের আওতায় তাদের অনেক পছন্দের লোকজন তখন নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু অনাগ্রহ ছিল কেবল পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের আওতায় লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে।
এ থেকে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে স্থবির করে রেখেছিল। এখন দেখার বিষয় বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কী উদ্যোগ নেয়। আর সে ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য কতিপয় প্রস্তাব হলো—এক. অবিলম্বে জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলপত্রের বিভিন্ন দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতা দূরীকরণপূর্বক ২০৩০ সাল নাগাদ টিএফআরকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং আনুষঙ্গিক কর্মসূচিসমূহ পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। দুই. পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে আগের স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকিয়ে রেখে একে আরও শক্তিশালী করা। তিন. ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ডিএফপির সব পদের নিয়োগ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্তভাবে সম্পন্ন করতে হবে। চার. ক্রয়নীতি যথাযথভাবে অনুসরণপূর্বক যত দ্রুত সম্ভব জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীসমূহ সংগ্রহ ও বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাঁচ. বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করে হলেও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ছয়. ডিএফপির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম যেহেতু দীর্ঘদিন যাবৎ স্থবির হয়ে আছে, সেহেতু সে পর্যায়ের সব কর্মীর জন্য ফলোআপ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ওই সব প্রশিক্ষণে কর্মকর্তারা সম্মানী না নিয়ে হলেও প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত যাতায়াত ও আহার ভাতা এবং আনুষঙ্গিক ব্যয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
দেশের উন্নয়ন কখনোই চমকপ্রদ কথাবার্তা, তাক লাগানো আচরণ ও জনসভার মুখরোচক বক্তব্য দিয়ে হয় না। এটির জন্য দরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রয়োজন, চাহিদা ও স্বার্থকে বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ বাড়ানো। সীমিত ভূমি ও সীমিত সম্পদ দিয়ে এত বড় জনগোষ্ঠীকে প্রতিপালন করা সম্ভব নয়। তাই এ অবস্থায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হারকে বহাল রেখে এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তবে এটিকে সম্ভব করে তুলতে হলে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনার বিষয়টিকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য করতে হবে। এবং সে ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনাই হোক সরকারের অন্যতম কর্তব্য।
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক