জাতীয় অর্থনীতির পরিমাপকগুলো যখন পরিসংখ্যানের খাতায় প্রবৃদ্ধির হিসাব কষে, ঠিক তখনই রান্নাঘরের কাঠের হাঁড়ি কিংবা বাজারের থলিতে এসে ধাক্কা খায় বাস্তব চিত্র। গত কয়েক বছরে নিত্যপণ্যের বাজারে যে হারে অগ্নিমূল্য তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এমন এক সময়ে সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল সমীকরণ বা বেতনকাঠামোর পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা ওঠাই স্বাভাবিক। তবে অর্থনীতির মৌলিক প্রশ্নটি থেকে যায় অন্য জায়গায়—সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল যদি কিছুটা স্বস্তিও দেয়, দেশের বিশালসংখ্যক অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী ও হতদরিদ্র মানুষের সংসার আসলে চলবে কীভাবে?
মূল্যস্ফীতি কেবল অর্থনৈতিক পরিভাষা নয়, এটি নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একটি দৈনিক অস্তিত্বের লড়াই। যখন খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ সীমায় পৌঁছায়, তখন তার প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার হয় সমাজের একেবারে তলানির মানুষগুলো।
একটি দেশের টানাপোড়েনের সবচেয়ে বেশি ভোগে তারা। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি তাদের জন্য অনেকটাই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।
পে-স্কেল নির্ধারণ বা সংশোধন নিশ্চয়ই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকার এবং সময়ের দাবি। কিন্তু একটি দেশে যেখানে মোট শ্রমশক্তির অর্ধেকেরও বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যেখানে প্রতিদিনের মজুরি দিয়ে প্রতিদিনের আহার কিনতে হয়, সেখানে কেবল একশ্রেণির বেতন বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
অর্থনীতির সহজ নিয়ম হলো, বাজারে যখন বেতন বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ ঘটে, তখন বিক্রেতা ও বাজার সিন্ডিকেটের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। নতুন পে-স্কেলের খবর প্রচারিত হওয়ামাত্রই খুচরা ও পাইকারি বাজারে অযৌক্তিক হারে পণ্যের দাম চড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে যাদের আয় নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় বাড়ে না, অর্থাৎ দিনমজুর, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক বা ক্ষুদ্র হকার যারা, তাদের অবস্থা হয়ে পড়ে চরম করুণ।
দরিদ্র পরিবারের বাজেটের সিংহভাগ খরচ হয় কেবল চাল, ডাল, তেল ও পেঁয়াজের মতো প্রাথমিক খাদ্যদ্রব্য ক্রয়ে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লে তারা প্রথম কোপটি বসায় তাদের খাবারের থালায়। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আকাশচুম্বী পরিবর্তন চলমান। দুই বেলার খাবারের সমীকরণ তাদের জন্য আকাশ-কুসুম স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ে মাছ, মাংস ও দুধ। ধীরে ধীরে কমে আসে দৈনিক ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ।
এরপর প্রভাব পড়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। সন্তানকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কাজে পাঠানো কিংবা অসুস্থতায় ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ফার্মেসি থেকে সস্তা ওষুধ খেয়ে দিন কাটানো—এসব ঘটনা যেন একটি পুরো প্রজন্মকে দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে ফেলার নামান্তর।
এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি ও সংকট নিরসনে কেবল কিছু পে-স্কেল সংশোধন বা সরকারি অনুদান দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে কাঠামোগত সংকট মেটানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও সময়োপযোগী সুনির্দিষ্ট কৌশল। মূল্যস্ফীতির বড় কারণ সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি খোলা বাজারে টিসিবির মাধ্যমে কম মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিক্রির পরিধি বাড়ানো আবশ্যক।
একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ করে হতদরিদ্র পরিবারের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য টার্গেটেড রেশন ব্যবস্থার পূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন, যেন প্রকৃত দুস্থ ব্যক্তিরাই এই সুবিধা পান। অন্যদিকে, অনানুষ্ঠানিক ও বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেন আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কিছুটা কমে আসে।
সর্বোপরি, কৃষক যাতে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য কৃষি খাতে সার ও সেচের জ্বালানিতে ভর্তুকি বজায় রাখা প্রয়োজন। কারণ, কৃষক ন্যায্যমূল্য পেলে এবং পরিবহন খরচ কম থাকলে খুচরা বাজারেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাজার ব্যবস্থার সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা না করতে পারলে মুদ্রাস্ফীতির দানব সব অর্জন গ্রাস করে নেবে। এমনকি এর মাত্রা দানবীয় পর্যায়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব নয়। বাংলাদেশের প্রতিটা নাগরিক যেন দুবেলা দুমুঠো পেট ভরে খেতে পারে, সেই নিশ্চয়তা দেওয়াও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল সামাজিক চুক্তি। হতদরিদ্র মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনি ও ঘামে যে অর্থনীতির চাকা ঘোরে, তাদের খাবারের পাত্র খালি রেখে কোনো জাতীয় উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। দেশের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তরে সামষ্টিক বিবেচনা রেখে সরকারকে সঠিক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
ফারজানা আক্তার, শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ