হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

তথ‍্য ও অপতথ‍্যে জর্জরিত চারপাশ

সেলিম জাহান 

মানুষ তথ‍্য পেতে চায় তাঁর আশপাশসহ সমাজে-রাষ্ট্রে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কী ঘটছে, তা জানতে। তথ‍্যপিপাসা মানুষের মজ্জাগত আকাঙ্ক্ষা। আমরা তথ্য সংগ্রহ করি মূলত বইপত্র, অন্যের মাধ্যমে ও সংবাদমাধ‍্যম থেকে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ‍্যমের ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটারসহ নানা ক্ষেত্র হলো তথ্য পাওয়ার জায়গা। কিন্তু সমস‍্যা হচ্ছে, প্রতিদিন তথ‍্যের যে প্লাবন নানা সংবাদপত্র, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ‍্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। যেখানে প্রতিদিন সব সংবাদপত্রের খবর পড়া শেষ করা সম্ভব হয় না, সেখানে সেসব আত্মস্থ করা তো দূরের ব্যাপার। তাই অধিকাংশ মানুষের তথ্যে পিছিয়ে থাকাটা অস্বাভাবিক ব্যাপার।

সবকিছু দেখে-শুনে দুটি বিষয় সম্পর্কে আমার মনে ভাবনা জাগে যে প্রথমত, তাদের পরিবেশিত তথ্যের কোনো চাহিদা আমজনতার কাছে আছে কি না? তার প্রতি খুব একটা ভ্রুক্ষেপ সংবাদমাধ‍্যমগুলোর আছে বলে মনে হয় না। তাদের সব মনোযোগ থাকে শুধু তথ্য প্রকাশ করার দিকে। খাদ‍্যের অতিভোজনের মতো তথ‍্যের এই অতিজোগানে আমরা সাধারণ মানুষ হাঁসফাঁস করি।

কিন্তু তাদের অতিজোগানকৃত তথ‍্য আমাদের গেলানোর জন‍্য সংবাদমাধ‍্যমগুলোর সেকি প্রাণান্ত চেষ্টা! সেগুলো আমরা হজম করতে পারছি কি না, সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় বলে মনে হয় না। তাই কোন তথ‍্য পাঠকের জন‍্য গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটি সংবাদ জোগানদারদের জন‍্য জরুরি, সেটা প্রায়ই গুলিয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, কে কার আগে তথ‍্যের জোগান দেবেন, তার একটা ভয়ানক প্রতিযোগিতা পড়ে যায় সংবাদমাধ‍্যমগুলোর মধ‍্যে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সেই প্রতিযোগিতা আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু তেমন প্রতিযোগিতা যে সব সময় স্বাস্থ‍্যকর, তেমনটা বলা যাবে না। ব‍্যাপারটা দেখে মনে হয়, কে কার আগে তথ‍্য পরিবেশন করবে তথ‍্য-ভোক্তার কাছে, তারই দৌড়ে সবাই ব‍্যস্ত। ফলে প্রায়ই সংবাদমাধ‍্যমাগুলো প্রতিনিয়ত স্বল্প-দৌড়ে ব‍্যাপৃত থাকে, কিন্তু প্রয়োজনীয় দীর্ঘ-দৌড়ে তাদের অনুপস্থিতিটি নজরে পড়ে।

ইদানীং তথ‍্যের বিষয়ে আরও একটি ব‍্যাপার ঘটছে—বহুক্ষেত্রে তথ‍্যকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে নানা অপতথ্য। ফলে তথ‍্যের প্রকৃতি ও ধরন—দুটোই ভীষণভাবে বদলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মূল অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছে নানা সামাজিক যোগাযোগ ও প্রচারমাধ‍্যম। তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত প্রসারের ফলে আমাদের সমাজে অপতথ্যের একটি সংস্কৃতি জন্ম নিয়েছে। এই অপতথ্য-সংস্কৃতি প্রবল শক্তিশালী হয়ে ছড়ানো অপতথ্য দিনকে রাত করে, সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে এবং নিশ্চিত বিষয়কে অনিশ্চিত করে দিচ্ছে। এই অপতথ্য সংস্কৃতির আরেকটা হলো ‘গুজব’। চিরায়ত কাল থেকে দেখা গেছে, কিছু কিছু গুজব আছে, যেগুলো শোনার পর মনে সংশয় জাগে, সেগুলো বোধ হয় ‘হলেও হতে পারে’ ধরনের। মানে বিশ্বাসযোগ্যতার দেয়ালের ধারেপাশেই তাদের অবস্থান। আবার কিছু কিছু গুজব আছে, যা শুনলে মনে হয়, সেগুলো একেবারে ‘ডাহা মিথ্যা’, তা নিয়ে দুবার ভাবার সুযোগ থাকে না।

সেই ‘ডাহা মিথ্যার’ অপতথ্যের জোয়ারে সয়লাব আজ আমাদের যাপিত জীবন। অন্য কোনো উৎসে যেতে হয় না, ফেসবুক খুললে দেখা যায় গুজবের কত ছড়াছড়ি! এমন সব গুজব চোখে পড়ে, যাতে প্রশ্ন জাগে যে একজন সুস্থ চিন্তার মানুষ কী করে এজাতীয় আজব-গুজব ছড়াতে পারে? আমার মনে হয়, এর তিনটি কারণ রয়েছে। এক. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলেও তা নিয়ন্ত্রণ বা তদারক করা হয় না। যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো সময় যা খুশি এতে লিখতে পারেন। সুতরাং যে কেউ যেকোনো রকমের রং চড়িয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে যা ইচ্ছা তা লিখে গুজব ছড়াতে পারেন।

দুই. কোনো কোনো মানুষ যেকোনো উপায়ে নিজের প্রচারখ্যাতি পেতে চান। তিনি চান, তাঁর যেকোনো পোস্টে শত শত লোক হুড়মুড় হয়ে পড়ে লাইক ও কমেন্টের বন্যা বয়ে দিক। ফলে যে গুজবের তিনি জন্ম দিয়েছেন, তিনি চান সেই গুজব লোক হতে লোকে ছড়িয়ে পড়ুক এবং এই প্রক্রিয়ায় তাঁর নাম ও পরিচিতি মুখ হতে মুখে ঘুরতে থাকুক। গুজব ছড়ানো যদি নামের, আত্মপ্রচারের এবং বিখ্যাত হওয়ার বড় হাতিয়ার হয়, তাহলে তা ছড়াতে বহুজন পিছপা হবেন কেন!

অপতথ্য ছড়ানোর তৃতীয় প্রধান কারণ হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। একটি পক্ষকে পছন্দ না করলে তার নামে গুজবের মাধ্যমে কুৎসা রটনার মতো কার্যকর পন্থা আর কী হতে পারে। সেই সঙ্গে নিজের পক্ষের মানুষজনের জন্য গুজব যদি ছড়ানো যায়, তাহলে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দেওয়া যায়।

অপতথ্য বা গুজব ছড়ানো বিষয়ে এত কথা বলছি এ কারণে, সমীক্ষায় দেখা গেছে ২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা অপতথ্য ছড়ানো ৫৮ শতাংশ বেড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ৩ হাজার তথ্য মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। যাঁরা দায়িত্বহীনভাবে নিজের খেয়ালখুশিমতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপপ্রচার করেন কিংবা গুজব ছড়ান, তাঁরা অনেক সময় ভুলে যান, তাঁদের কাজের মাধ্যমে ব্যক্তিমানুষ, গোষ্ঠী কিংবা সমাজের তিনি কতটা ক্ষতি করছেন, তা নিয়ে তাঁদের ভাবনা আছে কি?

ব্যক্তিগত পর্যায়ে গুজব ছড়ানোর ফলে যাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার হয়েছে, অনেক সময়ে তাঁর আর্থিক ও পেশাগত ক্ষতি হতে পারে। এ কারণে কর্মচ্যুত হয়েছেন অনেকে, ব্যবসা-বাণিজ‍্য হারিয়েছেন কেউ কেউ। কোনো কোনো ব্যক্তির ব্যক্তি-চরিত্রের ওপরে মিথ্যা অপপ্রচারের ফলে সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে অনেকের, সামাজিক মর্যাদা হারিয়েছেন অনেকে। চরিত্র বিষয়ে অপপ্রচার একজন মানুষ ও তাঁর পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নানা সময়ে দেখা গেছে, গুজব ছড়ানোর ফলে ধর্মীয় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, বিভিন্ন ধর্মীয় কিংবা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর ওপরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলা একদিকে তাদের উপাসনালয় থেকে শুরু করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সেই হামলা তাদের বাড়িঘর পোড়ানো থেকে তাদের সম্পদের ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন ধর্মীয় এবং নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে।

এরপর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচার দুটি দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে, কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হলো, এটা নাগরিক পর্যায়েও মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ-জাতীয় প্রচারণার ফলে মানুষের মন বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং অন্য রাষ্ট্রের প্রতি তাদের মনে একটি বিরূপ ধারণার জন্ম দেয়। সম্প্রীতিমূলক এবং সৌহার্দ্যমূলক একটি ভুবনপল্লি গড়ার পথে এটা বিরাট বাধা।

গুজব একটি সন্দেহের সংস্কৃতির জন্ম দেয়, একটি প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক দল কিংবা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার অনেক সময় সন্ত্রাসের জন্ম দেয়। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে খুনোখুনির ঘটনা ঘটে।

অপতথ্য কিংবা অপপ্রচার ক্ষতি করা ছাড়া কারও কোনো উপকার বয়ে আনে না। তবু নানা কারণে আমরা এই অপসংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়ে চলেছি অত‍্যন্ত দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড করে। দায়িত্ববান, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করার জন্য সঠিক তথ‍্যের পরিবেশন—সবাইকে নৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ

চাই সুপরিকল্পিত শিক্ষানীতি, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব

ভেরিফিকেশনের ফাঁদে মেধাবঞ্চিত

উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক প্রভাব

বিডার নেতৃত্বকে ঢেলে সাজানো কেন প্রয়োজন

দিনে দিনে যত বাড়িয়াছে দেনা...

সংসদের প্রথম অধিবেশন ও আগামীর পূর্বাভাস

শ্রীলঙ্কা: ঘুরে দাঁড়ানো অপূর্ব গল্পের দেশ

এনসিপির বক্তব্যে আলোড়িত হতে পারেনি মানুষ: আসিফ মোহাম্মদ শাহান

রাষ্ট্র কি নিজের দায়িত্ব এড়াচ্ছে

শিশুদের ডেটা প্রোফাইলিং ব্যবসা: মেটা কেন ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশে অযাচিত চাপ দিয়েছে